বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রেমিক হতে গেলে ঋতু বুঝতে হয়

প্রকাশিতঃ রবিবার, জানুয়ারি ১৭, ২০২১, ১:০৪ অপরাহ্ণ


শান্তনু চৌধুরী : প্রিয়তমাসু, তুমি তো জানো না, জীবনে তোমাকে কোনওদিন ঠিকমতো সম্বোধন করা হলো না।-তারাপদ রায়।

খুব অল্পতে আমার মন খারাপ হয়, এই ধর কাউকে ফোন করলাম রিসিভ করলেন না। নাই করতে পারেন। কিন্তু পরিচিত হিসেবে ফ্রি সময় হলে তো ব্যাক করতে পারেন। হয়তো বলবে, উনার কাছে তোমার নাম্বার সেভ নাও থাকতে পারে। কিন্তু পাল্টা জবাবে যদি বলি, দুবার কল দেওয়ার পরও ব্যাক না করাটা ঠিক অবহেলা মনে হয় আমার কাছে। অভদ্রতাও!

আবার এখনতো ট্রু কলার রয়েছে, যার মাধ্যমে অপরিচিত কারো নাম্বারের সাথে নামও চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে হয়ত পরিচিত কাউকে নক দিলাম। সিন করলো কিন্তু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও মনে করল না। আমার কাছে অবহেলা মনে হয়।

আবার ধর, কারো সাথে দেখা করতে গেলাম, বললেন মিটিং-এ আছে। কিন্তু অফিসে পরিচিত অন্য কারো মাধ্যমে খবর নিলাম, ঠিক মিটিং হয়। রুমে বসে অফিসের সুন্দরী কলিগদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। এটাও হয়তো এক ধরনের মিটিং। কে জানে! বিশেষ করে মানুষ বড় হলে এই ভাবটা নেয়। এটাকে তিনি হয়ত ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম মনে করেন। এ নিয়ে একটা ছড়াও লিখেছি।

‘বড় হব, ভাবও নেব
ব্যস্ত চ্যাটিং, মিটিং-এ
নারী হলেই গদগদ
হবো ইজি ফিটিং-এ’।

কিন্তু এই বাস্তব সময়ে এসে এতো অল্পতে মন খারাপ করলেতো চলে না। নিঝুম হৃদয়পুরে যতোই উথাল পাতাল মেঘ করুক না কেন? হৃদয় ব্যাকুল হোক, কুয়াশায় ভরে উঠুক। তবুও কর্পোরেট হাসি ঝুলিয়ে কথা বলেই যেতে হবে। লুক বদলাতে না পারলে হয়তো দুনিয়াই বদলাবে না। এই যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কথা যদি বলি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি দু’দুবার অভিশংসনের মুখোমুখি হয়েছে। তার টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট বন্ধ করে দিয়েছে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তার মধ্যে কোনো বিকার নেই। যেন যতোদিন সময় পাওয়া যায় সমানে লড়ে যাওয়া। তবে অদম্যের কথা যদি বলি। তিনি নিক।

১৯৮২ সালে ৪ ডিসেম্বর, অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেন নিকোলাস জেমস ভুজিসিক হাত এবং পাবিহীন হয়ে। ক্ষতিকর জিনের কারণে তার হাত-পা সৃষ্টি হতে পারিনি। কিন্তু তিনি দমে যাননি। হার মেনে নেননি অসম্পূর্ণতার কাছে। বর্তমানে তার নিজের দুটি প্রতিষ্ঠান আছে, এ পর্যন্ত ৩০ লাখের উপর মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, ঘুরেছেন ৫০ টি দেশে। মাত্র দুই আঙুল দিয়ে তিনি মিনিটে ৪৭টি শব্দ টাইপ করতে পারেন। এই দুই আঙুলে তিনি দুইবার গ্রাজুয়েশন করেছেন। ফাইন্যান্স প্লানিং এবং একাউন্টিং নিয়ে। তিনি ৬টি বইও লিখেছেন, প্রত্যেকটি বই বেস্টসেলার। বর্তমানে ৩৮ বছর বয়স্ক নিক, স্ত্রী এবং ২ সন্তান নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় ভালোই আছেন। গিনিসবুকে তিনি নাম লিখিয়েছেন মাত্র ১ ঘণ্টায় ১৮শ’ জন মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

এই নিক্ ১০ বছর বয়সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, মানুষের বিদ্রুপ সহ্য করতে না পেরে। অথচ আজ এই নিক্ লাখো মানুষের ভালোবাসার নাম।

জীবনটা এমনই। জীবনযাপন করতে গেলে জীবনকে ভালোবাসতে হয়। এই যে চারদিকে এতো এতো অবহেলার কথা শুনি তবুও প্রিয় মানুষগুলোকে কখনো ভোলা যায়? কিংবা প্রিয় জিনিসগুলোকে। প্রতিবার কেউ যখন বাসা-বাড়ি পরিস্কার করে কতো কতো জিনিস ফেলে দেয়। হয়তো সময়ের সাথে সাথে সেগুলো পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। নচিকেতার গানের মতো, ‘আজ যে তোমার প্রেমেতে পাগল, বেহিসেবী দেওয়ানা। কাল সে চাইবে হিসাব প্রেমের দাম ষোলআনা’।

সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষ আইফোনের বাক্সগুলো সহজে ফেলে দিতে চান না। কেন? একেকজনের কাছে কারণটা একেকরকম। নিজে আইফোন ব্যবহার করি। তাই এই খবর পড়ে দেখি আমার কাছেও বাক্সগুলো রয়ে গেছে। বাক্সগুলো রাখার কারণ বলতে গিয়ে কিছু টুইট এর বক্তব্য শোনাই। ডিজাইনার জর্ডান স্টিফেনসেন বাক্সগুলো সংরক্ষণের কারণ হিসেবে চমৎকার নকশার উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায় ‘মাস্টারপিস’।

ভাইস সাময়িকীতে জর্ডান বলেন, ‘সত্যি বলতে অ্যাপলের বাক্সগুলো এত ভালো যে ছুঁড়ে ফেলতে মন সায় দেয় না।’ ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মিন ট্যানের কাছে বাক্সগুলো পণ্যেরই অংশ। তিনি জানিয়েছেন, ‘প্রতিটি বাক্স খোলার সময় দামি দামি একটা ভাব মনে আসে। বাক্সটাও সেটারই অংশ।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের করবিন উইলিয়ামস ওসব ‘অ্যাসথেটিক’ ব্যাপার-স্যাপারের ধার দিয়ে যাননি। তার কাছে আইফোন ব্যবহারের স্মৃতিটিই মুখ্য। বাক্সটি কেবল তা মনে করিয়ে দেয়।

উইলিয়ামসের বয়স এখন ৩০। হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই বাজারে নতুন আইফোন এলে প্রথম দিনেই দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে তা কেনেন তিনি। স্যুভেনির হিসাবে এখন তার সংগ্রহে ১৪টি আইফোনের বাক্স আছে।

কথায় বলে, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। সেই স্বপ্নের কারণে কেউ কেউ বড় হয়। কাউকে কাউকে থেমে যেতে হয়, আবার কেউ সারাজীবন স্বপ্নপূরণের চেষ্টায় থাকে। তবে নেত্রকোনার আবুল মনসুর খান যেভাবে নিজের ছেলের স্বপ্নপূরণ করলেন সেটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার বড় ছেলে মেহেদী হাসান খান রনি শৈশবে হেলিকপ্টার উড়তে দেখে বাবার কাছে হেলিকপ্টারে চড়ার আবদার করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর।

ওই সময় বাবা বলেছিলেন, ‘বড় হওয়ার পর তোমাকে হেলিকপ্টারে করে বিয়ে দেব।’ ছেলের সেই স্বপ্ন এবার বাস্তবে পরিণত করলেন বাবা। আমিও সবসময় বলি, ছোট জীবন, কেন এতো হিংসা-দ্বেষ। বরং যতটা পারি আনন্দেই কাটাই।

এ প্রসঙ্গে একটা গল্প বলা যেতে পারে, ‘এক বৃদ্ধা মহিলা বাসে বসে যাচ্ছিলেন, এক লোক মহিলার গা ঘেঁষে বসলেন এবং ভারি ব্যাগটা বৃদ্ধার সামনে এমন করে রাখলেন যে, বৃদ্ধার বসতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু, বৃদ্ধা কিছু বললেন না দেখে এক তরুণীর জিজ্ঞাসা, কেন আপনি লোকটিকে কিছু বলছেন না?

মহিলা বললেন, অভদ্র হওয়ার বা তুচ্ছ কারণে কথা বলার দরকার নেই, কারণ ওই লোককে নিয়ে আমার ভ্রমণের যাত্রাপথটা ছোট। আমি পরের স্টেশনেই নেমে যাবো। খুবই মূল্যবান না কথাটা! আসলেই আমাদের জীবনের চলার পথে এরকম কত তুচ্ছ কারণে আমরা কথা বলি, কথা বাড়াই!

আমাদের যাত্রাপথের সঙ্গীটি (যে খারাপ আচরণ করছে) আমাদের সাথে সবসময় থাকবে না। কাজেই আমরা চাইলে বিষয়টা উপেক্ষা করতে পারি, অকারণ তর্ক-বিতর্ক পরিহার করতে পারি। অন্যের অভদ্রতার জন্য আমার নিজের অভদ্র হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই মাকিদ হায়দারের মতো প্রাক্তন প্রেমিকার উদ্দেশ্যে আমিও বলি-

‘যে আমাকে প্রেম শেখালো
প্রেম শিখিয়ে বুকের মাঝে
অনল দিলো
সে যেন আজ সবার চেয়ে
সুখেই থাকে, সুখেই থাকে।’

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক