বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

করোনায় শিক্ষাভাবনা : ঝরাঝীর্ণ উড়িয়ে ‘নতুন’ আহ্বানের সুযোগ হল না

প্রকাশিতঃ বুধবার, জানুয়ারি ৬, ২০২১, ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ


কাজী খাইরুন নেছা : শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। নিজে বাঁচুন। দেশকে বাঁচান। অগ্নিস্নানে সূচি হোক ধরা- না ধরাকে রক্ষা করা যাচ্ছে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল ১৬ মার্চ ২০২০। করোনার মরণকামড় ও সংক্রমণ রোধকল্পে সরকারি ছুটির মেয়াদ ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিল।

দিন যতই এগিয়ে আসছে তত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের উৎকন্ঠা বেড়ে যাচ্ছে। তখনই ২২ মার্চের দিকে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি জানিয়ে দিল এইচএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি স্থগিত।

কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে গাইডের পরীক্ষার্থীদের সাথে ফোনালাপ বেড়ে গেল, যাতে ওরা হতাশায় না ভোগে। ওদের অনেকে বাড়িভাড়া করে থাকে ব্যাচেলর হিসাবে। পরীক্ষা না হলে শুধু শুধু বাড়ি ভাড়া দিয়ে খরচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার অনেকে টিউশন করে, যেগুলো আপাতত বন্ধ। গ্রামের বাড়ি যেতে হবে? বা কী করতে হবে? এখন যদি পরীক্ষা শেষ না হয় নতুন করে কাজগুলো শুরু করতে পারবে না!

ধৈর্য্য ধরা ছাড়া বিকল্প নেই! ওদের বুঝানোর চেষ্টা করলাম। নিজেদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি পরিবারের সবার শারীরিক সুস্থতা কামনা করতে বললাম।

ওদের না হয় ছোট বলে এই টুকুতে বুঝ দেওয়া গেল। কিন্তু বুঝাতে গিয়ে নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেললাম অনার্স ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে। ওদের মাত্র ৪টা পরীক্ষা শেষ হয়েছে। অনার্স ফাইনাল বলে ওরা শুধু আর ওদের সম্পদ নয়। ওদের দিকে চেয়ে আছে ওদের ছোট ভাইবোন আর একটা গোটা পরিবার বাবা-মা, আত্নীয়স্বজনসহ আরো অনেকে।

সন্তানের পরীক্ষা শেষ হলে চাকরির ইন্টারভিউ, পরিবারের কত স্বপ্ন! সেখানে ছেলেই অসহায়ের মত অর্থাভাবে দিন কাটাচ্ছে উৎকন্ঠায়। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে? কী বলে সান্ত্বনা দেবে! তবুও বড় চিন্তা- ‘তোমরা আগে সুস্থ, স্বাভাবিক থাকো’- এটাই সবার আগে। এভাবেই তাদের সাথে কথোপকথন চালিয়ে সান্ত্বনা খুঁজে বেড়াই।

তাদেরকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত সাহস ধরে রাখার উপদেশ দেওয়া ছাড়া আর কিছু বলার নেই। সবার অর্থনৈতিক সংকট তা নয়, কিন্তু তারা করবেটা কী? বারে বারে একই প্রশ্ন। এলোমেলো জীবন। আমার এই কথাগুলো শুধু ছাত্র-শিক্ষকের আলাপের কিছু অংশ, যা আমার মনে হয়েছে বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী আর তাদের শিক্ষকের মাঝেও হয়েছে। আমি পরবর্তীতে আমার জনাকয়েক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাদের অবস্থা কী? বিশেষ করে অনার্স ছাত্র-ছাত্রীদের। উনারাও আমাকে এই ধরনের উত্তর দিলেন। মনে হল আসলেই সমস্যা সবার কাছাকাছি!

যান্ত্রিক জীবনের আরেকটা চিত্র খুব চোখে পড়ে গেল। প্রতিদিনের ব্যস্ত নগরীর যাযাবর জীবনের ভিন্নচিত্র। রাস্তাগুলো দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছিল শত শত যাত্রীবাহী, মালবাহী গাড়ি। গাড়িতে পরিপূর্ণ সেই রাস্তাগুলো নিথর, নিশ্চুপ। এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চড়ে বা পায়ে হেঁটে আসা হাজারও ছাত্র-ছাত্রীর পদচারণায় মুখরিত ছিল প্রিয় ক্যাম্পাস। তারাও আর আসে না, রাস্তাগুলো খালি। নীরবে নিজেদের কিছুটা হালকা মনে করছে কি? তাহলে সেই শত যাত্রীবাহী রাস্তাগুলো! প্রকৃতি যেন রাস্তাকে বলছে, যা তোরা একটু নিশ্বাস নেয়!

নেই কোনও গাড়ি চলাচল, নিত্যদিনের শত চেনা আসা-যাওয়ার পথে। নিতান্তই যাদের বের না হলেই নয়, তারা কিন্তু কোনওভাবে কষ্ট করে যাতায়াত করছে। ব্যস্ত নগরীতে গাড়ির হর্ণে কান ঝালাপালা হয়নি, এরকম খুব কমই আছে। কোথায় সেই হর্ণ এখন! এর মাঝে চট্টগ্রাম শহরের শিক্ষকদের গেল দুটো উৎকন্ঠার দিন। সিটি কর্রপোরেশন নির্বাচন হবে। ডিউটি করতে হবে। তাই মার্চের শেষে যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, কিন্তু করতে হয়েছিল নির্বাচন ট্রেনিং। যদিও শেষ পর্যন্ত সে নির্বাচনও স্থগিত হয়েছিল।

এলো এপ্রিল মাস। বাঙালির পহেলা বৈশাখ। প্রতিবছর নানা রঙে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন চলে। উৎসবমুখর সেই পরিবেশ কি আর আসবে বাঙালির কাছে? নিজেকেই প্রশ্ন করি। কলেজে, বাচ্চাদের স্কুলে, রাস্তাঘাটে কত কত বর্ণিল আলোকসজ্জা, সাথে নিজেদের সজ্জা। করোনা সবকিছু থামিয়ে দিল। মনের ইচ্ছে চেপে রেখে মুখে সবাই সবাইকে সেই ভার্চুয়ালি শুভ কামনা জানাচ্ছে-শুভ নববর্ষ।

পেলাম কি আমরা একটা শুভবর্ষ! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা বাড়িয়ে দিল ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। ১০ এপ্রিল জারি হল ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাচ্চাদের ঘরে রাখুন, নিরাপদে থাকুন।

নাগরিক-জীবনের অনুষ্ঠানে পড়ল আরেক প্রভাব। ঐতিহ্যে বিশ্বাসী, আচার, রীতিনীতি পালনে বাঙালির সামাজিক অনুষ্ঠানে এলো ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা। যেহেতু জনসমাগম বন্ধ তাই কমিউনিটি সেন্টারগুলোও বন্ধ। বৈশাখ সব ঝরাঝীর্ণ উড়িয়ে নতুন করে আহ্বান জানায় সবকিছুকে। কিন্তু করোনা সেটা করারও সুযোগ দিল না। (চলবে)

কাজী খাইরুন নেছা : সিনিয়র প্রভাষক, ওমর গণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।