বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রেমের গল্পে উপসংহার টানাটাই প্রেম

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০, ৭:২৮ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : এই অসময় কেটে গেলে আরকি আমাদের দেখা হতে পারে/বলো হে প্রিয়মুখ/ বলো হে প্রিয়নাম/আরকি দেখা হতে পারে?’
-রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

প্রিয়তমা, আমাদের কি আদৌ দেখা হবে বা কখনো দেখা হয়েছিল? এই করোনার সময়ে এসে প্রেমের গল্প বলা বেশ মুশকিল। চারদিকে কেমন নিস্তব্দ হয়ে আসছে। কেমন সব জমে আছে। মাস্কপরা মুখে আর যাই হোক প্রেমের আহ্বান মিলে না। এখন আবার শুরু হচ্ছে নতুন করে সংক্রমণ।

এতদিন সেটা দ্বিতীয় ঢেউ নামে থাকলেও এবার জানা গেলো করোনা আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। প্রথমে যুক্তরাজ্যে নতুন ধরনের করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জীবননকশা (হোল জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটিতে নতুন আরেকটি শক্তিশালী অস্তিত্ব মিলেছে। এটির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনের মিল আছে। তবে এটি এখনো অতটা ভয়ংকর নয়। এর প্রভাব কতটুকু, সে সম্পর্কে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। এই একটা ভাইরাস পৃথিবীর সব হিসেব-নিকেষ কেমন করে যেন পাল্টে দিয়েছে। আগের কোনো কিছুই এখন আগের মতো নেই।

মানুষ চাঁদে গেল, চীন চাঁদ থেকে মাটি নিয়ে এসে গবেষণা শুরু করলো, করোনা ভাইরাস মুখোশ তৈরি করে দিলো। তবুও পৃথিবীতে ক্ষমতার জন্য হানাহানি বন্ধ হলো কি? এই যে ট্রাম্প তো এখনো ক্ষমতা ছাড়তেই ছাইছেন না। একে একে তার পর্ষদরা তাকে ছেড়ে গেলেও সে কীভাবে ক্ষমতায় থেকে যাবে তার ফন্দি আঁটছেন। বাংলাদেশ থেকে তার বুদ্ধি নেওয়ার দরকার ছিল বলে সমালোচকরা মনে করছেন।

নতুন করোনা যেমন আসছে, তেমনি করোনার ভ্যাকসিনও আশাবাদী করে তুলেছে তাবৎ বিশ্বকে। কিন্তু অনেকে মেতে রয়েছে বিবি তালাকের ফতোয়া খোঁজার মতো এই ভ্যাকসিন হারাম নাকি হালাল তা নিয়ে। অচিরেই হয়তো বিজ্ঞাপন দেখা যাবে, ‘আমাদের তৈরি কোভিড ১৯ এর ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ হালাল’! অবশ্য ইতোমধ্যে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট যেটি বলেছেন সেটিও কম বিস্ময়ের নয়। বিশ্বে করোনাভাইরাসকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বোলসোনারো। শুরু থেকেই ভাইরাসটিকে নিয়ে তিনি নানারকম বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। এমনকি নিজে আক্রান্ত হওয়ার পরও তার মতের কোনও পরিবর্তন হয়নি। উল্টো এখন বলছেন মানুষ করোনার ভ্যাকসিন নিলে কুমির হয়ে যাবে।

নিজ দেশে টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেই ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট এমন মন্তব্য করেন। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, করোনা ভ্যাকসিন মানুষকে কুমির বানিয়ে দিতে পারে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ছেলেরা মেয়েদের কণ্ঠে কথা বলবে আর মেয়েদের দাঁড়ি উঠবে।’ এ কারণে তিনি নিজে কখনও এই ভ্যাকসিন নেবেন না বলেও জানিয়ে দেন। করোনায় দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে রঙ্গরসিকতাও কম হয়নি। মাস্ককাণ্ড থেকে শুরু করে নানা কাণ্ডে দুর্নীতিও কম নয়।

আসলে সবই রাজনীতি। যতোই মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলি না কেন, মন থেকে যদি না চাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যদি সোচ্চার হওয়া না যায় তবে উন্নয়ন নিরাশার দ্বন্দ্বে হারিয়ে যাবে। অবশ্য রাজনীতি অন্য অঙ্ক। ভারতের বিজেপি নেত্রী এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রায়ই বলতেন, রাজনীতিতে দুইয়ের সঙ্গে দুই যোগ করলে চার হবে তার কোনও মানে নেই। বাইশও হতে পারে।

শীতের আর্দ্রতায় হারিয়ে যায় লাবণ্য, ত্বকের সৌন্দর্য দেখে কারো কারো মন এমনিতেই হারায়। কিন্তু জীবন থেকে যা কিছু হারিয়ে গেছে তা কি কখনো পাওয়া যায়? এই করোনাকালে কতো কতো মানুষ তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে। দেশের কতো মেধাবী সন্তান মৃত্যুবরণ করেছেন। তবুও কারো কারো মৃত্যুর বিতর্ক থেকেই যায়। এই যেমন ঈশ্বরের বরপুত্র বলে পরিচিত আর্জেন্টাইন ফুটবলার ম্যারেডোনার কথায় বলি না কেন?

তার মৃত্যু নিয়ে ফের দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। ম্যারাডোনা দীর্ঘদিন মাদকাসক্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে সর্বশেষ চিকিৎসায় তাঁর শরীরে এই আসক্তির চরমমাত্রায় উপস্থিতিও ধরা পড়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর সর্বশেষ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বলছে, শেষনিশ্বাস ফেলার আগে ম্যারাডোনার শরীরে কোনো মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি। এমনকি অ্যালকোহলের অস্তিত্বও ধরা পড়েনি।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, হৃদরোগে ভুগে ম্যারাডোনা ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে কমপক্ষে ছয় থেকে আটঘণ্টা ভীষণ যন্ত্রণায় ভুগেছেন ম্যারাডোনা। এই যন্ত্রণা বহাল ছিল তাঁর শেষনিশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত। তাঁর শরীরে যেসব ওষুধের অস্তিত্ব মিলেছে, এর সবই খিঁচুনি, পেটের সমস্যা, মাদকাসক্তিসহ মানসিক সব সমস্যার জন্য। কিন্তু ফুসফুস, কিডনি বা যকৃতের চিকিৎসার জন্য কোনও ওষুধের অস্তিত্ব মেলেনি। মৃত্যুর কথা যখন উঠলোই আরেকটি মজার ঘটনা বলি তাইওয়ানের।

আপনারা নিশ্চয় রাজকুমার হিরানীর ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমাটি দেখেছেন। সিনেমাটির একটি দৃশ্যে দেখা যায়, অসুস্থ বন্ধু রাজুকে (শরমন যোশী) সুস্থ করতে নানা মজার কথা বলে চলেছেন দুই বন্ধু র‌্যাজঞ্চো (আমির খান) এবং ফারহান (আর মাধবন)। শেষে সুস্থও হয়ে ওঠে বন্ধু। সিনেমার এই ‘অ্যাকশন রিপ্লে’ এবার দেখা গেল বাস্তব জীবনে। ভাইয়ের মুখে প্রিয় খাবারের নাম শুনে উঠে বসলেন কোমায় থাকা রোগী! শুনতে অবাক হলেও এমনটাই ঘটেছে তাইওয়ানে। প্রিয় চিকেন ফিলের নাম শুনে জ্ঞান ফিরেছে ৬২ দিন ধরে কোমায় থাকা ১৮ বছর বয়সী এক যুবকের।

আহারে এমন করে যদি সব প্রিয় মানুষগুলোকে ফিরিয়ে আনা যেত। আসলে ফিরিয়ে আনা যায় না। কেউ ফিরে না। যারা প্রেমের টানে একবার ঘর ছেড়েছিল, তারাই আবার ফিরে যায় আপন নীড়ে। হাত রাখে আরেক জনের হাতে। আবার যে পাখি ঘর বুঝে না, বনে বাঁদরে ঘুরে বেড়ায়, তাকেও ঘরে ফেরানো কঠিন। তাই মনে হয় প্রেমের গল্পে জয়ী হওয়া বলে কিছু নেই।

প্রেমের গল্পে উপসংহার টানাটাই প্রেম। আমাদের আবার দেখা হবে। সেদিন তোমার মুখে আমি করোনা-কালের এই মাস্ক দেখতে চাই না। দেখতে চাই তোমার ঠোঁটও আল জিভের ওঠাপড়া। একদা-সুস্থ সে কোনও পৃথিবীতে তুমিই তো আমায় শুনিয়ে ছিলে সুধীন দত্তের কবিতা, ‘একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে, ভর করে ছিল সাতটি অমরাবতী।’

করোনা পেরিয়ে একদিন আমরা আবার গোপনে সেই অমরাবতীর সন্ধানে যাব।

শান্তনু চৌধুরী : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক