ঢাকা : টং দোকানের চা, জুস ও কফি, পান-সিগারেট বিক্রেতা সবাই ধুন্ধুমার ব্যস্ত। কাপে কাপে চা-কফি, গ্লাসভর্তি জুস বানিয়ে কূল পাচ্ছে না দোকানিরা। দলে দলে নারী-পুরুষ এসে খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। নতুন কেউ এই চিত্র দেখে নির্ঘাত ধরে নেবে বড় কোনো বিয়ে অথবা মেজবানের আয়োজন চলছে এখানে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এখানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এই কার্যালয় ঘিরে মানুষের এমনই মেলা বসে প্রতিদিন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অবস্থান করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে ধানমন্ডি ৩/এ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে।
পার্টি অফিসের বাইরে দুইশ’ গজ এলাকা জুড়ে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে আড্ডা দিচ্ছে অন্তত দুই শতাধিক নেতাকর্মী। এর মধ্যে অর্ধেকই মহিলা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের বিপরীতে জুস ও কফি শপে গিয়ে এক নেত্রী বললেন, তিন গ্লাস বেল ও তরমুজের জুস বানাতে। সঙ্গে আছেন ওই নেত্রীর স্বামী। ভদ্রলোক পার্টি অফিসে নেত্রীস্ত্রীকে লিফট দিতে গেছেন মনে হলো।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, একটি গ্লাস থেকেই জুস খাচ্ছেন তারা। এভাবে তিন গ্লাস জুস ভাগাভাগি করে শেষ করার পর স্ত্রী অফার করলেন আরও কিছু খেতে। স্বামী বললেন, তোমাকে টাকার গরম পেয়েছে বোধহয়! স্ত্রী বললেন ঠিক বলেছো, অনেক দিন আগে ধার দেওয়া টাকা ফিরে পেলাম আজ। টাকার শক্তি আসলেই অনেক বড় শক্তি। পকেটে টাকা থাকলে শক্তিটা যেন কোত্থেকে চলে আসে! এভাবে মিনিট দশেকের রোমাঞ্চকর সময় কাটানোর পর টা-টা দিয়ে স্ত্রী ঢুকে গেলেন পার্টি অফিসে।
৬ টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে পার্টি অফিসে আসেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। গাড়ি থেকে নেমেই দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে যান তিনি। পার্কিং-এর জায়গা না পেয়ে তার গাড়িটি ধানমন্ডির মূল রাস্তার দিকে আসতে দেখা যায়।
৬টা ৫৫ মিনিটের দিকে মাইক্রোবাসে চড়ে ধানমন্ডি কার্যালয়ে আসেন মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আশরাফুন নেছা মোশাররফ। পার্টি অফিসের মূল গেটের দিকে গাড়িটি বাঁক নিতেই চোখ আটকে যায় জুসের দোকান ঘেঁষে আড্ডারত তরুণদের। একজন বললেন, বয়স্ক মহিলাটি মহিলা লীগের সভাপতি না, কী যেন নাম! নামটা কেউ মনে করতে পারছিলেন না।
এসময় তাদেরই একজন ৪ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে দেওয়ালে সাঁটানো পোস্টারের কাছে গিয়ে নাম উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। বলেন, তার নাম আশরাফুন নেছা মোশাররফ। সাথে সাথে একজন বলে উঠলেন, ও হ্যাঁ চিনি ওনাকে, অনেক বয়স হয়ে গেছে, সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন।
৭টার দিকে দলীয় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসিম কুমার উকিলকে। ডানে-বামে না তাকিয়ে মূল রাস্তার দিকে হাঁটতে থাকেন তিনি। রাস্তায় দাঁড়ানো কয়েকজন এগিয়ে এসে উইশ করলে তিনি হাত উচিয়ে জবাব দেন। এরপর রিক্সা নিয়ে অপেক্ষায় থাকা একজনের সঙ্গে তিনিও রিক্সায় উঠে মিলিয়ে গেলেন।
৭টা ১০ মিনিটের দিকে পার্টি অফিস থেকে বের হন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বেরিয়েই পতাকাখচিত গাড়িতে উঠেন। এসময় তার গাড়ি ঘিরে শ’ খানেক নেতাকর্মীর জটলা। গাড়ির জানালা খোলে আরও কিছুক্ষণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এসময় কারো কারো অভাব-অভিযোগও শুনতে দেখা যায়।
এর ৫ মিনিট আগে পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন কেন্দ্রীয় উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। পা ফেলে সামনের দিকে কয়েক কদম দিতেই কয়েকজন তাকে উইশ করতে এগিয়ে যান। দুই মিনিটের মধ্যেই তাকে ঘিরে ধরেন আরো ১০-১২ জন নেতাকর্মী। সবাই তাকে উইশ করছেন। তিনিও জবাব দিচ্ছেন হাসিমুখে, কারো কাধে হাত রেখে।
এর মাঝেই আমিনুল ইসলাম পেছনে ফিরে কয়েকবার তাকালেন দলের সাধারণ সম্পাদকের গাড়ির দিকে। মনে হলো নেতাকে বিদায়-সম্ভাষণ জানাতে অপেক্ষা করছিলেন আমিন। পরে তাই ঘটলো। মিনিট কয়েকের মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের গাড়ি ধীরগতিতে চলতে শুরু করলো। পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেই আমিনুল ইসলাম মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে নেতাকে বিদায় জানানোর সুযোগটি গ্রহণ করলেন। হাত উচিয়ে সালাম দিলেন তার সঙ্গে থাকা কর্মীরাও।
হাত দেখিয়ে হুইসেলের বাঁশিতে রাজপথ কাঁপিয়ে চলে গেলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পুলিশ প্রটোকলের গাড়িসহ সামনে-পিছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তিনটি গাড়ি অনুসরণ করলো মন্ত্রীকে।
৭টা ২০ এর দিকে আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে বের হন কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল। মিনিট পাঁচেকের মতো মূল গেটের কাছে নেত্রীকর্মী পরিবেষ্টিত থাকেন তিনি। যুব মহিলা লীগের উৎসাহী কর্মীদের সঙ্গে সেলফি তুলেন। এরপর ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি চেপে একাই চলে যান। এসময় এক ছাত্রলীগ কর্মী বলে উঠেন, একটু আগে স্বামী গেলেন রিক্সায় চড়ে, আর বউ যাচ্ছেন বিলাসী গাড়ি হাঁকিয়ে।
৭ টা ৪০ এর দিকে কার্যালয় থেকে বের হন কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা রহমান। তাকে ঘিরেও একদল যুব মহিলা লীগের জটলা দেখা যায়। তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আরও পাঁচ মিনিটের মতো নানা বিষয় শেয়ার করলেন তিনি। ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িতে উঠার পর তুলে নিলেন যুব মহিলা লীগের প্রচার সম্পাদক ডলিসহ ৪-৫ জন নেত্রী-কর্মীকে। এসময় গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুব মহিলা লীগের বাকি কর্মীদের কে কীভাবে যাবে, গাড়ি আছে কিনা জানতে চান নাজমা রহমান। এসময় নাজমাকে চট্টগ্রাম মহিলা লীগের নেত্রী চেমন আরা তৈয়বকে উইশ করতে দেখা যায়।
রাত ৮টা। তখনো আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ, যুব মহিলা লীগসহ সহযোগী সংগঠনের অন্তত তিন শতাধিক নেতাকর্মীর ভিড়।
এই দৃশ্য দেখে গেটের কাছে দাঁড়ানো বয়স্ক এক লোক মন্তব্য করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া চারবার ক্ষমতায় যাওয়া বঙ্গবন্ধুর গড়া দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে এমন ভিড় থাকাই স্বাভাবিক।’
তার কথা শেষ না হতেই আরেকজন বলে উঠলেন- ‘আপনার কথা মানলাম। কিন্তু দলের দুঃসময়ে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সেটাই আমার প্রশ্ন।’