শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

বেড়িবাঁধের চেয়ে জমির আইল ভালো!

| প্রকাশিতঃ ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ৯:২৫ পূর্বাহ্ন


জিন্নাত আয়ুব, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) : বেড়িবাঁধের পুরো অংশ যথেষ্ট উঁচু, মজবুত ও টেকসই করতে হয়। বেড়িবাঁধের মাত্র মিটার দশেক জায়গাও যদি নাজুক থাকে এবং সেখান দিয়ে যদি বন্যা অথবা জোয়ারের পানি ঢুকতে শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অথচ আনোয়ারার জুঁইদন্ডীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের নামে তামাশা চলছে। সেখানে বেড়িবাঁধ দিতে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে একেবারে বাঁধের পাশ থেকে, খনন করে। কথিত বেড়িবাঁধও একেবারে নিচু। বেড়িবাঁধ কতটা মজবুত প্রশ্নে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই বেড়িবাঁধের চেয়ে জমির আইলও শক্ত হবে।

সরেজমিন জুঁইদন্ডী গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে জানান, জুঁইদন্ডী অংশে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে নয়ছয়ের ঘটনা থামছে না। বর্ষা এলে সামান্য বৃষ্টিতে বাঁধ ভেঙে যায়। নতুন প্রকল্পের নামে শুরু হয় নতুন বরাদ্দ। এভাবে বছরের পর বছর উপকূলীয় বাঁধের সংস্কারের নামে চলে অর্থের অপচয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাদ্দাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জুঁইদন্ডী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের এক কিলোমিটার অংশে বেঁড়িবাধ নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তামাশার শেষ নেই। বেঁড়িবাধে কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই বাঁধে মাটি দেওয়া নেওয়া নিয়েও চলছে নানা প্রভাব বিস্তার। বেড়িবাঁধের কাজ মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই করার কথা থাকলেও কাজটি চলছে স্থানীয় নেতাদের সাব-ঠিকাদারীতে।’

মো. এনাম নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, ‘বেড়িবাঁধের সম্পূর্ণ অংশে ব্লক বসানো হলে এবং দূর থেকে মাটি আনা হলে টেকসই হতো। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। মাটি নেয়া হচ্ছে বাঁধের পাশ থেকেই। সামান্য কিছু মাটি ফেলে বাঁধের নামে নাটক করা হচ্ছে। জমির আইলও এ ধরনের বাঁধের চেয়ে মজবুত।’

স্থানীয় একজন নারী বলেন, ‘আমার মা ১২ গন্ডা জমি কিনে ঘর করেছেন, বাঁধ দেয়ার কথা বলে সেই ঘরও ভেঙে দেয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, বাঁধটা পর্যন্ত করে দিচ্ছে না। আমরা নিজেরা যতটুকু পারি মাটি দিয়ে বাঁধ দিয়েছি। এই বাঁধটার উপর মাটি ফেলতে বললেও ফেলেনি তারা।’

জুঁইদন্ডী ৩নং ওয়ার্ডে সাঙ্গু নদীর এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বেঁড়িবাধ নির্মাণের তদারকির দায়িত্বে আছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কায়ছার। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কাজটি করার জন্য একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে, তারাই কাজ করবে। সাব-ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ার নিয়ম নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেড়িবাঁধের পাশ থেকে মাটি দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। মাটি দূর থেকে এনে দিতে হবে।’

জানতে চাইলে সাব-ঠিকাদার দাবি করা মো. মোজাম্মেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই কাজ আমি মূল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়েছি। তারাই বলেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা থেকে মাটি নিতে।’

এ বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী তনয় কুমার ত্রিপুরাকে বারবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এর আগেও একই অভিযোগ নিয়ে তনয় কুমার ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণে অনিয়ম চলছে এটা মানছি। আমরাও কী করব! এখানে স্থানীয় নেতারা প্রভাব কাটিয়ে মূল ঠিকাদার থেকে কাজ নিয়ে নেয়। পরে এদের ইচ্ছামত কাজ করে। এরকম অভিযোগ আমার কাছে আছে। এখন থেকে এসব ব্যাপারে আমরা কঠোর হবো।’

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ২৮০ কোটি টাকার একটা মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে আনোয়ারায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যে টেকসই একটি বেঁড়িবাধের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনও পর্যন্ত তা হয়নি।

এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২৮০ কোটি টাকার বাইরে ২০২০ সালে আরও ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে। এই প্রকল্পের অধীনেও কাজ শুরু হওয়ার কথা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানালেও সরেজমিনে গিয়ে কাজ করার কোন দৃশ্য চোখে পড়েনি।