শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭

পদ্মা অয়েলের ২২তলা ভবনের একতলা করতেই ৭ বছর পার!

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ২০, ২০২০, ৫:৫৪ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও আলোর মুখ দেখেনি পদ্মা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণকাজ। করোনাকালে প্রায় সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর আগ্রহে নতুন করে নকশা পরিবর্তনজনিত কারণে চলতি বছরের ১২ আগস্ট থেকে বন্ধ রয়েছে প্রকল্পের কাজ।

ভবন নির্মাণে দফায় দফায় অর্থায়ন বাড়লেও গত চার বছর ধরে নির্মাণ কাজ ঠেকে আছে এক তলাতেই। ফলে সদরঘাটে নিজেদের জরাজীর্ণ স্থাপনাতেই প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী এই প্রতিষ্ঠানটিকে।

এদিকে, প্রকল্পের অর্থায়ন ও খরচের হিসেবেও রয়েছে হেরফের। ৩১ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা বলে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রকল্পের বিল নেওয়া হলেও কাজ হয়েছে ২৪ শতাংশ। প্রকল্পের কনসালটেন্ট খরচ এবং ঠিকাদার বিল বাবদ ইতোমধ্যে খরচ হয়েছে পুরো প্রকল্পের নির্ধারিত ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি।

বেসমেন্টসহ মাত্র একতলা ভবনের নির্মাণে ইতোমধ্যে খরচ হয়েছে ৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যেখানে পুরো প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০১ কোটি ৯০ হাজার টাকা। অবশিষ্ট অর্থে বাকি ২২ তলা ভবন নির্মাণ করা কি আদৌ সম্ভব? -এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

তবে, প্রতিমন্ত্রীর ইচ্ছে মেটাতে গত ১৯ নভেম্বর জরুরি বৈঠকে বসে টেকনিক্যাল কমিটি। বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছিল নকশা পরিবর্তন ও কনসালটেন্ট নিয়োগের বিষয়টি। নকশা পরিবর্তনের জন্য আমেরিকান জয়েন্ট ভেনচার কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও নতুন কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে স্থপতি আহসান হাবিবকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবনের পাইলিং এবং বেসমেন্টের কাজ শেষ হতে না হতেই এমন আকস্মিক নকশা পরিবর্তনের কারণে বাড়বে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়। নকশা পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াবে আনুমানিক ১২২ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। আর সময় লাগবে আরো ৪ বছর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) মিটিংয়ে অনুমোদিত ৬৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালে প্রকল্পটি হাতে নেয় পদ্মা অয়েল। ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অজানা কারণে থমকে যায় সেই প্রকল্পের কাজ।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ৩৩ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১০১ কোটি ৯০ হাজার টাকায় প্রকল্পটি পুনরায় অনুমোদন দেয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। একই সাথে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে ভবনের নির্মাণ কাজ বারবার থমকে যাওয়ার কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত নকশা অনুমোদন ও পরিবর্তন এবং সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান একুশে পত্রিকাকে বলেন, নির্মাণাধীন স্থাপনার কাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে নকশা পরিবর্তন করা যেতেই পারে। তবে তা অবশ্যই হতে হবে পরিকল্পিত। কিন্তু এই স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও সমন্বিত সিদ্ধান্তের অভাব ছিল। যার কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয় যেমন বেড়ছে তেমনি হচ্ছে অপচয়। এতো বড় সমন্বয়হীনতার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না।

এদিকে, পদ্মা ওয়েলের নির্মাণাধীন ভবনটির কাজ স্থগিত থাকার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে মাদকসেবি ও মাদকবিক্রেতারা। সন্ধ্যার পর নির্মাণাধীন ভবনটিতে মাদকের জমজমাট আড্ডা ও বিকিকিনি বসে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শনিবার (১৯ ডিসেম্বর) সরেজমিনে পদ্মা অয়েল নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সামনের প্রবেশ মুখে তালা ঝুলানো থাকলেও আরক্ষিত ছিল পেছনের প্রবেশপথ। দুজন সিকিউরিটি গার্ড এবং একজন টেকনেশিয়ান থাকার কথা থাকলেও কাউকেই দেখা যায়নি। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফেনিসিডিলের বোতলসহ বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের উচ্ছ্বিষ্টাংশ।

দেখা যায় ২৩ তলা ভবনের নির্মাণ কাজের মধ্যে সবেমাত্র শেষ হয়েছে ২টি বেসমেন্ট, ১টি সেমি বেসমেন্ট ও ১ তলার কাজ। নির্মাণ কাজ স্থগিত থাকার কারণে অযত্নে থাকা সরঞ্জামের অধিকাংশই ইতোমধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে।

সিকিউরিটি গার্ড সল্পতার কারণে মাদকসেবিদের আনাগোনার কথা স্বীকার করেছেন প্রকল্প তত্তাবধয়ক ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ স্থগিত থাকার কারণে আগে মাদকাসক্তদের আনাগোনা ছিল এই জায়গায়। দুজন সিকিউরিটি গার্ডের মধ্যে একজন অসুস্থ থাকার কারণে হয়তো পুরো ভবনের দেখাশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আমি আজই বিষয়টি দেখছি। প্রয়োজনে সিকিউরিটি গার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি করার কথা জানান এই কর্মকর্তা।

প্রকল্পের ধীরগতির এবং নাকশা পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক নোমান আহমদ তাপাদার।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর আগ্রহেই ভবনের নকশা পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আধুনিক সুবিধা সম্বলিত একটি ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। খুব তাড়াতাড়ি প্রকল্পের সময়সীমা বাড়িয়ে পুনরায় কাজ শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যেসকল কর্মকাণ্ড ঘটছে সেই ব্যাপারে আমি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে নির্মাণাধীন ভবনটি মনিটরিং করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।