বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

সিডিএ’র স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২০, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

শরীফুল রুকন : বিচারকদের জন্য যে ৩৯ দফা আচরণবিধি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ঠিক করে দিয়েছে তার মধ্যে প্রায় ১৬টি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে প্রায় দুই বছর ধরে দায়িত্বপালন করে আসা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

সাইফুল আলম চৌধুরীকে ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২সহ আরো বিভিন্ন আইনে অপরাধ বিচারের জন্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরপর থেকে বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক মানুষকে কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি এ পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের জন্মও দিয়েছেন তিনি।

বিচারকদের জন্য আচরণবিধির দ্বিতীয় দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, “দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি সম্মান রেখে বিচারকের কাজ করা উচিত, যাতে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকে।” অথচ সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে নিয়ম না মেনে সীতাকুণ্ডের সিডিএ সিলিমপুর আবাসিক এলাকায় ৬০ বছরের পুরোনো লেক ভরাট করে ৫ কাঠার প্লট বরাদ্দ নিতে আবেদন করেন সাইফুল আলম চৌধুরী। ওই আবেদন সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ অনুমোদনও দেন। পরে বিষয়টি নিয়ে জানাজানি হলে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গত ২৬ আগস্ট সিডিএ’র সংশ্লিষ্টদেরকে কাগজপত্র নিয়ে তলব করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপর নির্ধারিত দিনে সিডিএ’র পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যাখ্যা না দিয়ে সময়ের আবেদন করা হয়।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পরবর্তীতে সিডিএ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অঙ্গীকারনামা দেয়, সিলিমপুর আবাসিকে লেকটি ভরাট করে আর প্লট করা হবে না। এভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।’

প্লটকাণ্ডের আগে ৭ জুন সিডিএ’র সচিব পদে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সিডিএ’র বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলমের সাথে দেখা করে তাদের ক্ষোভের কথা জানান। বিধি অনুযায়ী উপসচিব ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে তারা তখন অভিযোগ করেন। পরে সিডিএ’তে সচিব নিয়োগ হলে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয় সাইফুল আলমকে।

এদিকে বিচারকদের জন্য আচরণবিধির ৮ম দফায় বলা হয়েছে, “যে ক্ষেত্রে বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা থাকে, সেই মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বিচারকের নিজে থেকেই সরে যাওয়া উচিত।” ৯ম দফায় বলা হয়েছে, “কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, কোনো মামলার সঙ্গে আগে সম্পর্ক ছিল বা আগে কোনো মামলায় তিনি আইনজীবী হিসেবে লড়েছেন বা মামলার কোনো পক্ষের সঙ্গে বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এমন ক্ষেত্রে তিনি ওই মামলার বিচারকাজে নিজেকে অযোগ্য ঘোষণা করবেন।”

১০ দফায় বলা হয়েছে, “একজন বিচারক এমন কোনো বিষয়ে শুনানি গ্রহণ করবেন না, যেখানে তার স্ত্রী-সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনরা কোনওভাবে জড়িত থাকেন। অথবা এমন কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকেন যার দ্বারা বিচারক প্রভাবিত হতে পারেন।” আচরণবিধির ৮, ৯ ও ১০ নং দফা ভঙ্গেরও অভিযোগ উঠেছে সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন সাইফুল আলম চৌধুরী। তার বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠীদের অনেকেই আইনজীবী; যারা সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিয়মিত মামলা পরিচালনা, শুনানি করে আসছেন।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক ছাত্র ও আইনপেশায় যুক্ত কয়েকজনের ব্যক্তিগত চেম্বারে বিভিন্ন সময়ে গিয়ে আড্ডা দিয়েছেন সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী। গত ৮ অক্টোবর দুইজন আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে গ্রুপ ছবি তুলেন বিচারক সাইফুল আলম; যা ওইদিন আরেকজন আইনজীবী ফেসবুকে আপলোড করেছেন। দুটি ছবিতেই বিচারক সাইফুলের পাশে প্রিমিয়ারের তার একজন সহপাঠী-বন্ধু ও এক ব্যাচ জুনিয়র আরেকজন আইনজীবীকেও দেখা গেছে।

এছাড়া গত ১৩ অক্টোবর বিচারক সাইফুল আলম চৌধুরীর আরেকজন আইনজীবীর চেম্বার পরিদর্শনের ছবি ফেসবুকে আসে। শুধু আইনজীবীর চেম্বার পরিদর্শনেই সাইফুল আলমের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়! ১২ অক্টোবর একজন আইনজীবী ফেসবুকে আরেকটি ছবি আপলোড করেন; যেখানে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাইদের নিয়ে কক্সবাজারে সাইফুল আলম চৌধুরী মিলনমেলার আয়োজন করেন বলে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ২ ও ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের একাধিক আইনজীবীর ফেসবুক আইডিতে আপলোড করা কিছু ছবিতে দেখা যায়, কক্সবাজারে আইনজীবী বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াচ্ছেন, সুইমিং পুলে গোসল করছেন বিচারক সাইফুল আলম চৌধুরী।

যেসব আইনজীবীর সঙ্গে বিচারক সাইফুল আলমের ছবি ফেসবুকে ভাসছে, তাদের অনেকেই সিডিএ’র আদালতে মামলা পরিচালনা করেন। অথচ বিচারকদের আচরণবিধির ১৮ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, “আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে এমন কেউ তার আদালতে মামলা পরিচালনা করলে সেটা পক্ষপাতদুষ্ট বলে বিবেচিত হবে।”

১৯ দফায় উল্লেখ আছে, “একজন বিচারকের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন, যারা আইনজীবী সমিতিতে অনুশীলন করেন, তাদের কাউকে তার আদালতে মামলা পরিচালনার অনুমতি ওই বিচারক দেবেন না।”

বিচারকদের আচরণবিধির ৭ম দফায় বলা হয়েছে, “আদালতে মুলতবি বা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার মেরিটের ক্ষেত্রে বিচারককে প্রকাশ্যে মন্তব্য এড়াতে হবে।” ২২ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, “একজন বিচারক রায় দেবেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলবেন। কিন্তু কোনওভাবেই গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবেন না।”

অথচ বিভিন্ন মামলায় নিজে আদেশ দিয়ে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী। এ ধরনের বেশকিছু প্রতিবেদন গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১৩ দিন নিজের ফেসবুক আইডিতে শেয়ারও দিয়েছেন। বিচারকদের আচরণবিধির ১২ দফায় বলা আছে, “বিচার কার্যালয়ের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ অনুশীলন করতে হবে বিচারককে।”

এদিকে বিচারকদের আচরণবিধির ৩৩ দফায় উল্লেখ আছে, “বিচার বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় একজন বিচারক ব্যক্তিগত চেম্বার ব্যবহার করতে পারবেন না বা আইন পেশায় অংশ নিতে পারবেন না।” অথচ সাইফুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য; তার লিন (আইনজীবী পরিচিতি নাম্বার) ২০১০১২২৮২৮।

যদিও আইনজীবীদের জন্য পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালায় চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, “একজন আইনজীবীর অন্য পেশা, ব্যবসা চালানো, বেতনভিত্তিক কর্মকর্তা বা চাকুরিজীবী হওয়া উচিত নয়।” এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, কেউ আইনজীবী হওয়ার পর অন্য পেশায় গেলে আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ স্থগিত করতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আইনজীবী হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে তালিকাভুক্ত হন সাইফুল আলম চৌধুরী। ২০১৯ সালের আইনজীবী ডাইরেক্টরির ২৬৩৮ ক্রমিকে আইনজীবী হিসেবে সাইফুল আলম চৌধুরীর নাম ও মোবাইল নাম্বারও আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১০ বছর ধরে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকার ফলে এই সময়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির যত আয় হয়েছে, তার একটি অংশ সাইফুল আলম চৌধুরী হিসাবে জমা হয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আইন পেশা ও বিচারকের চাকরি দুটি একসঙ্গে করার সুযোগ নেই। সাইফুল আলম চৌধুরী আইনজীবী সদস্য পদ স্থগিত করেছেন। কখন করেছেন জানতে চাইলে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে বলে এড়িয়ে যান তিনি।

এদিকে বিচারকদের আচরণবিধির ২৮ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, “জজ আদালতে অনুশীলন (মামলা পরিচালনা করেন) করেন এমন কোনো নিকটাত্মীয়কে বিচারকের এড়িয়ে চলা উচিৎ, যেন কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ কেউ করতে না পারে।” আচরণবিধির ২৭ দফায় বলা হয়েছে, “ন্যায়বিচারের স্বার্থে একজন বিচারককে ব্যক্তিগত চলাফেরা বা সামাজিক মেলামেশা সীমিত রাখার নীতি গ্রহণ করতে হবে।” অথচ এ নীতিকে আমলে নিচ্ছেন না বিচারিক কর্মকর্তা সাইফুল আলম চৌধুরী।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী কারও বিয়ে, ওয়ালিমা, জন্মদিনের খবর পেলেই শুভকামনা জানাতে উপস্থিত হচ্ছেন সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী। শুধু তাই নয়, আইন বিভাগের কারও ভাইবোনের বিয়ের দাওয়াত পেলেও হাজির হচ্ছেন তিনি। দিনে দুই-তিনটি বিয়েতে উপস্থিত হয়েছেন, এমন নজিরও রেখেছেন। এসব ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছেন বিভিন্ন আইনজীবী।

সর্বশেষ গত ২৭ নভেম্বর প্রিমিয়ারের আইন বিভাগের ২৫ ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর বিয়েতে অংশগ্রহণ করে গ্রুপ ছবি তোলেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী। এর আগে ৮ নভেম্বর আরবি কনভেনশন হলে প্রিমিয়ারের আইন বিভাগের দুই প্রাক্তন শিক্ষার্থীর বিয়েতে অংশগ্রহণ করেন গ্রুপ ছবি তুলেছেন সাইফুল আলম চৌধুরী।

২৯ অক্টোবর প্রিমিয়ারের আইন বিভাগের ২৩ তম ব্যাচের একজনের বিয়েতে গিয়ে গ্রুপ ছবি তুলেছেন। ৯ অক্টোবর কেবি কনভেনশন হলে ২৫ তম বাচের একজন ছাত্রীর বিয়েতেও উপস্থিত হয়ে গ্রুপ ছবি তুলেছেন। ২০ জানুয়ারি আরবি কনভেনশন হলে প্রিমিয়ারের আইন বিভাগের আরেকজনের বিয়েতে গিয়ে ছবি তুলেছেন সাইফুল আলম চৌধুরী। ৪ ফেব্রুয়ারি ও ৯ অক্টোবর প্রিমিয়ারের আইন বিভাগের দুই প্রাক্তন শিক্ষার্থীর বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে গ্রুপ ছবি শেয়ার করেছেন সাইফুল আলম চৌধুরী। একইভাবে গত ১৯ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিচারক সাইফুল আলম চৌধুরীর অংশগ্রহণের ছবি ফেসবুকে পাওয়া গেছে।

শুধু প্রিমিয়ারের আইনের ছাত্র নয়, তাদের ভাইবোনের বিয়েতেও অংশগ্রহণ করেছেন বিচারক সাইফুল আলম চৌধুরী; ৬ নভেম্বর আইন বিভাগের ২৩ তম ব্যাচের একজনের বোনের বিয়েতে অংশগ্রহণ করে গ্রুপ ছবি তুলেছেন তিনি। ২৬ অক্টোবর কিং অব চিটাগংয়ে প্রিমিয়ারের আইনের সাবেক শিক্ষার্থীর ভাইয়ের বিয়েতেও অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি একজন আইনজীবীর জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠানেও হাজির হয়েছেন সাইফুল আলম চৌধুরী। সব ছবিই ফেসবুকে দিচ্ছেন আইনজীবীরা।

শুধু বিয়ে, ওয়ালিমা, জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নয়, প্রিমিয়ারের আইন বিভাগের একজন সাবেক শিক্ষার্থীকে দেখতে গত ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও যান সাইফুল আলম চৌধুরী। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে অসুস্থ ব্যক্তির সহপাঠী রাশেদ হামিদ সায়মন লিখেছেন, “সিডিএ স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। এজন্য ‘বন্ধু মহলের পক্ষ’ থেকে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করা হয়।” এসব তো শুধু চলতি বছরের হিসাব, গতবছরও আইনজীবীদের অসংখ্য সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন বিচারক সাইফুল আলম চৌধুরী। এসব ছবি অনেক আইনজীবী ফেসবুকে শেয়ার করেছেন।

বিচারকদের জন্য আচরণবিধির ২০ দফায় উল্লেখ আছে, “পরিবারের সদস্য নয়, কিন্তু আইনজীবী সমিতির সদস্য এমন কোনো ব্যক্তিকে কোনো বিচারক তার বাসস্থানে রাখতে পারবেন না বা নিজের সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে দেবেন না।” কিন্তু সিডিএ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পাওয়া গাড়িতে আইনজীবী বন্ধুদের নিয়ে বিচারক সাইফুল আলম চলাফেরা করেন বলে অভিযোগ আছে।

বিচারকদের আচরণবিধির ১৭ দফায় বলা হয়েছে, “শুধু বিচার করলেই হবে না, এটা দৃশ্যমান হতে হবে যে একজন বিচারক ন্যায়বিচার করেছেন। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের যে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা, তা তাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে নিরপেক্ষতার ওই ধারণা পরিবর্তনের কারণ ঘটে।”

কিন্তু সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরীর প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ-প্রীতি নিয়ে আদালত পাড়ায় নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। গত ১৬ নভেম্বর জসিম উদ্দিন নামের একজন আইজীবী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, “বাবা তোমার দরবারে সব দালালের মেলা! হরেক রকম দালাল লইয়া বসাইছে মেলা।”

সাইফুল আলম চৌধুরীর প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়-প্রীতির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৪ মে অনুষ্ঠিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ল’ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (পুলা) নির্বাচনে সভাপতি পদে নির্বাচন করে সামান্য ভোটে হেরে যান সাইফুল আলম চৌধুরী। নির্বাচনে সভাপতি পদে ৪০৫ ভোট পান উচ্চ আদালতের আইনজীবী গাজী মু. সাদেকুল আলম। তার নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী সাইফুল আলম চৌধুরী পেয়েছিলেন ৩৮৯ ভোট। আগামীবারও পুলার সভাপতি পদে নির্বাচন করার ঘোষণা নিজের বন্ধু-মহলে দিয়েছেন সাইফুল আলম চৌধুরী।

সাইফুল আলমের বিষয়ে প্রিমিয়ারের প্রাক্তন ছাত্র একজন আইনজীবী বলেন, পুলার সভাপতি হওয়ার বড়ই শখ সাইফুলের। নির্বাচনে জিততে তিনি পুলার সদস্য বড় ভাই, বন্ধু, ছোট ভাই সবার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছেন। তারই অংশ হিসেবে শুধু সবার বিয়েতে নয়, নানা আপদে-বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সাইফুল আলম চৌধুরী। এসব করতে গিয়ে বিচারকের আচরণবিধি মানা হচ্ছে কিনা সেটা দেখার সময় তার নেই।

প্রিমিয়ারের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা করে আসা আরেকজন আইনজীবী বলেন, বিচারক হিসেবে যে আচরণ করা দরকার, তিনি (সাইফুল) করছেন না, এটা সত্যি। এ বিষয়ে তাগাদা দিলে তিনি আমাদেরকে জবাব দেন, তিনি এখন জুডিসিয়াল অফিসার নেই। প্রেষণে সিডিএতে আছেন। তাই এভাবে চলাফেরা করতে বাধা নেই। তবে তার ব্যাখ্যা সঠিক নয়। কারণ তিনি তো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নয়, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। তার আদেশের বিরুদ্ধে আপিল তো জেলা প্রশাসকের কাছে করা যায় না, করতে হয় জেলা জজের কাছে। ইমারত নির্মাণ আইনে ৭ বছর পর্যন্ত যিনি কারাদণ্ড দিতে পারছেন, তিনি যদি এখন বলেন, বিচারক নই, প্রেষণে আছি। এটা তো হাস্যকর।

আরেকজন আইনজীবী বলেন, সিডিএ’র ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ি উত্তর কাট্টলী এলাকায়। ওই এলাকাটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। স্বাভাবিকভাবে নগরের বাসিন্দা হলে নগরেই দায়িত্ব দেওয়া হয় না। সব কথা তো আর বলা যায় না। গত দুই বছরে সিডিএ’র কোর্টের মামলার জামিন আদেশ, রায় ও বিচারিক নথিগুলো খতিয়ে দেখলে চাঞ্চল্যকর অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে। কারণ যেসব আইনজীবীর অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকছেন, গ্রুপ ছবি তুলছেন, সেসব আইনজীবী আবার ওনার আদালতে মামলা পরিচালনা বা শুনানি করে আসছেন।

তিনি বলেন, আগে বিদ্যুৎ আদালত আগ্রাবাদে ছিল, এখন সিজেএম ভবনে চলে এসেছে। সিডিএ’র আদালতও সিডিএ ভবন থেকে সরিয়ে আদালত পাড়ায় নিয়ে আসলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।

এদিকে সিডিএ’র স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সাইফুল আলম চৌধুরীর যোগদানের এক বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে সিডিএতে আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তারই সহপাঠী একেএম আজহারুল হক। সাইফুল ও আজহারুল দুইজনই প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একই ব্যাচের ছাত্র। বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে একসঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে চলাফেরা করতেও দেখা যায়; এ সংক্রান্ত ছবি একেএম আজহারুল হক নিজের ফেসবুক আইডিতে আপলোড করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ’র আইন কর্মকর্তা একেএম আজহারুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘উনার বাড়ি তো চট্টগ্রামে। আত্মীয়-স্বজন চট্টগ্রামে। উনাকে সরকার চট্টগ্রামে পোস্টিং দিয়েছে, সেটা ঠিক আছে। চট্টগ্রামে পড়ালেখা করেছে বলে বন্ধু-বান্ধব আছে, হয়তো মিশছে। বিচারকদের কিছু বিধিনিষেধ আছে। তারপরও তিনি তো একজন মানুষ। কোথাও সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়েছে, কেউ ছবি তুলতে চেয়েছে, তিনি হয়তো না করেননি।’

তিনি বলেন, ‘বিচারকদের আচরণবিধি আছে। তাদেরকে পাবলিক ফাংশনে একটু কম যেতে হয়। নিজেকে একটু দূরে রাখতে হয়। হয়তো পারে নাই।’

 

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী মন্তব্য করতে রাজী হননি।

জানতে চাইলে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিচারককে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে থাকতে হবে। বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতে হবে নিরপেক্ষতার স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে। নিয়ম না মেনে প্লট বরাদ্দের আবেদন করেছেন কিনা, আমি জানি না। যদি করে থাকে সেটা অন্যায়। এতে বিচার বিভাগের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হয়। বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থার ক্ষেত্রে আঘাত আসার আশংকা থাকে।’

গণমাধ্যমকে সিডিএ ম্যাজিস্ট্রেট বক্তব্য দিতে পারেন কিনা জানতে চাইলে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, ‘একজন বিচারক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। এতে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়।’

প্রসঙ্গত, গত ৩ অক্টোবর দুর্নীতিমুক্ত বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন কল্পনাও করা যায় না মন্তব্য করে একটি রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগের আমূল সংস্কার করে দুর্নীতির মূল উৎপাটনের সময় এসেছে। বিচার বিভাগের দুর্নীতি রোধে করণীয় সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন, লেখা কম আসা নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করে উচ্চ আদালত। পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিয়ে একটি রিট মামলার রায়ে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক-আল-জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।