শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭

ভোটের উত্তাপ ছাপিয়ে দক্ষিণ পাঠানটুলি এখন আতঙ্কের জনপদ

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৪, ২০২১, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : চসিক নির্বাচন ঘিরে ২৮ নং দক্ষিণ পাঠানটুলী ওয়ার্ড এলাকায় উত্তাপ ছাপিয়ে এখন আতংকের জনপদে পরিণত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) রাতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় আজগর আলী বাবুল নামে এক ব্যক্তি নিহতের পর থেকে পাল্টে গেছে সেখানকার নিবাচনী চিত্র।

ভোটারদের মতে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর এবং বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির একটি সমীকরণ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বাবুল খুনের পর পাল্টে গেছে সব হিসাব-নিকাশ।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঠানটুলী ওয়ার্ড এলাকা স্তব্ধ। ভোটাররা আতংকিত। তাদের শংকা, আবার কখন কী হয়ে যায়। মতিয়ার পুলের বাসিন্দা সালমান আলী বলেন, ‘এ ওয়ার্ডে খুন-খারাবি হবে, এমন আশংকা করে আসছিলাম। সেটা সত্যি প্রমাণিত হলো। আমি তো এখন ভোট দেওয়ার ভাবনায় নেই। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত আছি।’

মগপুকুর, চট্টল্লা বেকারি, বটতলসহ ২৮ নং পাঠানটুলী ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চসিক নির্বাচন ঘিরে পাড়ায়-মহল্লায় তেমন কোনও আলোচনা নেই। অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ।

বটতল এলাকার বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাবুল খুনের আগে ভোটের হিসাব ছিল অন্যরকম। কেউ কেউ কাদেরকে ভোট দেওয়ার চিন্তায় ছিল। এখন রাস্তা ক্লিয়ার। দল যাকে মনোনীত করছে তাকেই আমরা ভোট দেব।’

গত মঙ্গলবার রাতেব বিদ্রোহী প্রার্থী কাদেরের সমর্থকদের গুলিতে নিহত বাবুলের এলাকা বটতলে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানকার বাসিন্দারা শোকে স্তব্ধ। রাস্তাঘাটে কোলাহল নেই। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। অলি-গলিতে ঝুলছে শোকের কালো পতাকা ও ব্যানার। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকলেও মানুষের মধ্যে শঙ্কা কাটেনি এখনও।

ইয়ার আলী জামে মসজিদ এলাকার বাসিন্দা বাবুল আক্তার বলেন, ‘ভয়ে ঘর থেকে তেমন একটা বের হচ্ছি না। কখন কী হয়ে যায়।’

এদিকে গুলিতে নিহত বাবুলের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তার পরিবারের সবাই শোকে পাথর। বাবাকে হারিয়ে কাঁদছেন তার সদ্য বিবাহিত মেয়ে তাবাচ্ছুম নাহার মিথিলা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বাবা ছিল এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তি। তার সামাজিক অবদানকে সম্মান করে সবাই মহল্লার সর্দার বানিয়েছেন। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তার সেই স্বপ্নটা পূরণ হল না।’

বাবুলের প্রতিবেশী আব্দুল জব্বার বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষ থাকতে পারে। গতবারের চসিক নির্বাচনে তিনি (বাবুল) কাদেরের পক্ষে কাজ করছিলেন। অনেক টাকাও খরচ করেছিলেন। এবার দল যাকে দিয়েছে, তার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে কাদেরের টার্গেটে পরিণত হন। শেষ পর্যন্ত কাদের ও তার সহযোগি নবী গুলি করে তার প্রাণ কেড়ে নিল। এ খুনের উত্তর আমরা ব্যালটের মাধ্যমে দেব।’

নিহত বাবুলের ভগ্নিপতি আব্দুল আজাদ বলেন, ‘আমার শ্যালক বাইশমহল্লা সর্দার কমিটির সদস্য এবং আওয়ামী লীগের একজন কর্মী। তিনি দলের মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য ফিশারিঘাটে মাছ ব্যবসা স্থগিত রেখে বাহাদুরের জন্য মাঠে নামেন। এটিই তার জন্য কাল হয়েছে।’

এদিকে বাবুল খুনের কারণ হিসাবে এলাকাবাসীরা জানান, সর্দার হওয়ায় আজগর আলী বাবুলের প্রভাব ছিল এলাকায়। এজন্য আবদুল কাদের তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এবার কাদেরের প্রতীক ব্যাডমিন্টন। গত মঙ্গলবার সকালে ব্যাডমিন্টন আকৃতির কিছু লোহার র‍্যাকেট সদৃশ অস্ত্র বানানোর সময় বাবুল তা ধরিয়ে দেন। এছাড়া এক সপ্তাহ ধরে নজরুল ইসলাম বাহাদুরের পক্ষ নিয়ে বাবুল নিজের ফেসবুক পেজে ‘মাছ কাদের’ এর নাম উল্লেখ করে কয়েকটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এ নিয়েও কাদের ক্ষিপ্ত ছিল বাবুলের উপর।

সূত্রগুলো বলছে, মুলত এবারের চসিক নির্বাচনে নজরুল ইসলাম বাহাদুরের পক্ষ নেওয়ার কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদেরের সঙ্গে আজগর আলী বাবুলের বিরোধ শুরু হয়। এর আগের বারের নির্বাচনে মহল্লা সর্দার আজগর ছিলেন কাদেরের পক্ষে। তখন কাদের বাহাদুরকে হারিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বাবুল হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পর উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও অনেকের মধ্যে এখনও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। আসাদ নামে মতিয়ার পুলের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতারা অনেক তর্জন-গর্জন করেছেন। এরপরও চসিক নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের তারা বাগে রাখতে পারেননি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ার আগে নিজ দলের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধেই মাঠে নামতে হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের। এ কারণে সংঘাত-খুনখারাবি হচ্ছে।’

২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ডের একাধিক বাসিন্দা জানান, চসিক নির্বাচনী প্রচার অভিযান শুরু থেকে পাঠানটুলি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর ও বিদ্রোহী আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। সংঘাতের আশঙ্কা ছিল শুরু থেকেই।

এদিকে স্থানীয় আরেকটি সুত্র জানিয়েছে, ১১ জানুয়ারি রাতে মতিয়ার পুল আবেদিয়া স্কুল সংলগ্ন এলাকায় বাহাদুরের নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার সমর্থকেরা বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদেরের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন। পোস্টার ছেঁড়ার ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই পরেরদিন মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে মগপুকুর পাড় এলাকায় কাদেরের সমর্থকদের গুলিতে প্রাণ হারান আওয়ামী লীগ কর্মী বাবুল।

গত মঙ্গলবার রাতে আজগর আলী বাবুল খুনের মামলায় তাকেসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাবুল হত্যা মামলায় আদালতের আদেশে আব্দুল কাদেরসহ ওই ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার তিনদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

এদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর প্রাথী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের বিরুদ্ধে মোস্তফা কামাল টিপু নামে এক কিশোর গ্যাং লিডারকে প্রশ্রয় দেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এই টিপু নিজেকে ডবলমুরিং থানা ছাত্রলীগের সভাপতি পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। টিপু ডবলমুরিং থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি, আগ্রাবাদ গণপূর্ত ভবনে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া টিপুর বিরুদ্ধে আছে ছিনতাই, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা। নজরুল ইসলাম বাহাদুর দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর টিপু এলাকায় অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। অভিযোগ আছে, কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের হয়ে মোস্তফা কামাল টিপু ও তার সহযোগি মাহবুব, নাছির, সাহেদ, রানা, জিয়া, নুরনবী ও জসিম উদ্দিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিপুকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে নজরুল ইসলাম বাহাদুর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি ২৮ নং ওয়ার্ডের ১৫ বছর জনপ্রতিনিধি ছিলাম। কোন কিশোর গ্যাং লিডার বা সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয় দিইনি। মাছ কাদের গত ৬ বছরে ৫টি খুন করেছে। তার বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা আছে। একটি হাইজ্যাক মামলায় তার ১০ বছরের সাজাও হয়েছে। ওই মামলায় সে জামিনে নেই। পাঠানটুলির বাসিন্দা এই সন্ত্রাসী গডফাদারের অত্যাচার থেকে এবার পরিত্রাণ পেতে চায়।’

প্রসঙ্গত, দলের হাইকমান্ডের হুঁশিয়ারির পরেও চসিক নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে থেকে গেছেন। এর মধ্যে ১২টি ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলররাই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে থাকছেন। কাউন্সিলর পদে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে যারা নির্বাচন করছেন, তারা হলেন- ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের তৌফিক আহমেদ চৌধুরী, ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাহেদ ইকবাল বাবু, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জহুরুল আলম জসীম, ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের মোরশেদ আক্তার চৌধুরী, ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডে সাবের আহমেদ, ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডের এফ কবির মানিক, ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডের এসএম এরশাদ উল্লাহ, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের এইচএম সোহেল, ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডের আব্দুল কাদের, ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তারেক সোলায়মান সেলিম, ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের হাসান মুরাদ বিপ্লব ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের মাজাহারুল ইসলাম চৌধুরী।