বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেকে করেছি স্বার্থপর নাকি বিবেকবান!

প্রকাশিতঃ Sunday, February 7, 2021, 2:08 pm


কাজী খাইরুন নেছা : এইচএসসির ফলের দিনের হাঁড়কাপানো শীতের ভোরে আসেনি সূর্যিমামা। শৈত্যপ্রবাহের বাতাসে করোনা অদৃশ্য জীবাণু। একদিকে করোনায় ভয়, অন্যদিকে হিমেল হাওয়ায় মনে জাগছে আশার ফুল। শুধু অপেক্ষা- কুয়াশার ভোর একদিন কেটে যাবে। একটি প্রশান্তির ভোরের অপেক্ষা। করোনার আঘাতের মধ্যেই এল এইচএসসির ফল। মিষ্টিমুখ আর আনন্দে ভাসা ছবি ছাড়াই এলো এইচএসসির ফল।

ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল এলে বাবা মায়ের মতই আনন্দিত হন শিক্ষকরা। এ সুখের অনুভূতি অন্যরকম। শিক্ষকদের আগ্রহ আরও অধীর। শিক্ষার্থীর আনন্দে আমাদের মন দুলে উঠে আনন্দে। এখানে শিক্ষক ও মায়েরা যেন একই সারিতে।

আমি মনে করি বাবা-মা ও শিক্ষক অনেকটা একই। পরিচিত কারো ফল খারাপ হলে আপনজনরা কিছুক্ষণ সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে পেছনে অনেকে বাজে মন্তব্য করতে শোনা যায়। অনেকে বাজে মন্তব্য না করলেও ছাত্রদের সম্বন্ধে ভালো মত পোষণ করেন না বা খারাপটা না বলাই ভালো-এ আর কী?
শিক্ষকরাও বাবা-মার মত।

বাবা মায়ের পরেই থাকবেন শিক্ষক। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি মেধাবী অমেধাবী সব শিক্ষার্থীকে ভালোবাসেন। ছাত্র-ছাত্রীর সুখ-দুঃখে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া কেবল শিক্ষকদের পক্ষেই সম্ভব। নিজে শিক্ষক বলে নয়, দেখেছি আমার শিক্ষকদের।

আমাকে যদি কেউ এসে বলে পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পেয়েছি। তাকে নিয়ে ভাবতাম আমি। কীসে অসুবিধে, কী বোঝেনি। যতটুকু সাহস থাকে তার সবই ঢেলে দেন শিক্ষার্থীর মাথায়। ভালো ফলাফলে যেমন খুশি, তেমনি ফলাফল আশাব্যঞ্জক না হলেও শিক্ষকরা উপদেশ দিয়ে, বুঝিয়ে, অনুরোধ করে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহটা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। নতুন নতুন ক্লাসে যখন ছাত্রছাত্রীরা সুন্দর একটা ফলাফল নিয়ে অগ্রসর হন, শিক্ষার্থীদের আবেগ অনুভূতিগুলো যেন তাদেরই শিক্ষকদেরকে নাড়া দেয়।

মনে পড়ে কত শিক্ষার্থী ভুল করে মিসের জায়গায় মা ডেকেছে। আবার আমার বাচ্চারাও মায়ের জায়গায় মিস ডেকেছে। প্রথম প্রথম মনে করতাম বাচ্চাদের কম সময় দিচ্ছি হয়তোবা এজন্য মা এবং মিসের মধ্যে তালগোল পেকেছে।

এইচএসসি পরীক্ষার ফল দিল স্বস্তির নিঃশ্বাস। অন্যসময় এই ফলাফলের সময় মুখরিত থাকত কলেজ ক্যাম্পাস। হাজার হাজার কোমলপ্রাণ মুখগুলোর পদচারণায় জমে থাকত ক্যাম্পাস। আসত তারা কলেজের শিক্ষকদের সাথে দেখা করার জন্য। তাদের পদচারণায় প্রিয় আঙিনা ভরে উঠত এক মিলনমেলায়। সুখের দিনগুলোর রেশ বড়ই মধুর। কেউ জানাতো আমার রেজাল্ট ভালো, কেউ বলতো আরেকটু ভালো হতে পারতো। কেউ বলতো ‘ম্যাম’ এমন হওয়ার কথা ছিল না। কত কথা!

পরীক্ষার ফলাফলে মিষ্টিমুখ আমাদের চিরায়ত রূপ। একটা সুখবর আর সাথে মিষ্টি থাকবে না- সেটা যেন অবিশ্বাস্য। করোনা সে আনন্দ কেড়ে নিল।

স্মৃতিকথা : চট্টগ্রাম শহরের ৯০ দশকের বিজ্ঞানের যারা ছাত্র ছিলেন তাদের সবার কাছে পরিচিত নাম ছিল সুশীল ভট্টাচার্য। স্যারের কাছাকাছি থাকার সুবাদে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা যেটাই হোক না কেন পরীক্ষার রেজাল্টের পরপরই স্যারের বাসায় চলে আসতো সাফল্যের মিষ্টি। শ্রদ্ধাভরে স্যারকে মনে পড়ছে খুব। বিল্ডিংয়ের সবাইকে স্যার বিলি করতেন সেই রসগোল্লা, চমচম।

করোনার দিনে আমরা শিক্ষকরা এক একটা যন্ত্র। এক একটা গেজেট। আমি যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাস লেকচার দেয়নি। তাহলে কে কার? সারাক্ষণ হাতে-মাথায় ঘুরছে বিজ্ঞানের বিস্ময়। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেকে করছি স্বার্থপর না বিবেকবান নাকি সবল বা দুর্বল। সারাক্ষণ সময় নিজেদের মধ্যে সুপ্ত লড়াই। তবুও প্রতিটা ভোরের আলোকরশ্মি বয়ে আনুক নতুন মঙ্গলবার্তা।

কাজী খাইরুন নেছা সিনিয়র প্রভাষক, ওমর গনি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ