শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭

আনোয়ারা শেভরণে ভুল রিপোর্টের ছড়াছড়ি!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২২, ২০২০, ১১:১০ অপরাহ্ণ


আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি : রোগশোকে আক্রান্ত মানুষের সঠিক রোগনিরূপণের জন্যই মূলত ডায়াগনোসিস। সঠিক ডায়াগনোসিসের উপর নির্ভর করে রোগীর নিরাময়। ডায়াগনোসিস পরীক্ষার সঠিক রিপোর্ট বাতলে দেয় রোগীর গতিপথ। সেই পথ ধরে হয় রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। কিন্তু সেই রিপোর্ট যদি হয় ভুলেভরা তাহলে রোগীকে বরণ করতে হয় কখনো কখনো ভয়াবহ ভাগ্যবরণ।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আনোয়ারা চাতরী চৌমুহনীতে অবস্থিত শেভরণ ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক ভুল রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ। আনোয়ারা বৈরাগ এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার স্ত্রীকে ৬ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা শেভরণে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাছিমার চেম্বারে নিয়ে যাই। তিনি আমার স্ত্রীকে ডায়বেটিস পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। পরীক্ষার পর শেভরন রিপোর্ট দেয় ডায়বেটিস বেশি। পরে আমার সন্দেহ হলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ সাঈদের কাছে যাই। তার পরামর্শে চাতরী চৌমুহনীতে অবস্থিত পপুলারে পরীক্ষা করালে রিপোর্টে ডায়বেটিস ধরা পড়েনি।

উপজেলার কালাবিবির দিঘী এলাকার ফারুক জানান, গতমাসে তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর আল্টাসনোগ্রাফি করানো হয় শেভরণ থেকে। তাদের রিপোর্টে বলা হয়, পেটের বাচ্ছার পজিশন ভালো নয়, তাই সিজার (অস্ত্রোপচার) করতে হবে। একথা শুনে উদ্বিগ্ন ফারুক স্ত্রীকে নিয়ে ছুটলেন এবার চট্টগ্রাম শহরে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করান অন্য ল্যাবে। ওই ল্যাব রিপোর্ট দেয়, পেটের বাচ্চা স্বাভাবিক আছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এক সপ্তাহের মধ্যেই ফারুকের স্ত্রী অস্ত্রোপচার ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেন।

শেভরণের ভুল রিপোর্টের শিকার আরেক ভুক্তভোগীর নাম এরশাদুল ইসলাম। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, আমি কয়েকমাস আগে অসুস্থবোধ করলে শেভরণে অবস্থিত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মহিউদ্দিনের চেম্বারে যাই। তিনি আমাকে জন্ডিস পরীক্ষার পরামর্শ দেন। শেভরণের বিলিরুবিন (জন্ডিস) পরীক্ষা করালে তারা রিপোর্ট দেয় আমার বিলিরুবিন নাকি ১০ এর উপরে। এ অবস্থায় কী করবো আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। পরে অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিই। তিনি বললেন, আপনার তো জন্ডিসের কোনও আলামত দেখছি না, তারপরেও আপনি আরেকবার জন্ডিস পরীক্ষা করান। তখন চট্টগ্রাম শহরে অন্য একটি ল্যাবে পরীক্ষা করে জানতে পারি আমার কোনও জন্ডিস নেই।

তিনি বলেন, শেভরণের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা আমরা আশা করিনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চিকিৎসার নামে তারা মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। পক্ষান্তরে মানুষের কাছ থেকে অন্য ল্যাবের চেয়ে দ্বিগুণ ফিও আদায় করছে তারা।

এছাড়া আনোয়ারার গুয়াপঞ্চক এলাকার বাসিন্দা নুরজাহান গত বছর ছেলে নাবিলের (১০) জ্বর হলে তাকে শেভরনের এক চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যান। শেভরনে ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেন ওই চিকিৎসক। রিপোর্টে নাবিলের ডেঙ্গু পজিটিভ বলে উল্লেখ করে শেভরণ। পরে নুরজাহানের সন্দেহ হলে চট্টগ্রাম শহরে আরেক ল্যাবে ডেঙ্গু পরীক্ষা করান। কিন্তু সেখানে আসে নাবিলের ডেঙ্গু নেগেটিভ। এব্যাপারে নুরজাহান তার ভাইকে নিয়ে শেভরণের ব্যবস্থপনা পরিচালক মীর মোশারফের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য গ্রহণ করা টাকা ফেরৎ দেন।

শুধু তাই নয়, শেভরণের ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করারও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি আনোয়ারা শাখার শেভরণ কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা দুঃখ প্রকাশ করে ফার্মেসীর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

শেভরণ আনোয়ারা শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোশারফ হোসেনের কাছে এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি ফেরেস্তা নই, মানুষ। মানুষের ছোটখাট ভুল হতে পারে। এছাড়া এরশাদুল ইসলাম নামে এক ফেসবুক আইডিতে শেভরনের ভুল রিপোর্টের অভিযোগ এনে দেওয়া পোস্টের প্রসঙ্গে মীর মোশারফ বলেন, মানুষ কেন আমার পেছনে লাগছে জানি না। তবে এখানকার রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও আমার আত্মীয় এটা মনে রাখতে হবে। ফার্মেসীতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ব্যাপারটি ফার্মেসীর কর্মচারীদের ভুল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ প্রসঙ্গে আনোয়ারা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু জাহিদ মোহাম্মদ সাইফউদ্দীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্থ রোগীরা রিপোর্টসহ অভিযোগ দিলে ঘটনা তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা মিললে শেভরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একুশে/জেএ/এটি