সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭

দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে চসিক’র ফের বিলবোর্ড বাণিজ্য!

প্রকাশিতঃ বুধবার, জানুয়ারি ৬, ২০২১, ৭:০৮ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : উন্নয়ন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের নামে অভিনব পদ্ধতিতে বিলবোর্ড বসাচ্ছে চসিক। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের জন্য নগরের আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের জিইসি থেকে লালখান বাজার অংশের ঠিক নিচে বসানো হচ্ছে ডিজিটাল টিভিস্ক্রিন। আর এ ক্ষেত্রে তারা চুক্তি করেছে ম্যাক্স গ্রুপের সাথে। চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

যে চসিকের বিলবোর্ড উচ্ছেদে অভিযানের কারণে বিলবোর্ড নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেয়েছিল নগরবাসী, পুনরুদ্ধার হয়েছিল শহরের সৌন্দর্য সেই চসিক থেকেই বিলবোর্ড স্থাপনের এমন সিদ্ধান্তে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে নগরজুড়ে।

২০১৬ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালুর মধ্য দিয়ে বিলবোর্ড অপসারণে টানা অভিযান পরিচালনা করে নগরীকে বিলবোর্ডমুক্ত করেছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সেসময় নগরীতে নতুন করে আর কোনো বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

বিলবোর্ডমুক্ত করে নগরের হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দৃঢ় অবস্থানের পথ ধরে বর্তমান প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমও কথা বলেছিলেন একই সুরে।

প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেই বিলবোর্ডে আকাশের নীলিমা আর পাহাড়ের সবুজ ঢাকতে না দেয়ার অঙ্গিকার করেছিলেন খোরশেদ আলম সুজন। কারও প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও সেসময় জানিয়েছিলেন সুজন।

এদিকে, মেয়র হলে বিলবোর্ড থাকবে কি থাকবে না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নগর পরিকল্পনাবিদ, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণীপেশার মানুষের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। গত বছরের ১৮ মে বিলবোর্ড সংক্রান্ত একুশে পত্রিকার সাথে এক আলোচনায় ব্যক্তিগতভাবে বিলবোর্ডের বিপক্ষে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের জিইসি থেকে লালখান বাজার অংশের নিচে ডিজিটাল বোর্ডের জন্য বেশকিছু ফ্রেম বসানো হয়েছে। আনুষঙ্গিক কাজও প্রায় শেষের দিকে। বাকি শুধু টিভিস্ক্রিন বসিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা।

তবে দামপাড়া ওয়াসা এবং নার্সারি পুনাক ভবনের সামনে ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে বেশকিছু ডিজিটাল স্ক্রীন। নতুন এই বিলবোর্ডে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনও প্রচার করতে দেখা গেছে। এর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য স্ক্রিনগুলোতে দেওয়া ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করতে আহ্বানও জানানো হচ্ছে।

এদিকে, সদ্য চালু হওয়া ডিজিটাল স্ক্রিনগুলো নিয়ে পাওয়া গেছে অভিযোগ। সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ গাড়িচালক অভিযোগ করেন, ডিজিটাল স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলোতে রাতের বেলা গাড়ি চালাতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রাস্তার চেয়ে এই স্ক্রিনগুলোতে বেশি দৃষ্টি যাচ্ছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তারা।

নিউমার্কেট ও আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়সহ নগরের বহু সড়কে বসানো রয়েছে এ ধরনের বেশ কিছু ডিজিটাল বিলবোর্ড। বিভিন্ন বিপণীবিতান, দোকান ও প্রতিষ্ঠানের ভবনের সামনে ইচ্ছেমতো বসানো এসব অবৈধ বিলবোর্ড দিয়ে চলছে রমরমা বিজ্ঞাপন-বাণিজ্য।

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নজরদারির অভাবে অভিনব কৌশলে পুনরায় স্থাপিত এসব বিলবোর্ডের কারণে ম্লান হচ্ছে নগরের সৌন্দর্য। সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ডের আদলে ডিজিটাল ডিসপ্লে (মনিটর) বসিয়ে সেগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচার করে বিভিন্ন
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিলবোর্ড নিয়ে সিটি করপোরেশনকে আমরা দ্বৈতনীতি অনুসরণ করতে দেখছি। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে স্থাপিত এসব বিলবোর্ড নিয়ে অনেকের অভিযোগ রয়েছে। এর অতিরিক্ত উজ্জ্বলতার জন্য গাড়িচালকদের বিপদজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিলবোর্ডগুলো ট্রাফিক আইনের পরিপন্থী। এধরনের বিলবোর্ড বসানোর আগে অবশ্যই ট্রাফিক বিভাগের সাথে আলোচনা করা উচিত ছিল। বাইরের দেশগুলোয় এধরনের ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে এর উজ্জ্বলতা ও উচ্চতার সীমা বেধে দেওয়া হয়। কিন্তু চসিক থেকে স্থাপিত এই বিলবোর্ডে এধরনের কোনো নিয়মকানুন আমরা অনুসরণ করতে দেখছি না।’

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার যতটুকু মনে পড়ছে ম্যাক্স গ্রুপের সাথে আমাদের একটি চুক্তি হয়েছে। ফ্লাইওভারের নিচের অংশ সৌন্দর্যবর্ধন ও দেখাশোনার দায়িত্ব তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। এই সৌন্দর্যবর্ধন চুক্তির আওতায় তারা বিলবোর্ড বসানোর কাজ করছে। তবে বিলবোর্ডের অবস্থান ও সাইজ চসিক নির্ধারণ করে দিয়েছে।’

বিলবোর্ডের উজ্জ্বল আলোতে গাড়ি চালকদের সমস্যার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘যদি এসব বিলবোর্ডের কারণে ট্রাফিকের কোনো সমস্যা হয় তাহলে সেটা আমরা অবশ্যই রিভিউ করে দেখবো। জনগণের সমস্যা হবে এমন কোনো কিছু আমরা করবো না। কারণ, আমাদের চুক্তি রিভিউ করার সুযোগ আছে।’

তবে এই ডিজিটাল বিলবোর্ড বসানোর ক্ষেত্রে নিজের হাত নেই বলে জানান খোরশেদ আলম সুজন। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সৌন্দর্যবর্ধন চুক্তির আওতায় একটি প্রতিষ্ঠানকে ফ্লাইওভারের নিচের অংশে বাগান করা, এসব পরিচর্যা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। আর সেই সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায় বিলবোর্ডগুলো বসানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি যদি জনগণের অসুবিধার কারণ হয় তাহলে আমরা সেগুলো ভেঙে দিবো।’

এ ধরনের বিলবোর্ডের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিলবোর্ড বসানোর মাধ্যমে চসিক বিলবোর্ডের ব্যপারে আপোস করেছে কিনা সেটা বর্তমানে দায়িত্বরত যারা আছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে বিলবোর্ডের বিষয়ে আমি সবসময়ই সোচ্চার ছিলাম, এখনও আছি। এর আগেও এ বিষয়ে আমি বিবৃতি দিয়েছি।’

রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বিলবোর্ডগুলোর কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যার পড়তে হচ্ছে গাড়ি চালকদের। নগরের সৌন্দর্যহানি হবে, জনগণের অসুবিধা হবে এধরনের বিলবোর্ডের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। বিলবোর্ড না থাকাই ভালো। যেখানে আমরা নিরাপদ সড়কের কথা বলি সেখানে এই বিলবোর্ডের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশ্ন আসে আসলেই কি আমরা নিরাপদ সড়ক চাইছি?

সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বড় অংকের টাকা খরচ হয়। শুধু আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের বিদ্যুৎ বিল আসে ৪ লাখ টাকা। চসিকের কাছে ফ্লাইওভারের দায়িত্ব আসার পর একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও মিড আইল্যান্ডের সৌন্দর্যবর্ধনের চুক্তি করা হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘এই ডিজিটাল টিভি স্ক্রিনগুলো বসানোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা, পাশাপাশি কিছু সময় বিজ্ঞাপন প্রচার করা, যার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে ফ্লাইওভারের পরিচর্যা করার কথা ছিল। এর পাশাপাশি চসিককে প্রতিষ্ঠানটি এককালীন ১ কোটি টাকা এবং প্রতিবছর ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল।’

এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ মেয়র বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না বলেই তো কেউ দায় এড়াতে পারেন না। আমি কী করেছি, কী করিনি সবকিছুর নথি তো চসিকে এখনো আছে। চসিকের বছরে কয়েক কোটি টাকা যে সাশ্রয় হয়েছে এগুলো প্রকাশ করলে হয়তো কারো ব্যক্তিগত অসুবিধা থাকতে পারে তাই হয়তো তারা এসব জানেন না।’

তবে যদি পথচারী বা গাড়ি চালকদের এই ডিজিটাল স্ক্রিনের কারণে সমস্যায় পড়তে হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে-যোগ করেন নাছির।

একুশে/জেআইএস/এটি