বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

করোনাকালীন শিক্ষাভাবনা : ভাগ্য এখন প্রকৃতির পক্ষে

প্রকাশিতঃ সোমবার, জানুয়ারি ৪, ২০২১, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ


কাজী খাইরুন নেসা : কয়েকদিন ধরে চিন্তা করছি করোনাকালীন লেখাগুলো সবার সাথে শেয়ার করি। অন্য কিছু না পারলেও শিক্ষাক্ষেত্রে কী করছি, না হয় তা-ই একটু লিখি!

১৮ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হল। ১৭ মার্চ ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। কত শত পরিকল্পনা ছিল, আয়োজন ছিল অনেক কিছুর। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সাড়ম্বর অনুষ্ঠান বাদ দেওয়া হল। একান্তই নিজেদের মধ্যে শিক্ষকরা মিলে জন্মদিন পালন করল।

এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, করোনা শীতপ্রধান দেশের রোগ। আমাদেরকে দেখা দেবে না। কিন্তু ভুল প্রমাণিত করে দেশে একটা-দুটো করে রোগী বেড়ে যেতে লাগল। ফলে জাতীয় সংক্রমণ রক্ষা করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সরকারের সুচিন্তিত বিবেচনা কার্যকর হল।

মনে করা হল, যাক না হয় কিছুদিন। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে খুলে দেওয়া হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু ভাগ্য এখন মানুষের পক্ষে নয়। প্রকৃতির পক্ষে। প্রকৃতির পক্ষে বলায় অনেকে মন খারাপ করতে পারেন। সত্যটা আমার কাছে তাই মনে হল।

প্রকৃতি ধ্বংস করে গাছকাটা, যানবাহনের বেপরোয়া ব্যবহার, একটু অক্সিজেনের অভাবে গ্রামে ছুটে চলা-এসবের প্রতি নজর কমে গিয়েছিল। যত্রতত্র অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটে চলা বেড়ে গিয়েছিল। তাই মনে হল, প্রকৃতিমাতা আমাদের কিছুটা ঘরে রেখে শান্ত রাখতে চায়।

মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। করোনা থামার পাত্র নয়। কিন্তু শিক্ষা তো বন্ধ রাখা যাবে না। তাহলে উপায়?

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এইচএসসি পরীক্ষা ছিল। সেটা আপাতত স্থগিত রাখা হল। কী এক উৎকন্ঠা পরিস্থিতি পরীক্ষার্থীদের ঘরে। দিন যায়, রাত পোহায়। অজানা ভয় কাটে না। কিন্তু এভাবে আর কত?

ঘরে বসে কচিমন শিক্ষার্থীদের কিছু একটা করতে হবে। দিনের পর দিন যেই বাচ্চাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় হেসে খেলে বড় হয়েছে, ঘরের চার দেওয়ালের ভিতর বন্দী হয়ে কীভাবে মূর্তির মত বসে থাকবে?

ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধার জন্য এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অনলাইন ক্লাস অল্পবিস্তর শুরু হল। আমি একটু আমার কলেজ দিয়ে শুরু করি। আমার মনে হল শহরের ভিতর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও আমাদের সবধরনের ছাত্র এবং অভিভাবকের অভিজ্ঞতা আছে।

হাজারো মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানের কলেজ, আমাদের এই প্রতিষ্ঠান। ক্লাস শুরুর এক সপ্তাহেই ফোন পেলাম এক সাধারণ ছাত্রীর- ম্যাডাম,তাহলে কি এনড্রয়েড ফোন জরুরি ভিত্তিতে লাগবে, কলেজের ক্লাস দেখার জন্য। আমি বললাম, কেন জরুরি ভিত্তিতে, এই ফোন তো মোটামুটি সবার থাকে। কলেজের করিডোরে হাঁটার সময় প্রায় সব ছাত্রছাত্রীর হাতে এই ফোন দেখতাম।

এখন হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? না ম্যাডাম সবার হাতে দেখেন, কিন্তু সেটা সবার হয় না। দিনের কিছুক্ষণ সময়ের জন্য কলেজে আসি। তাই কারো না কারো ফোন বাবা-ভাই যে কারো ফোন কিছুটা সময়ের জন্য আনা যায়। ওনারাও মনে করেন মেয়ে কলেজে যাচ্ছে, একটু ফোন নিয়ে যাচ্ছে এই আর কী? সেই ফোনে নেটসার্ভিস বেশি থাকার দরকার নেই। হাতে একটা মোবাইল আছে এটাই যথেষ্ট।

‘কিন্তু ম্যাডাম এখন তো মোবাইল থাকলে হবে না, ওটাতে নেট বা এমবিও থাকতে হবে। আর এখন কলেজ বন্ধ, বাসায় তো বুঝানো যাচ্ছে না, মোবাইলে কিসের কলেজ?’

আমি মেয়েটার আত্মস্বীকৃত বাণীতে কলেজের চিত্র কল্পনা করতে থাকলাম। কিন্তু আশা ছেড়ে দেইনি। আশা করছি, কিছু ছাত্রছাত্রী হয়তো সুযোগ পাবে না, কিন্তু বেশিরভাগই অনলাইনের আওতায় চলে আসবে।

দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এপ্রিল মাসেই অনলাইন ক্লাস শুরু করে দিল। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের প্রতিটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো। এপ্রিলে করোনা চট্টগ্রামে মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। তাই সবার মনে হচ্ছিল হয়তো রমজান মাসে করোনার প্রভাব কমে যেতে পারে। তাই বন্দর নগরীর লোকজন নিজেদের একটু নিরাপদ মনে করতে লাগল। সরকারও মনে করল ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের হাতে টাকাপয়সার সংকট, খরচের মত নানা সমস্যা। তাই আগে মার্কেট ও পরে মসজিদ খুলে দিল। (চলবে)

কাজী খাইরুন নেসা : সিনিয়র প্রভাষক, ওমরগণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ