সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭

সিটি করপোরেশনের সহায়তায় এক দম্পতির দখলে ৩০ কোটি টাকার খাস জমি!

প্রকাশিতঃ রবিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২১, ১:২৩ পূর্বাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : নগরের সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় মালিক সেজে ৩০ কোটি টাকার সরকারি জায়গা ৩১ বছর ধরে এক দম্পতি অবৈধভাবে দখলে রাখার তথ্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের জন্য খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা খুঁজতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য পাওয়ার কথা একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন নগরের চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুনুল আহমেদ অনিক।

তিনি শনিবার (৯ জানুয়ারী) বিকালে একুশে পত্রিকাকে জানান, সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা পেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য খাস জায়গার অনুসন্ধান শুরু করেন তারা। এক পর্যায়ে পাঁচলাইশ থানাধীন সুগন্ধা আবাসিক এলাকার ২ নম্বর রোডের ‘ডি’ ব্লকে আলোচ্য জায়গাটির সন্ধান পান।

সরকারি এ কর্মকর্তা জানান, জনৈক আবু তৈয়ব এবং তার স্ত্রী রাহেলা বেগম দম্পতির ১৬৪,১৬৫,১৬৬ ও ১৬৮ নম্বর প্লটের মোট ৪০ শতক জায়গাটি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। দম্পতির দাবি, ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৯ সালের বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন থেকে চারটি বন্দোবস্তি দলিলমূলে তারা কিনেছেন। ওই দম্পতি দাবি করছেন, জায়গাটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ার আগে সেটি আরএস ও পিএস রেকর্ডে ভিন্ন মালিক ছিলেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুনুল আহমেদ অনিক বলেন, ‘সরকারি সম্পদ বলে আবু তৈয়ব এবং তার স্ত্রী রাহেলা বেগমকে জায়গাটির দখল ছেড়ে দিতে বলেছি। তবে ২০১৯ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি পরিপত্র অনুযায়ী জায়গাটি কীভাবে খাস খতিয়ানভুক্ত হলো সেটির গ্রাউন্ড দেখে পরবতী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় ওই জমির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি জায়গাটি তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ওই দম্পতির নামে কীভাবে দলিল রেজিস্ট্রি দিল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এর ভূ-সম্পত্তি বিভাগে বিষয়টির খোজ নেন একুশে পত্রিকা প্রতিবেদক। চসিকের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা চসিক কারো কাছে বিক্রি করতে পারে না। সাবেক ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তা এখলাস উদ্দিন বলেন,’সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় অধিগ্রহণমূলে চসিকের ২১১টি প্লট রয়েছে। সেগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির নামে লিজ বা রেজিস্ট্রি দেওয়া হয়েছে। আবু তৈয়ব ও তার স্ত্রী রাহেলা বেগম যে চারটি প্লট ৩১ বছর ধরে দখলে রেখেছেন সেগুলো চসিকের নয়। মনে হচ্ছে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে একটি ভূমিদস্যূ চক্র নানা ফন্দি আঁটছে।’

সুগন্ধা সিটি করপোরেশন আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ডি’ ব্লক এলাকার ১৬৪, ১৬৫, ১৬৬ ও ১৬৮ নম্বর প্লটের দখলদার আবু তৈয়ব ও তার স্ত্রী রাহেলা আমাদের সমিতির সদস্য। তারা সংগঠনে নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করেন। তবে আমি জানি জায়গাটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। ওই দম্পতি কীভাবে মালিক দখলকার আছেন, সে বিষয়টি আমরা খতিয়েও দেখিনি।’ ৩১ বছর আগে তারা জায়গাটি কিনে থাকলে তারা সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেননি কেন- প্রশ্ন জহিরুলের।

জেলা প্রশাসন সুত্র জানায়, তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন থেকে ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ১৮০১১ নম্বর বন্দোবস্তি দলিলমূলে ১৬৮ নম্বর প্লট এবং ১৯৮৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৪ নম্বর বন্দোবস্তি দলিলমূলে ১৬৫ নম্বর প্লটে ৪ কাঠা করে মোট ৮ কাঠা জায়গা কিনেন রাহেলা বেগম।

একইভাবে তার স্বামী আবু তৈয়ব ১৯৮৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ১৪৮০ নম্বর বন্দোবস্তি দলিলমূলে ১৬৪ নম্বর প্লট এবং ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ ১২৪৯ নম্বর বন্দোবস্তি দলিলমূলে ১৬৬ নম্বর প্লটে ৪ কাঠা করে মোট ৮ কাঠা জায়গা কিনেন।

খাস খতিয়ানভুক্ত প্রায় ৩০ কোটি টাকার জায়গার মালিক আপনি কীভাবে হলেন- প্রশ্ন করলে নানা কৌশলে উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন আবু তৈয়ব।

শনিবার বিকেলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কাগজপত্র নিয়ে আপনার কাছে আমার ম্যানেজার যাবে। তিনি বুঝিয়ে দেবেন।’