বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

অফিস পলিটিকস

প্রকাশিতঃ Sunday, February 7, 2021, 12:47 pm


শান্তনু চৌধুরী : কর্পোরেট সংস্কৃতির এই সময়ে এসে মাথার ওপর সারাক্ষণ চেপে থাকে অফিসের টেনশন। সারাক্ষণ ভয়, ভয় আর ভয়। পদবি নিয়ে ভয়, চেয়ার নিয়ে ভয়। এর চেয়েও বেশি ভয় সম্ভবত সহকর্মীদের। যারা যে কোনো সময় অন্য সহকর্মীর বিরুদ্ধে বসের কান ভারি করতে পারে, বসকে গিয়ে সত্য-মিথ্যা নানাভাবে বোঝাতে পারেন এবং এর পরিণতি হতে পারে অফিসে বছরের পর বছর প্রমোশন না হওয়া, ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে পানিশমেন্ট দেওয়া সর্বোপরি চাকরিটা যাতে চলে যায় এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত করা।

সে যে ছেলেবেলায় আমরা পড়েছিলাম, যন্ত্র মানুষের আবেগ কেড়ে নিয়েছে। আমরাও মনে হয় ধীরে ধীরে যন্ত্রমানবে পরিণত হচ্ছি। কিন্তু যারা রোবট বানাচ্ছেন তারাতো বলছেন ভিন্ন কথা। রোবট সোফিয়ার কথা মনে আছে তো? করোনা পরিস্থিতির কারণে আরো আরো রোবট তৈরি হচ্ছে চীন, জাপানে। যাদের দিয়ে জীবাণু পরিস্কার করা থেকে শুরু করে নানা কাজ করানো হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, যারা রোবট বানাচ্ছেন তারা চেষ্টা করছেন রোবটের মধ্যে মানবিক গুণগুলো কীভাবে প্রবেশ করানো যায়। আর আমরা যারা নিজেদের মানুষ বলে দাবি করি (অথচ আমরা মানুষ কিনা নিশ্চিত নই, কারণ মান ও হুঁশ জ্ঞান না থাকলে তাকে তো মানুষ বলা যায় না) তারাই ব্যক্তিজীবন বলি আর চাকরিজীবন বলি নিজেদের রোবট হিসেবে গড়ে তুলছে এবং অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কীভাবে নিজেকে ওপরে নিয়ে যাবো সেই চেষ্টায় রত।

অফিস পলিটিক্স-এর শিকার হয়ে একজন মানুষের জীবন কতোটা দুর্বিসহ হয়ে উঠতে পারে সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। এর মাধ্যমে অনেকে হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, কেউ জীবনটা নষ্ট করে ফেলেন আবার কেউবা জীবন থেকেই বিদায় নেন। এর কোনোটাই কিন্তু কাম্য নয়। এবং সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে এই যে মানুষগুলো এরা কিন্তু অফিসের কোনো সাধারণ কর্মচারী নন। সাধারণ কর্মচারীরা সাধারণত অফিস পলিটিক্স-এর শিকার হন না। একটু উঁচু পদে গেলেই শুরু হয় এই গুঁতোগুঁতি। এ থেকে বাঁচার কি কোনো উপায় নেই। লেখক ও সমাজকর্মী বাদল সৈয়দের সঙ্গে আলাপচারিতায় একবার জানতে চেয়েছিলাম সেকথা। তিনি সোজা কথায় বলেছেন, ইগনোর করা মানে পাত্তা না দেয়। কিন্তু সবাই তো আর চাইলেই পাত্তা না দিয়ে পারেন না।

বিশেষ করে সাংবাদিকতা বা অন্য যেসব পেশা রয়েছে, যেখানে সবসময় একজন সহকর্মীর সাথে অপর সহকর্মীর কথা বলতেই হয়। এ বিষয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম হাজার হাজার বটিকা। সবগুলোই আসলে চর্বিতচর্বন। ভালো ভালো কথা লেখা। নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল স্টিভ জবসকেও। তাও করেছিলেন তার বন্ধু স্কালী। যাকে ১৯৮৩ সালে, পেপসি-কোলা থেকে জবস নিয়ে আসেন। জন স্কালীকে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রলুব্ধ করার সময় জবস তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কি তোমার জীবনের বাকিটা সময় চিনির পানীয় বিক্রয় করে কাটাতে চাও, নাকি আমার সাথে এসে বিশ্বকে বদলে দিতে চাও?’

অফিস পলিটিক্স নিয়ে গালগল্প সিনেমা বা নাটকের শেষ নেই। এমনকি অনেক আন্দোলনও হয়েছিল। সম্প্রতি আবীর শওকত হায়াতের লেখা ‘অফিস পলিটিক্স’ বইটি। তিনি অফিস পলিটিক্স-এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, সম্পদ, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার জন্য কর্মক্ষেত্রে আমরা যে ধরনের প্রতিযোগিতামূলক আচরণ ও কাজগুলো করে থাকি তাই অফিস পলিটিক্স। এটি আসলে ডিকশনারির সংজ্ঞা।

তিনি সেখানে একটি জায়গায় উল্লেখ করেছেন, ‘অফিসে কিছু মানুষ আর সবার থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। বসের কাছে তাদের অবাধ যাতায়াত। অফিস জুড়ে সবাই জানে এরা স্পেশাল, এরা বসের খাতিরের লোক। এদের ঘাঁটানো যাবে না’। বাজে বসরাই সম্ভবত এক ধরনের অফিস পলিটিক্স জিইয়ে রাখে এবং তারা এক ধরনের আপাত ফায়দা লুটতে চেষ্টা করে। এ ধরনের বসের কথা বলতে গিয়ে শওকত হায়াত লিখেছেন, ‘অফিস আদালতে এদের সংখা কম হলেও এরাই আপনার স্মৃতি ও মনোজগতের বড় একটি অংশ দখল করে রাখবেন। ক্ষেত্রবিশেষে এরা আপনার আত্মার শান্তি নষ্ট করে ফেলবেন। তাতে আপনার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। আপনাকে হয় বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে অথবা চাকরিটি ছেড়ে দিতে হবে’।

একইসঙ্গে লেখক যোগ করেছেন উৎপীড়ক সহকর্মীর কথাও। তার ভাষায় ‘প্রভাবশালী কলিগরা অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে অন্যায় ও নিষ্ঠুর আচরণ করছে এবং তাদের সুযোগ সুবিধা ও অধিকারের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণায় দিনাতিপাত করছে। সাধারণত নষ্ট স্বভাবের মানুষরা উগ্র ধরনের কলিগদের কাছে নির্যাতিত হচ্ছে।’

কেন তারা এমন? ‘বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে একজন মানুষের শৈশব ও বেড়ে উঠা পরবর্তী জীবনের ওপর প্রগাঢ় প্রভাব ফেলে। আমরা আজকে যা হতে পেরেছি তার বীজ আমাদের শৈশব ও কৈশোরে বপন করা হয়েছে। শৈশবের কষ্ট, দারিদ্র্য ও অবহেলা একজন মানুষকে তিক্ত ও নিচু মানসিকতার মানুষে পরিণত করে। ছোটবেলা থেকেই তারা সবকিছুকে সন্দেহের চোখে দেখতে শেখে। জীবন তাদের প্রতি কঠিন হওয়ায় অন্যকে ছাড় দেয়ার বিষয়টি তারা মাথায় রাখতে পারে না। অনেকে আবার সমাজের দয়াদাক্ষিণ্যে বড় হয়ে পরে অসামাজিক বনে যায়। অতীতকে অস্বীকার করে তারা নিজেদের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হয়’। যাক বই থেকে ধার করে অনেক কথাই হলো। বেশি ধার করলে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষকের মতো শাস্তি পেতে হবে। গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির শাস্তি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিয়া রহমানের পদাবনমন ঘটেছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই শিক্ষককে সহযোগী অধ্যাপক থেকে এক ধাপ নামিয়ে সহকারী অধ্যাপক করে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। আলোচিত সেই গবেষণা প্রবন্ধে তার সহকর্মী অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানও শাস্তি পাচ্ছেন। তাকে শিক্ষা ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদানের পর দুই বছর একই পদে থাকতে হবে। এছাড়া পিএইচডি থিসিসে জালিয়াতির আরেক ঘটনায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ওমর ফারুককে সহকারী অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পদে অবনমন ঘটানো হয়েছে। তার ডিগ্রিও বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু সামিয়া রহমানের বাবা বলছেন তার মেয়ে অফিস পলিটিক্সের শিকার। বাবা কাজী মাহমুদুর রহমান ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

সেটির কিছু অংশ এখানে দেয়া হলো- ‘ভিসি আক্তারুজ্জামান ও ডিন সাদেকা হালিমের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার সামিয়া রহমান এখন মৃত্যুশয্যায়। সবার অবগতির জন্যে জানাচ্ছি যে, আমার কন্যা সামিয়া রহমানকে তার নামে মুদ্রিত নিবন্ধে ফুকোর বক্তব্যের কিছু অংশ প্লেগারিজমের দায়ে অভিযুক্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন সাদেকা হালিমের সিন্ডিকেট চক্রটি তার পদাবনতি ঘটিয়েছে। অথচ বিতর্কিত এই নিবন্ধটি সামিয়া লেখেনি, সে তাতে স্বাক্ষর করেনি এবং নিজেও জমা দেয়নি। সামিয়ার নামে এই কাজটি করেছিল ষড়যন্ত্রীদের পক্ষে ক্রিমিনোলজির সহকারী অধ্যাপক মারজান। বিষয়টি সামিয়া রহমান পরে জানার পর সে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং নিবন্ধটি যে সে লেখেনি সে বিষয়ে তার সকল প্রমাণপত্র পেশ করে। কিন্তু ভিসি আক্তারুজ্জামান ও ডিন সাদেকা হালিম তার সকল প্রমাণপত্র উপেক্ষা করে। কারণ পূর্ব থেকেই তারা সামিয়ার প্রতি বিরূপ ও হিংসাপরায়ণ ছিল। তারা ক্ষমতায় আসার পর সামিয়াকে শাস্তি দিতে মারজানকে দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার করে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। গত তিন বছর যাবত ভিসি আক্তারুজ্জামান ও ডিন সাদেকা হালিম বিভিন্ন সময়ে সামিয়াকে চূড়ান্তভাবে অপমানিত ও বিপর্যস্ত করেছে। ট্রাইবুনালের পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য অধ্যাপকদের মতামত উপেক্ষা করে তারা বিচারের নামে প্রহসন করে সামিয়াকে পদাবনতি করে সহকারী অধ্যাপক করেছে এবং তাদের ষড়যন্ত্রের দাবার গুটি মারজানকে পুরস্কারস্বরূপ পূর্বেই স্কলারশিপ দিয়ে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়েছে’। আসলে যতো বড় প্রতিষ্ঠান সেখানে পলিটিক্সও হয়তো তত বড়।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক