বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

করোনায় শিক্ষা ভাবনা : আহা এক করোনায় কত ভয়াবহতা!

প্রকাশিতঃ সোমবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২১, ৪:৩২ অপরাহ্ণ


কাজী খাইরুন নেছা : নগরজীবন অনেকটা যান্ত্রিক। এখানে এক বাসায় কী হচ্ছে, অন্য বাসায় তা জানা যায় না। নগরজীবনের অনেক কাহিনী আমরা জানি, একবাসায় গায়েহলুদ অনুষ্ঠান হচ্ছে, আরেক বাসায় লাশ পড়ে আছে। পাশের ফ্ল্যাটের খবর কেউ রাখে না। এরকম বহু ঘটনার সাক্ষী আমরা।

কিন্তু করোনা অন্য এক পরিস্থিতি নিয়ে হাজির হল আমাদের সামনে। ভীষণ ভয় কাজ করছিল যখন শুনছিলাম, কারো করোনা হলে বন্ধুর পথ মাড়িয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হবে ঠিক, তবে সাথে আপনজন কেউ থাকতে পারবে না। যদি তিনি সুস্থ হোন তো ভালো। আর মারা গেলে কোথায় দাফন হবে, কোথায় লাশ নিয়ে যাওয়া হবে, কেউ জানবে না! সারাক্ষণ এক অজানা আশঙ্কা মনের দুয়ারে কড়া নাড়ে।

ক্লাস চলছে অনলাইনে। শিক্ষকেরা তৈরি হচ্ছেন একটু একটু করে। এদেশের দূরশিক্ষণটা বেশি পরিচিত ছিল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়-এর মাধ্যমে। যারা স্কুল-কলেজে গিয়ে বেঞ্চে বসে পড়ার সময় দিতে পারত না, চাকরি-বাকরি করে স্কুল-কলেজে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, তাদের জন্যই চালু হয়েছিল শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে এই দূরপ্রশিক্ষণ পদ্ধতি। অনলাইন শব্দটার ব্যবহার তখন নেই বললে চলে। ক্লাস বলতে যা টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচারিত হতো সেই দূরপ্রশিক্ষণ। সময়ের প্রয়োজনে সেই দূরশিক্ষণ অনলাইন ক্লাস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে করোনাকালে।

প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে ট্যাব, কম্পিউটার বেশিক্ষণ দেখলে আমরা যেখানে চিন্তিত হয়ে পড়তাম, সেখানে আজ ওদেরকে মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটারে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। এনালগ যুগ থেকে ডিজিটাল। এখন আর লোকজন বলতে কিছু নেই। যে শিক্ষক তিন মাস পর রিটায়ার্ড করবেন, তিন মাসের জন্য হলেও গেজেটের ব্যবহার শিখে-সেই শিক্ষক ছাত্রদের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করছেন।

স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রজন্মের যে কেউ নতুন প্রযুক্তিতে সরাসরি দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। পুরোনোদের যারা প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত তাদের না হয় ঝামেলা কম, যারা প্রথমবারের মত ব্যবহার করছে, তাদের দক্ষতা সত্যি সময়ের ব্যাপার-আমার কাছে। সেটা নতুন করে ধরা দিল যখন অনলাইন ক্লাস শুরু করলাম হোয়াটসঅ্যাপ ইউজ করা, জুমঅ্যাপে ক্লাস, ফেসবুকে ক্লাস দেওয়ার ক্ষেত্রে। এদিকে এসব আ্যপস ভালোভাবে ব্যবহার করে, জানাতে হবে ছাত্রদের কাছে, আছে সেই তাগাদাও।

এপ্রিল মাস গেল কোনওমতে। রমজান বলে আর করোনা থেমে নেই! আগে অপরিচিত লোকজনের হয়ে থাকলেও এখন পরিচিতজনদের উপর শুরু হয়ে গেল করোনার মরণকামড়। রেহায় পাচ্ছে না স্বজন-পরিচিত কেউই।

মে মাসে রমযান। মুসলমানদের জন্য সংযমের মাস। রমজান মাস অতি পবিত্র, এবাদত বন্দেগির মাস। এই মাসে মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা কাজের ভিতরও ইবাদত করেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন।

আমার পরিচিতজনদের দেখেছি, এই রমযানে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছেন করোনা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে। রমযান মাসের দিকে যে জিনিসটা খুব ভয়াবহ হয়ে উঠল, করোনা রোগীরা যেন অচ্ছুৎ, মহাপাপী, অপরাধী। কারো বাড়িতে করোনা রোগী মানে সেই বাড়ির সাথে পুরো এলাকাই যেন লকডাউন। আর যে রোগী সে যদি বাঁচে তবে রক্ষা। আর যদি মরে যায়, তাকে ধরার জন্য আপনজনদের কারো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না বা দেওয়া হচ্ছে না।

অমনি শংকা-ভয় চেপে ধরল আমায়- যদি আমি মারা যাই, আমার লাশটা কি আপনজনেরা দাফন করবে না? কোথায় নিয়ে ফেলে দেওয়া হবে আমাকে! এই ভয়টা করোনা শুরুর দিকে মানুষকে অর্ধেক মৃত বানিয়ে দিয়েছিল। কিংবা মেরে ফেলেছিল মরার আগে!

এমন এক সময়ে এক ছাত্রের ফোন। ম্যাডাম আমরা কি ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারবো? করোনাতে সবাই ভয়ে কাহিল! সেখানে কীসের ভলান্টিয়ার? না ম্যাডাম, আমাদের চট্টগ্রামেই দেশের প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল হচ্ছে করোনা রোগীদের জন্য। বিষয়টি আমি প্রথম শুনি একুশে পত্রিকা সম্পাদক, মানবিকবোধে জাগ্রত মানুষ আজাদ তালুকদারের কাছে।

করোনার যে সময়টাতে ছেলে তার মাকে জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে, করোনা-আক্রান্ত সন্তানেরা বাবাকে ছুঁড়ে ফেলে আসছে রাস্তার ধারে; সবার মাঝে একটা পলায়নপর অবস্থা, তখনই আজাদ তালুকদাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের মাঝে মানবিকতা উসকে দেওয়ার কাজটা করেছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে করোনা চিকিৎসায় দেশের প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল গড়ার মধ্যদিয়ে।

এজন্য শ্রদ্ধাভাজন আজাদ তালুকদারের পাশাপাশি প্রধান উদ্যোক্তা ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া, আরেক উদ্যোক্তা এডভোকেট রেহানা বেগম রানুর (প্রাক্তন চসিক কাউন্সিলর ও নারীনেত্রী) প্রতি জাতির সংকট-সন্ধিক্ষণে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠার জন্য টুপিখোলা অভিবাদন, কৃতজ্ঞতা জানাই।

সেই যাই হোক, আমার ছাত্রটিকে ভলান্টিয়ার হওয়ার অনুমতি দেবার সাহস পাইনি। কারণ সে তার বাবা-মাকে রাজি করাতে পারেনি। যেখানে বাবা-মা অনুমতি দিতে পারছে না, সেখানে আমি সাহস করতে পারিনি! নিজেকে বড়ই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। সান্ত্বনা দিলাম- তুমি প্রত্যক্ষ কিছু করতে না পারলেও পরোক্ষভাবে করার চেষ্টা করো। ফিল্ড হাসপাতালের ফান্ড সৃষ্টিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পার কিনা দেখো তোমার পরিচিতজনদের নিয়ে। মনোক্ষুণ্ন হয়েছে তবে মনোবল হারাইনি। এটাই যারা সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোতে জড়িত থাকে তাদের শিক্ষা।

আগের লেখাতেই বলেছিলাম, রমজান মাসে প্রথমে মার্কেট পরে মসজিদ খুলে দিলেও মার্কেট নিয়ে মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসল। কারণ আমারই অনেক ছাত্রছাত্রী বলছে, ওদের বাবাদের তেমন আয় নেই। আশা করছি সবাই সাবধানতা অবলম্বন করে ব্যবসা চালিয়ে নেবে।

সমস্যা যেন কাটছেই না। নতুন রূপে, নতুন চেহারায় ধরা দিচ্ছে সমস্যাগুলো। রমজানের প্রভাবটা পড়ে বিশেষত ঈদের সময়। তাই সবাইকে সরকারের পক্ষ থেকে সাবধানে থাকতে বলা হচ্ছে, বিশেষ করে বাড়ি যাবেন যারা। আমরা শিক্ষকরাও চেষ্টা করছি বিশেষ করে অনার্স ছাত্রদের সাবধানে বাড়ি পাঠাতে। উল্লেখ্য, আমার পরিচিত কিছু শিক্ষক জানালেন, এই রমজানেও ঠিকমতো তাদের বেতন না হওয়ার কথা!

কেন জিজ্ঞেস করতেই জানলাম, বেসরকারি যেসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে, সেসব স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষকই শতভাগ বেতন পাননি! চট্টগ্রাম শহরে মাত্র নামকরা দু-একটা স্কুল ছাড়া আর কোনও স্কুল বেতন দেইনি। কিন্ডারগার্টেন স্কুল শুধু নয়, অনেক বেসরকারি কলেজের নন এমপিও শিক্ষকও শতভাগ বেতন পাননি।

আরো কারণ জানতে চাওয়ায় বলল, শিক্ষকরা বেতন কীভাবে পাবে, যদি ছাত্রদের বেতন না আসে। আর ছাত্রদের বেতন কীভাবে আসবে, যদি অভিভাবকদের হাতে টাকা না থাকে।চক্রাকার আর্বতে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে লাগল মনে।

ছুটি বেড়ে দাঁড়াল ৩০ মে পর্যন্ত। বাড়িমুখো মানুষের উপর নেমে আসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। যে বাড়িতে যাবে তার কারণে যেন তার বাড়ির অন্যদের ক্ষতি না হয়। সবার সহায় হোন সর্বশক্তিমান দয়াময়। আহা, এক করোনার কত ভয়াবহতা!

কাজী খাইরুন নেছা : সিনিয়র প্রভাষক, ওমর গণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।