সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭

১৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দী এলপি গ্যাস!

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০, ৭:৫০ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : বিপুল সম্ভাবনা এবং সরকারের সদিচ্ছা থাকার পরও জ্বালানি পণ্যের বিশেষ করে এলপিজি’র (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) উৎপাদন মাফিয়াচক্রের হাতে বন্দী হয়ে আছে। এলপিজি’র উৎপাদন বাড়াতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও মাফিয়াচক্রের অদৃশ্য কারসাজির কারণে বাস্তবায়ন বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

কারণ, এলপিজি’র বাজার নিজেদের দখলে রাখতে দেশের বেসরকারি খাতগুলোর মালিকেরা মরিয়া। অপরদিকে দুটি সরকারি এলপি গ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে অগ্রগতি নেই কোনও।

এদিকে, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হাতে এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকায় এলপিজির (গ্যাস সিলিন্ডার) দাম নেওয়া হচ্ছে ইচ্ছামতো। ফলে ভোক্তাপর্যায়ে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকায় এই খাতে বিশৃঙ্খলা কাটছে না। দেশের চাহিদার মোট ৯৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি-উৎপাদন-বাজারজাত করছে বেসরকারি কিছু করপোরেট গ্রুপ।

সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান একুশে পত্রিকাকে জানান, তাদের উৎপাদিত ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডারের দাম ভোক্তাপর্যায়ে দাম ৬০০ টাকা। বেসরকারি বিভিন্ন খাতে উৎপাদিত একই ওজনের সিলিন্ডার ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকা।

ফজলুর রহমান জানান, দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের মোট চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ পূরণ করছে বিপিসি। এ অবস্থায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় আউটার রিং রোডের পাশে ১০ একর সরকারি খাস জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। কিন্তু জমির দাম বাবদ ৪৯ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে গেলে বাধ সাধে বনবিভাগ। বনবিভাগ বলছে, ওই জায়গায় বনায়ন করবে তারা। ফলে সেখানেই আটকে আছে বিষয়টি।

এলপি গ্যাস লিমিটেডের শীর্ষ এ কর্মকর্তা আরও জানান, এলপিজির প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য মাতারবাড়িতে ৫০ একর জায়গা পেয়েছে বিপিসি। প্ল্যান্টটি বাস্তবায়িত হলে দেশের চাহিদার ৬০ শতাংশ এলপিজি বা গ্যাস সিলিন্ডার বাজারজাত করতে সক্ষম হবে সরকার।

এদিকে, পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এলপিজির উৎপাদন বাড়াতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্ল্যান্ট স্থাপনে সরকার উদ্যোগ নিলেও অজানা কারণে বিষয়টি এক পা এগোয়, দুই পা পিছিয়ে যায়। সরকারি উদ্যাগকে এগিয়ে নিতে এলপিজির আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকারী বেসরকারি কোম্পানির সাথে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ একাধিকবার বৈঠকও করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

ভোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো দেশে রাজত্ব কায়েম করলেও তাদের পায়ে বেড়ি পরানোর সাধ্য কারো নেই। বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাদের বাধ্য করতে পারছে না বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাগুলোর অসাধু কিছু আমলা তাদের (বেসরকারি খাত) সাথে আঁতাত করেছে।
ভোক্তা ও খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ১১ বছর আগে সরকার পাইপলাইনে গ্যাসের আবাসিক সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে বাজার বিশৃঙ্খলাও জমাট বাঁধছে। বাড়ছে ব্যবহারকারীদের হয়রানি।

জ্বালানি-পণ্যের মূল্য রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করেনি সরকার। এলপিজির মূল্য নির্ধারণের জন্য আইন অনুযায়ী বিইআরসি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যহার নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। গত আগস্টে হাইকোর্টের নির্দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যহার পুনঃনির্ধারণের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয় বিইআরসি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এলপিজির মূল্য নির্ধারণ-প্রক্রিয়া নিয়ে বিইআরসির সদস্যের (গ্যাস) নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। উক্ত কমিটি আগামী ৪ জানুয়ারির মধ্যে মতামত দেবে।’

বিইআরসি’র শীর্ষ এ কর্মকর্তা জানান, উদ্যোগের অংশ হিসাবে আগামী ১৪, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি সরকারি-বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা ও সংশ্লি­ষ্টদের নিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে গণশুনানি হবে। শুনানিতে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে সিলিন্ডারের দাম।

জানা গেছে, এলপিজির দাম পুনঃনির্ধারণে বিইআরসির কাছে বার বার দাবি জানিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর গত আগস্টে উচ্চ আদালতের দ্বারস্ত হয় কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে দাম নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে গড়ায়।

এ ব্যাপারে বিইআরসি’র সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ আবু ফারুক একুশে পত্রিকাকে বলেন, এলপিজির দাম পুনঃনির্ধারণে গণশুনানির আয়োজন করেছি। গত ১৪ ডিসেম্বর স্টেকহোল্ডারদের চিঠি দিয়েছি। আমাদের কারিগরি কমিটি আছে। তারা এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন,

‘এলপিজির মূল্যহারের মানদ- নির্ধারণের জন্য গত ২০ আগস্ট হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের পদ্ধতিটা ভিন্ন। আমরা গ্যাস ও বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণ করি। পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের ট্যারিফ নির্ধারণে আমাদের ম্যান্ডেট আছে। সেটা আইনেই বলা আছে। কিন্তু এটা করার জন্য কিছু পদ্ধতি লাগবে। ২০১২ সালে পদ্ধতিগুলো তৈরি করে অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠিয়েছি। সরকার ওই পদ্ধতিগুলো ঠিক মনে করলে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয় সেটি প্যাকিং করে আমাদের কাছে পাঠালে আইনী দলিলে পরিণত হবে। এরপর সেটি গেজেট আকারে প্রকাশ হলে আমরা পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট বা গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করতে পারব।’

বিআরসি সূত্র জানায়, গত আগস্টে করা ক্যাব-এর রিটের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে জবাব দিয়েছি। সেটি আমলে নেয়নি উচ্চ আদালত। ফলে সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করার জন্য আদালত বিআরসিকে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন। বিষয়টি একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন বিআরসি’র সদস্য (গ্যাস) মোহাম্মদ মকবুল-ই-ইলাহী।

এক দশক ধরে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। উৎপাদন বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিলেও বেসরকারি কিছু অপারেটরের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পণ্যটির মূল্য নির্ধারণ-নিয়ন্ত্রণ করেন তারাই। ফলে বাজারে বিশৃঙ্খলা, একচেটিয়া ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইলে এ ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিসুর রহমান বলেন, ‘সরকারও চায় এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করুক বিইআরসি।

ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিইআরসিকে সরাসরি নির্দেশনাও দিয়েছেন উচ্চ আদালত। তাছাড়া মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি সুপারিশ মন্ত্রণালয় থেকে বিইআরসিতে পাঠানো হয়েছে। আমদানিনির্ভর এ পণ্যের দাম ওঠানামা করায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যহার নির্ধারণ করতে আগামী জানুয়ারিতে গণশুনানি করছে বিইআরসি। এরপর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। কারণ শুনানির মাধ্যমে মূল্যহার নির্ধারণ করলে দুই পক্ষেই স্বস্তি আসবে।’

দেশে ১২-১৩টি বেসরকারি কোম্পানি এলপিজি আমদানি, উৎপাদন এবং বাজারজাত করছে। সেগুলো হল- বসুন্ধরা, ওমেরা, বেক্সিকো, পেট্রোম্যাক্স, টোটাল, বিএম এলপি গ্যাস, এনার্জিপ্যাকের জি গ্যাস, লাফ্স গ্যাস, ইউরোগ্যাস, ইউনিভার্সাল, যমুনা ও সেনা এলপিজি।

জানা গেছে, বসুন্ধরা এলপিজি লিমিটেডের মালিক রেহমান সোবহান। বেক্সিমকো এলপিজি লিমিটেডের মালিক সালমান এফ রহমান। পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেডের মালিক রেজাকুল হায়দার। টোটাল গ্যাস বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মঞ্জুর মোর্শেদ সিদ্দিকী। বিএম এলপি গ্যাস বাংলাদেশ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান, এনার্জিপ্যাকের জি গ্যাস লিমিটেডের চেয়ারম্যান রবিউল আলম। লাফ্স গ্যাস লিমিটেড এর চেয়ারম্যান তিলক ডি সিলভা। যমুনা এলপিজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান শামসুর রহমান। ওমেরা এলপিজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান।