বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭

গিয়াস বাহিনীর হাতে জিম্মি টেকনাফের মানুষ

প্রকাশিতঃ সোমবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২০, ৩:২৮ অপরাহ্ণ


জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার মানুষ গিয়াস উদ্দীন নামের এক ব্যক্তির সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইয়াবা কারবার থেকে শুরু করে ঘোষণা দিয়ে একের পর এক খুন, দিনদুপুরে ডাকাতি, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, অপহরণ করে মুক্তিপণ ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টেকনাফের পাহাড়ি ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় গিয়াস বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয়। এছাড়া হৃীলার রঙ্গিখালী ও তার পাশের এলাকাগুলোতে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত ইয়াবা কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোলাগুলিতেও জড়িয়ে পড়ছেন গিয়াস বাহিনীর সদস্যরা।

অভিযোগ উঠেছে, গিয়াস বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ করায় শতাধিক পরিবারের ৭ শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। সন্ত্রাসী গিয়াস বাহিনীর সদস্যদের দমন না করে উল্টো সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে হয়রানি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে টেকনাফ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রবাসী মো. তৈয়বকে (৩৮) ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে লাশের উপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করে গিয়াসসহ তার বাহিনীর সদস্যরা। দাবিকৃত চাঁদা না দিয়ে গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করায় তাকে হত্যা করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় গিয়াসকে প্রধান আসামি করে ২৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করে নিহতের পরিবার।

নিহতের ভাই জাকের হোসেনের অভিযোগ, গিয়াসসহ হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে থাকলেও তাদের গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। উল্টো হত্যা মামলার সাক্ষীসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে ঘর পুড়ানো ও চাঁদাবাজির পৃথক দুটি মিথ্যা মামলা রেকর্ড করেছে। টেকনাফ থানায় নতুন পুলিশ সদস্যদের যোগদানের পরই এসব মামলা করা হয়েছে। এখন পুরো পরিবার নিয়ে তারা এলাকা ছেড়েছেন।

জাকের একুশে পত্রিকাকে বলেন, গিয়াস বাহিনীর পক্ষ নিয়ে পুলিশ আমার করা মামলার সাক্ষী ও আমার আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। এসময় গিয়াসসহ আমার ভাইয়ের হত্যা মামলার আসামিদের অনেকেই পুলিশের সঙ্গে ছিল। অথচ তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

স্থানীয় শাহ আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, গিয়াস বাহিনী একে একে আমার পরিবারের ৬ জনকে হত্যা করেছে। এরমধ্যে চারজন আমার আপন ভাই। একজন চাচাতো ভাই। অপরজন বোন জামাই। চাঁদা না দেয়ায় ও তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বাধা দেয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে।

শাহ আলমের অভিযোগ, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করলেও পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করছে না। উল্টো আমার পরিবার ও শতাধিক আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে অন্তত ১২টি অপহরণ ও চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। মামলাগুলোর বাদী হয়েছেন হত্যার আসামি গিয়াসের ভাইয়ের ও বাহিনীর সদস্যরা। এ কারণে আমার দুই শতাধিক আত্মীয়-স্বজন এলাকা ছেড়েছেন।

রঙ্গিখালীর একজন পরিবহন শ্রমিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, গিয়াস বাহিনীর প্রধান গিয়াস আমার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। টাকা দিতে না পারায় আমার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় গিয়াস বাহিনীর লোকজন। এরপর আমার স্ত্রীকে আটকে রেখে টানা তিনদিন ধর্ষণ করেন গিয়াসসহ আরও কয়েকজন মিলে। পরে ২শ’ ইয়াবাসহ আমার স্ত্রীকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারছি না।

হৃীলা রঙ্গিখালী এলাকার কলেজ পড়ুয়া একজন ছাত্রী একুশে পত্রিকাকে বলেন, গিয়াস বাহিনীর ধর্ষণের হুমকির কারণে আমরা দুই বোন দীর্ঘদিন ধরে ঘরবাড়ি ছেড়ে এক প্রকার মানবেতর জীবনযাপন করছি।

তিনি আরও বলেন, ওসি প্রদীপের ঘনিষ্ঠ ছিল গিয়াস। গত রমজান মাসে চাঁদা না দিয়ে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে গিয়াস বাহিনীকে প্রতিরোধের ঘোষণা দেন আমার মামারা। এর দুইদিনের মাথায় আমার দুই মামাকে হাত কেটে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে গিয়াস বাহিনী। পরে কোটি টাকার বিনিময়ে প্রদীপকে ম্যানেজ করে ডাকাত ও ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে চালিয়ে দেয়া হয়।

ওই ছাত্রী বলেন, সে সময় লাশের ছবিসহ প্রতিবাদ জানিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে ফেসবুকে আমি একটি পোস্ট দিই। এরপর আমাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করার ঘোষণা দেন গিয়াস বাহিনীর প্রধান গিয়াস। সে থেকে আমি ও আমার বোন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

তার অভিযোগ, টেকনাফে যোগ দেয়া নতুন পুলিশ সদস্যরাও গিয়াস বাহিনীর পক্ষ নিয়ে আবারও সাধারণ মানুষকে হয়রানি শুরু করেছে। এ কারণে তিনি এখনো এলাকায় ফিরতে ভয় পাচ্ছেন।

গিয়াস বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের সব অভিযোগই সত্য বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আবুল হোসেন মেম্বার। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, টেকনাফে গিয়াস বাহিনীর শাসন চলে। এখানে তারা দিনদুপুরে খুন করে, ডাকাতি করে। কেউ ভয়ে মামলা করতে থানায় যায় না। স্থানীয় সাংবাদিকরা ভয়ে পত্রিকায় ছাপায় না। অনেকেই আছে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে সংবাদ পরিবেশন করেন। পুলিশের সাথেও সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক ভালো।

তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই যে আমি তাদের বিরুদ্ধে বলতেছি হয়তো কাল এ কারণে আমাকেও তারা হত্যা করতে পারে। আমার এক ভাইকে একই কারণে গিয়াস বাহিনী হত্যা করেছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে, গিয়াস বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তাদের করা একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। একেক জনের বিরুদ্ধে ১৫-২০টি করে মামলা রয়েছে। এরপরও এসব সন্ত্রাসীদের সাথে টেকনাফ থানার এসআই মিল্টন, এসআই রাফিকে উঠাবসা করতে দেখছেন তারা।

গিয়াস বাহিনীর উত্থানের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে শাহাজাল ও ছৈয়দুল আমিন নামের দুইভাইকে এক সঙ্গে গুলি করে হত্যা ও লাশের উপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করে উল্লাস করে প্রথম আলোচনায় আসে গিয়াস বাহিনী। অভিযোগ আছে, গত পাঁচবছরে ১৩ জন স্থানীয় বাসিন্দা ও অসংখ্য রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে তারা। অপহরণ পরবর্তী মুক্তিপণ, দাবিকৃত চাঁদা না দেয়া ও অপরাধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার কারণে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

জানা গেছে, গিয়াস উদ্দীনের সন্ত্রাসী বাহিনীতে তার ভাই মিজানুর রহমান প্রকাশ বাঘাশাই ডাকাত, রেজাউল করিম প্রকাশ পুতিয়া ডাকাত, নাছির উদ্দীন, বোরহান উদ্দীন প্রকাশ আম্মুনি, সরওয়ার, রহিম, আনোয়ার হোসেন প্রকাশ লেডাইয়া ডাকাতসহ ৩০ থেকে ৪০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন।

আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, গিয়াস বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যেকের নামে ১০ থেকে ১৯টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগই হত্যা, ইয়াবা, ডাকাতি, অস্ত্র, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় কক্সবাজার জেলায় আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানে সন্ত্রাসী ও ইয়াবা কারবারিদের অনেকেই বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলেও রহস্যজনক কারণে ‘ফুলের আচড়ও’ লাগেনি সন্ত্রাসী গিয়াস বাহিনীর কোনো সদস্যদের গায়ে।

অথচ সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক একাধিক ইয়াবা সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করেন গিয়াস উদ্দীন ও তার পরিবার। বাহিনীর প্রধান গিয়াস উদ্দীন, তার পিতা গুরা মিয়া, তার দুই মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যদের একাধিক ইয়াবার মামলাও রয়েছে।

সন্ত্রাসী গিয়াস বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ট পরিবারগুলোর দাবি, গিয়াস বাহিনী পুলিশের সাথে সু-সম্পর্ক রাখতে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করে। পাশাপাশি পুলিশকে সামলাতে কলি নামের এক বোনকেও ব্যবহার করে থাকেন গিয়াস। এ কারণে এ বাহিনীর কেউ ‘ক্রসফায়ারে’ মারা যাননি।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে গিয়াস উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এ প্রতিবেদক। কিন্তু কোনো বক্তব্য দিতে রাজী হননি গিয়াস। পরে সংবাদ পরিবেশন না করার শর্তে যুবলীগ নেতা পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিবেদককে দুই লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা পুলিশ সদস্যরা সবাই এখানে নতুন। এ কারণে পুলিশ এখনো অনেককে ভালোভাবে চিনে উঠতে পারেনি। এরপরও সন্ত্রাসীদের সাথে পুলিশ অফিসারদের সম্পর্কের বিষয়টি যাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দায়ের প্রসঙ্গে ওসি বলেন, মামলাগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না। একই সাথে সন্ত্রাসী গিয়াস বাহিনী সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, পুলিশের সাথে সন্ত্রাসীদের ওঠা-বসার অভিযোগটি আমি অবগত নই। বিষয়টি যাছাই করা হবে। আর রঙ্গিখালীর সন্ত্রাসী গিয়াসের বাহিনীর বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। সন্ত্রাসী যে-ই হোক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, র‍্যাব সবসময় মাদক ও সন্ত্রাস দমনে বদ্ধপরিকর। গিয়াস বাহিনী সম্পর্কে কয়েকজনের কাছ থেকে শুনেছি। র‍্যাব সন্ত্রাসীদের খোঁজখবর রাখছে, তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করছে। সন্ত্রাসী যত বড় বা যে দলের হোক না কেন কঠোরভাবে দমন করা হবে।