বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

আবদুল মান্নানের উপর আঘাত, পতনোন্মুখ সময়ের সাইরেন

প্রকাশিতঃ Tuesday, February 9, 2021, 10:23 pm

রেহানা বেগম রানু : মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ভাইয়েরা অনেক বড় বড় অফিসার ছিলেন। সবাই তাঁকে বলতো- ‘তুমি কী সব লেখালেখি করো, ভাইদের মতো হতে পারো না’? দেখি আজ বলুনতো মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সেইসব ভাইদের আপনি চেনেন কিনা? হ্যাঁ, তাদের চিনবেন তবে ‘মানিকের ভাই’ পরিচয়ে।

আইসিএস অফিসার অন্নদাশংকর রায়কে কেউ মনে রাখেনি। সবাই মনে রেখেছেন সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়কে। তুখোড় সিএসপি আফিসার আবু জাফর ওবায়দুল্লাহকেও কেউ মনে রাখেনি, রেখেছেন সাহিত্যিক আবু জাফর ওবায়দুল্লাহকে, তাঁর লেখা পংক্তিমালাকে- ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি’ কিংবা ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’। একইভাবে সচিব হাসনাত আবদুল হাইয়ের চেয়ে প্রখ্যাত কবি-ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাইকে বেশি মনে রেখেছে মানুষ।

প্রিয় পাঠক, মানিক বন্দোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাসনাত আবদুল হাই-এর পথ ধরে প্রভাবশালী সিভিল সার্ভেন্ট কিংবা সচিব নয়, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মো. আবদুল মান্নান বাঁচতে চান শক্তিশালী কথাকার হয়ে। এজন্য সত্য, সততা ও দেশপ্রেমের ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে নিজের সর্বোচ্চ, সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলেছেন তুঙ্গস্পর্শী লেখকসত্ত্বা ও সৃষ্টিসম্ভারে। চারপাশের বাস্তব জীবনকে গভীরভাবে জানা এবং ব্যাপকভিত্তিক সাহিত্যপাঠই মূলত তাঁকে করেছে শাণিত বিবেক, শক্তিমান শুদ্ধতার পথের যাত্রী। সত্য, সুন্দর, সরলীকরণ জীবনই যাঁর নিত্য তপস্যা; সেই আবদুল মান্নানই কিনা আক্রান্ত হলেন, ভয়াবহ জিঘাংসার শিকার হলেন পতনোন্মুখ সমাজের ক্ষয়িষ্ণু চরিত্রগুলোর কাছে। এ যেন পতনোন্মুখ সমাজেরই তীব্র সাইরেন।

ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-লোভের চোরাবালিতে আটকে থাকা সেই মানুষগুলোর বড় ভয় অজস্র-অগণন লোকসংখ্যার ভিড়ে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা আবদুল মান্নানকে। দেশচেতনার অসীম পরাকাষ্ঠায় উত্তীর্ণ মানুষটি সঙ্গতকারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনজরে থাকাটাই স্বাভাবিক। সে কারণেই তারা ধরে নিয়েছিলেন অবসরে যাওয়ার পর আবদুল মান্নান হয়তো এমপি হতে আসবেন, নিজ উপজেলা কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে। ফলে নৈতিকভাবে পরাজিতদের সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ঢেউ নগ্নভাবে আছড়ে পড়লো আবদুল মান্নানের ঘরে, আবদুল মান্নানের মনে।

তাঁর অপরাধ স্থানীয় সংসদ সদস্য, পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদকে না জানিয়ে কটিয়াদির নিজ গ্রামে করোনায়া আক্রান্ত হয়ে অকাল প্রয়াত স্ত্রী জেবুন্নেছার নামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক করছিলেন। ব্যস, তাতেই ক্ষিপ্ত রাজা-মহারাজার অনুসারিরা! এরপর তাদের কেমন দানবীয় উল্লাস- তা দেখলো, জানলো পুরো দেশবাসী।
সাংসদের লেলিয়ে দেওয়া মাস্তানদেরকে লেখক আবদুল মান্নান বারবার বোঝাতে চাইছিলেন এই বলে, ‘আমি এমপি হতে চাই না। আমি লেখক। বাংলাদেশের প্রায় সকল পত্রিকা আমার লেখা প্রকাশ করে। অবসরে যাওয়ার পর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবো। তোমরা উনার (নূর মোহাম্মদ) কাছে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে বলিও না। আমি উনার প্রতিদ্বন্দ্বী না। তিনি (নূর মোহাম্মদ) বড়ভাই। এই কাজটি শেষ করে উনাকে দিয়েই আমি উদ্বোধন করাবো। তোমাদের অনুরোধ এটা বন্ধ করো না। তারা শোনেনি।’

এখানেও বুক চিতিয়ে নিজের জাত দেখালেন, চেনালেন আবদুল মান্নান। সরল স্বীকারোক্তিতে অকপটে বলে দিলেন, বুঝিয়ে দিলেন যার চিত্তের বিত্ত আছে, শক্তিমান লেখকসত্ত্বা আছে তার আর কিছু লাগে না। লাগে না পদ-পদবী, ক্ষমতা-টমতা। সত্য-সৃষ্টি-সুন্দর সঙ্গী করে তিনি স্র্রেফ একজন আবদুল মান্নান কিংবা হোসেন আবদুল মান্নান হয়েই থাকতে চান অনুক্ষণ কিংবা জীবনের অবশিষ্ট সময়গুলো।

কথাকার আবদুল মান্নানকে আমি বা আমরা চিনি প্রজাতন্ত্রের কেবল একজন শ্রেষ্ঠ-সুন্দরতম কর্মচারী হিসেবে নয়; অসীম সাহসী, প্রবল দৃঢ়চিত্তের একজন মানুষ হিসেবে। যাঁর হৃদয়ে দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি মমতার অমিয় ক্ষুধা। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামের ডিসি হয়ে যোগদানের পরদিনই বহদ্দারহাটে সরকারের নির্মিয়মাণ ফ্লাইওভার ধসে বাইশজন মানুষের মৃত্যু, ট্র্যাজিক পরিণতি। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খড়া-তপ্ত মাঠ, উদগ্র গ্রুপিং-বিরোধিতা, পাশাপাশি জনবিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি।

এই শ্বাপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে আমরা কাছ থেকে দেখেছি কী অসীম দৃঢ়তায় একজন আবদুল মান্নান সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, মোকাবিলা করেছেন। আহতদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা-সুশ্রুষা দিয়ে নিহত পরিবারগুলোকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ফ্লাইওভারের বাকি নির্মাণকাজ শুরু এবং শেষ করে সেসময় আবদুল মান্নান দেখিয়েছিলেন প্রশাসকের দক্ষতা-বিচক্ষনতা।

২০১৪ সালে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার গুজব রটিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মিনি পাকিস্তান খ্যাত সাতকানিয়া-লোহাগড়ায় ব্যাপক তা-ব ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল বিএনপি-জামাত কিংবা পাকবাহিনীরা দোসর-প্রেতাত্মারা। রাস্তার দুই পাশ থেকে হাজার হাজার গাছ কেটে, উপড়ে ফেলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরূদ্ধতার দেয়াল যখন কেউ ভাঙার সাহস করছিলেন না, চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নানই সেসময় স্পর্ধিত সাহস নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। সড়ক অবরোধ-জামাতি আস্ফালন উপড়ে ফেলে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

২০১৭ সালের আগস্ট মাস, মিয়ানমারে দলন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছিল রোহিঙ্গারা। অত্যন্ত ঝুঁকি, কষ্টসহিষ্ণু জেনেও মানবিক বিবেচনায় সেসময় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ; আর সেই জটিল, বিশৃঙ্খল, কর্দমাক্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের তৎকালীন কমিশনার আবদুল মান্নানে। রোহিঙ্গাক্যাম্প স্থাপন ও তাদের মাঝে শৃঙ্খলাপূর্ণ বাস নিশ্চিত করতে নিরলস ঘাম ঝরিয়েছেন শুধু নয়, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে মিয়ানমারে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নিয়েছেন এই মানুষটি।

এভাবেই একজন আবদুল মান্নান গণকল্যাণে, রাষ্ট্রকল্যাণ নিশ্চিতে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে বঙ্গবন্ধুকন্যার নির্দেশিত পথে জেগেছেন, জ্বলে ওঠেছেন বারে বারে। সর্বশেষ করোনার থাবায় পুরো দেশ-জাতি যখন নাকাল-ম্যাসাকার, স্বাস্থ্যখাতের যুগপৎ করুণতম অবস্থা, তখনও বঙ্গবন্ধুকন্যা আস্থা রাখলেন এ আবদুল মান্নানের ওপর। প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে তাঁর হাতেই তুলে দিলেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত। সেই সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে স্বাস্থ্যখাতের হাল ধরে করোনামুক্ত বাংলাদেশ গঠনে নিরলস, নিষ্কলুষ সিপাহশালারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন আবদুল মান্নান। বলাবাহুল্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর করোনামুক্তির মিশন-ভিশনে আবদুল মান্নান অন্যতম যোগ্য-বলিষ্ঠ একজন, স্বপ্নচারী সুজন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সেই কাফেলাটির অহর্নিশ রাতজাগার ফল আজকের বাংলাদেশে করোনামুক্ত ভোরের হাতছানি।

রেহানা বেগম রানু আইনজীবী, নারী নেত্রী ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কাউন্সিলর।