বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

রাঙ্গুনিয়ার শিক্ষকের উদ্ভাবন, সফটওয়্যার ‘বাঁচাবে’ সময় ও খরচ

প্রকাশিতঃ বুধবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২০, ৯:৪৬ অপরাহ্ণ


নুরুল আবছার : বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ইউনিয়নের ভূমিরখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল্লাহ সরোয়ার।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন অধিদপ্তর ও মাঠ পর্যায়ে উদ্ভাবনী ধারণা এবং ক্ষুদ্র উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইপি) পাইলটিং বাস্তবায়নের জন্য ‘অনুমোদিত উদ্ভাবন তালিকায়’ সপ্তম স্থানে রয়েছে শিক্ষক সাইফুল্লাহ সরোয়ারের এ উদ্ভাবনটি।

এছাড়া বিদ্যালয় ভিত্তিক উপবৃত্তি সংক্রান্ত (ডাটাবেজ), নাম্বারশীট ক্রিয়েটর সফটওয়্যার (পিইসিই), প্রাথমিক শিক্ষায় কম্পিউটার শিখন, ক্রোমকাস্ট ডিভাইস ব্যবহার করে শ্রেণিতে পাঠদান, গুগলড্রাইভ ব্যবহার করে তথ্য প্রদান ও সংরক্ষণ, পরীক্ষার ফলাফল তৈরি (ডাটাবেজ) সফটওয়্যারসহ আরও ছয়টি উদ্ভাবনী ধারণা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত ‘ইনোভেশন সেল’- এর আইডিয়া বক্সে জমা দিয়েছেন সাইফুল্লাহ সরোয়ার।

শিক্ষক সাইফুল্লাহ সরোয়ারের দাবি, তাঁর বানানো ‘উপবৃত্তি তথ্য প্রক্রিয়াকরণ’ সফটওয়্যারটি ব্যবহারের ফলে হিসাব-নিকাশে শতভাগ নির্ভুলতার পাশাপাশি ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সময়-অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। অপরদিকে ‘বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা’ সফটওয়্যারটি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার বিষয়ে জ্ঞানলাভে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।

উদ্ভাবনী কাজের প্রথমে উপবৃত্তির জন্য (ডাটাবেজ) সফটওয়্যারটিই তৈরি করেছিলেন এ শিক্ষক। উপবৃত্তির জন্য ছবি তোলাসহ বেশকিছু কাজ থাকে যাতে অর্থ-সময় দু’টাই অপচয় হয়। এক নাগাড়ে তিন বছরের প্রচেষ্টায় তৈরি করা এ সফটওয়্যারটি সরকারি স্বীকৃতি না পেলেও কখনও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। বরং সেটাকে কীভাবে আরও সমৃদ্ধ করে কাঙ্কিত সফলতা পাওয়া যায় সে লক্ষ্যে এখনও অহর্নিশ ছুটে চলছেন তিনি।

‘বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা’ সফটওয়্যার উদ্ভাবনের নেপথ্যের গল্প জানতে চাইলে শিক্ষক সাইফুল্লাহ সরওয়ার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজের চাপ থাকে অনেক সময় বেশি। এজন্য বিদ্যালয় ছাড়াও বাসা গিয়ে কাজ করতে হয়; ফলে শ্রেণীকক্ষেও এর প্রভাব পড়ে। বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মূল নিয়ামক শ্রেণীকক্ষে পাঠদান। এখানে যথাযথ মনোনিবেশ করা না গেলে আশানুরূপ ফল আসে না। মূলত এসব কাজকে প্রযুক্তির সাহায্যে কীভাবে দ্রুত সময়ে শেষ করা যায় সে-ই তাগাদা থেকেই আমি উদ্যোগ নিই এ সফটওয়্যারটি তৈরি করার।’

কী কী সেবা রয়েছে এ ‘বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা’ সফটওয়্যারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- এটি ব্যবহার করে সহজেই বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে যেমন: ছবিযুক্ত বই বিতরণ রেজিস্টার, ছবিযুক্ত ভর্তি রেজিস্টার। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বয়ংক্রিয় ব্যালট পেপারসহ স্টুডেন্ট কাউন্সিল সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম করা যাবে। শিক্ষার্থীরা সহজেই ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

এছাড়া শ্রেণিভিত্তিক ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকাশ, পাঠোন্নতি বিবরণ, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ডিআর(পঞ্চম), ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর বয়স ও শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীর তথ্য, ভর্তির ধরণ ও ধর্ম ভিত্তিক তথ্য, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ভোটার তালিকা প্রিন্ট, শিক্ষকের সাধারণ তথ্য ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য, বেতন প্রাপ্তি স্বীকার পত্র প্রিন্ট ও সংরক্ষণ, ওয়ান ডে ওয়ান ওয়ার্ড ডিকশোনারিতে শব্দ সংরক্ষণ ও উপকরণ হিসেবে প্রিন্ট, শিশু জরিপ তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যালোচনা, শিক্ষার্থীদের দৈনিক উপস্থিতি সংরক্ষণ ও শতকরা হার জানা যাবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, শিক্ষক সাইফুল্লাহ সরোয়ার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার যে চর্চা করে যাচ্ছেন তাতে অপরাপর শিক্ষকরা অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে আসবেন। এ উদ্ভাবনী চর্চার ধারা অব্যাহত থাকলে প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার গতি ত্বরান্বিত হবে বহুগুণ, এগিয়ে যাবে বহুদূর। ফলে একসময় দেশের প্রাথমিক শিক্ষার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জন হবে।

এদিকে নিজের তৈরি করা প্রজেক্ট সরকারি অনুমোদন পাওয়ায় খুবই গর্ববোধ করছেন জানিয়ে সাইফুল্লাহ সরোয়ার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় এ ডাটাবেজ সফটওয়্যারটি গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে; এমনকি শিক্ষার্থীদের ‘কম্পিউটার’- এর ব্যবহারিক বিষয়ে জ্ঞানার্জনেও সহায়ক ভুমিকা রাখবে।

‘তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষিত জাতি গঠন করতে হলে প্রাইমারি পর্যায় থেকে আইসিটি শিক্ষা চর্চার উপর জোর দিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সহযাত্রী হতে গেলে আইসিটি শিক্ষা ও চর্চার বিকল্প নেই।’ যোগ করেন শিক্ষক সাইফুল্লাহ সরোয়ার।

প্রসঙ্গত, সকল শিশুর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর। শুরু থেকে এ পর্যন্ত যেসব উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সেসবের বেশিরভাগই এখন অবদান রাখতে শুরু করেছে।