শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

রেলের জায়গায় টি কে গ্রুপের বাণিজ্যিক স্থাপনা!

| প্রকাশিতঃ ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ১:৩৩ অপরাহ্ন


হোসাইন সাজ্জাদ : দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর বিরুদ্ধে রেলওয়ে থেকে লিজ নেওয়া এক দশমিক ৩৩ একর কৃষি জমি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠেছে।

ইজারা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সীতাকুণ্ড বড় কুমিরা এলাকার ওই জমিতে লেবার শেড নির্মাণ করেছে টি কে গ্রুপ। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ওই জমি টি কে গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী স্টিল মিলকে একসনা লিজ দেয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ আছে, রেলের এই সম্পদ স্থায়ীভাবে দখলে রাখতে নানা ফন্দি-ফিকির করছে টি কে গ্রুপ। একসনা লিজ নেওয়া ওই জমি ছাড়াও আশপাশের রেলওয়ের মালিকানাধীন আরও ৭ একর জায়গা সাফ কবলায় কিনে নিতে গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর রেল পূর্বাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে আবেদনও করেছে টি কে গ্রুপ।

এদিকে ইজারা চুক্তি ভঙ্গ করে লিজ নেওয়া কৃষিজমিতে লেবার শেড নির্মাণ করায় কর্ণফুলী স্টিল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালামের কাছে গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর ব্যাখ্যা তলব এবং কারণ দর্শানো নোটিশ দেয় রেল পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা কংকন চাকমা।

কৃষির জন্য লিজ নেওয়া জমিতে লেবার শেড নির্মাণ করার কথা স্বীকার করে কর্ণফুলী স্টিল মিলের ব্যবস্থাপক মো, সাইফুদ্দিন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে গত বছর মার্চ মাসে আমরা জায়গাটিতে একটি অস্থায়ী লেবার শেড নির্মাণ করেছি। এটা কোন স্থায়ী স্থাপনা নয়। আমরা ইতিমধ্যে জমিগুলোর দীর্ঘমেয়াদী লিজ বা সাফ কবলায় পাওয়ার জন্য রেল পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। এখন কর্তৃপক্ষ যদি আবেদন গ্রহণ না করে স্থাপনা তুলে ফেলব। আমরা রেল কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিয়েছি।’

এদিকে রেলের জমি কৃষি লিজ নিয়ে তাতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করায় টি কে গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (সিইও) কংকন চাকমা। তিনি জানান, টিকে গ্রুপ কৃষি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয় সুত্র জানিয়েছে, কৃষি লিজের জমিতে স্থায়ী স্থাপনা হিসাবে সেখানে সীমানা দেয়াল নির্মাণ করেছে টিকে গ্রুপ। বানানো হয়েছে ট্রাক চলাচলের রাস্তা। খনন করা হয়েছে পুকুর। টিনের বেড়া দিয়ে ভেতরে নির্মাণ করেছে পানির পাম্প। প্রতিষ্ঠানটির এক নিরাপত্তা কর্মী জানান, পানির পাম্প থেকে টিকে গ্রুপের কারখানায় পানি সরবরাহ দেওয়া হয়।

রেল সুত্র জানায়, কৃষি লিজের চুক্তিপত্রের ৪ নম্বর শর্ত অনুযায়ী উক্ত জমিতে যে ফসলাদি জন্মে তার চাষাবাদ ছাড়া অন্য কোনো কাজ, বসবাসের জন্য কোনো ঘর দরজা তৈরি, দোকানপাট নির্মাণ, বৃক্ষাদি রোপণ বা বাগান তৈরি করা, পুকুর, নালা বা খাল খনন, রাস্তাঘাট, মসজিদ, মন্দির, শ্মশান, কবরস্থান কিম্বা অন্য কোনো কাজের জন্য ওই ভূমি ব্যবহার করা যাবে না। যদি এই শর্তের লঙ্ঘন হয় তাহলে রেল প্রশাসন লাইসেন্স বাতিল করে এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায়ের অধিকার রাখেন। কিন্তু বিদ্যমান আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে টিকে গ্রুপ উক্ত জায়গায় নির্মাণ করেছে বাণিজ্যিক স্থাপনা।

জানা গেছে, ডিইও/ ৩৯৫- কৃষি/ কুমিরা/ ০৫/ ৭৪৭/ ৩৬১/ এ তাং ৩০/ ০৩/ ২০০৫ সালে সীতাকু-ের কুমিরা স্টেশন এলাকায় রেল লাইনের পশ্চিম পাশে (কিমি.২৩/২ হইতে ২৩/৪) এর মধ্যে দুই প্লটে ১ দশমিক ৩৩ একর জমি কর্ণফুলী স্টিল মিল লিমিটেডের বিপরীতে কৃষি লাইসেন্স ইস্যু করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোবারক উল্যা। প্লট দুটির একটি ৪৮ হাজার ৪২০ বর্গফুট, অপরটি ৯ হাজার ৬০০ বর্গফুট।

রেলসুত্র জানায়, বর্তমানে এই এলাকায় এক শতক প্রতি জমির দাম প্রায় ৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে টিকে গ্রুপকে লিজ দেওয়া জমির বর্তমান দাম দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি টাকা। ২০০৫ সালে লিজ দেওয়ার ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত রেলের অনুমতি ছাড়া জমিগুলো অবৈধ দখলে রাখে টিকে গ্রুপ।

সুত্রটি জানায়, ২০০৫ সালে কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য রেলওয়ে থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করেন টিকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম। লাইসেন্স ইস্যু করার আগে পাঁচ বছর অবৈধ দখলে রাখার দায়ে টিকে গ্রুপ থেকে ৭ হাজার ৯৮০ টাকা ক্ষতিপূরণও আদায় করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

পরিসংখ্যান বলছে, ১ দশমিক ৩৩ একর জমি কৃষি লিজে নিলে প্রতি বছর খাজনা পরিশোধ করতে হয় ৩ হাজার ৯৯০ টাকা। কুমিরা এলাকায় একই পরিমাণ জমি বাণিজ্যিকভাবে রেল থেকে লিজ নিতে হয় তাহলে রেলকে রাজস্ব দিতে হবে বছরে ৯ লাখ ২৬ হাজার ৯৫৭ টাকা। ২০০৫ সালে লিজ নেওয়া জমির বিপরীতে টি কে গ্রুপ সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে ৫৯ হাজার ৮৫০ টাকা। একই পরিমাণ জমি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিজ নিলে সরকারকে টি কে গ্রুপকে রাজস্ব দিতে হতো ১ কোটি ৩৯ লাখ ৪ হাজার ৩৫৫ টাকা।

এ বিষয়ে কথা বলতে টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালামকে শুক্রবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। রেলওয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় ভূ সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে রেলের জমিতে অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। টি কে গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এরপর টি কে গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিফ লেদারের পরিচালক (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমানকে ফোন করে এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। তিনি একুশে পত্রিকাকে জানান, এমডি আবুল কালাম আজাদ বিদেশে অবস্থান করছেন। তাই তার বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ নেই।