বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বেদনাকে বলেছি কেঁদো না

প্রকাশিতঃ Sunday, February 14, 2021, 12:55 pm

শান্তনু চৌধুরী :

‘আমি ফিরব না আর, আমি কোনোদিন

কারো প্রেমিক হবো না;

প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী চাই

আজ আমি সব প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হবো’।
– আবুল হাসান

জীবন আসলে বহতা নদীর মতো। কতোজন এলো গেলো, কতোজনই বা আসবে। কিন্তু যে যায় সে কি ফেরে? মাঝে মাঝে মর্মন্তুদ দীর্ঘশ্বাস বলে দেয়, যারা গেছে তারা আর ফিরবে না। আজ প্রিয়তমাকে কোনো প্রেমের কাব্য শোনাবো না। আর সবই মৃত্যুর কবিতা শুধু এইটে জীবনের। ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’-এর ইব্রাহিম কার্দির কথা মনে আছে। মারাঠা শিবির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে যার কাছে এসেছিল জোহরা। জোহরাকে দেখে কার্দি বলেছিল, ‘কতোদিন তোমাকে দেখি না। কতোকাল তোমার এই রূপ আমি দেখিনি। অশ্বপৃষ্টে নয়, মাটির ওপর দাঁড়িয়ে তুমি। রক্তাক্ত তরবারি নয়, হাতে তোমার মেহেদী পাতার রঙ। ওই আনত মুখ, ওই নির্মিলিত চোখ-এতো রূপ তোমার। একবার মুখ তুলে তাকাও আমার দিকে।’ এতো ভালোবাসার পরও ফিরে যায়নি কার্দি। জোহরার আহ্বান উপেক্ষা করেই কার্দি বলেছিল, ‘যে ফিরে যাবে সে আমি হব না। সে হবে ইব্রাহিম কার্দির লাশ। তাকে দিয়ে তুমি কি করবে? তুমি কাঁদছ? ভারতে মুসলিম শক্তি জয়যুক্ত হোক, তার পূর্ণ গর্ব ফিরে পাক। বিশ্বাস করো এ কামনা আমার মনে অহরহ জ্বলছে। কিন্তু আমার সংকটের দিনে যারা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল, কর্মে নিযুক্ত করেছে, ঐশ্বর্য দান করেছে সে মারাঠাদের বিপদের দিনে আমি চুপ করে বসে থাকবো। আমি নিশ্চিত জানি, জয়-পরাজয় যাই আসুক। মৃত্যু ভিন্ন আমার মুক্তির আর কোনো পথ নেই। এ সময় তুমি আমার কাছ থেকে চলে যেও না।’
আসলে বড় প্রেম শুধুই কাছে টানে না দূরে ঠেলেও দেয়। এই যেমন তুমি আমার কতো দূরে। তাই বলে কি প্রেম কমে। মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়া কতো শত মুখের সাথে চকিতে দেখা হয়ে যায়। মেঘ কালো বিকেলগুলো আচানক ঝকঝকে হয়ে উঠে। আয়োজনের খাতায় চমকে উঠা সুর শুনি-বন্ধু কী খবর বলো? আমাদের মধ্যে যে ছেলেটার হাতে সবসময় গাঁজার পুরিয়া থাকতো, সেই এখন কলমের খোঁচায় মাদক আইনে দণ্ড দিয়ে দেয়।

লাঠি হাতে প্রতিপক্ষকে তাড়া করা বন্ধুটি এখনো তাড়া করে, তবে আইনি পোশাক পরে। গিটার হাতে থাকা বন্ধুটির হাতে এখন আর গিটার নেই। আছে নানা প্রকল্প। সোনাঝরা বিকেলে লেডিস হলে যেতে চাইতো যে বন্ধুটি তার এখন ব্যাংকের টাকা গুণতে গুণতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার তাড়া। জাঁদরেল ডাকসাঁইটে নেতা মুখ লুকোয় ভালোবাসার আঁচলে। আর আমিও! চোখে চশমা উঠেছে। শরীরটা একটু ভারি হয়েছে বোধহয়। কিন্তু সেই অমলকান্তি এখনো খুঁঁজছে রোদ্দুর। জীবন মানে অর্থহীন। কিন্তু জীবন ঘিরে থাকা মানুষগুলোকে ঘিরেই তো আমাদের সব অর্থপূর্ণতা। বাবা-মা আছে বলেই তো মমতার শেকল পায়ে। বন্ধু আছে বলেইতো বিশ্বাস এখনো নিঃশ্বাস নিতে শেখায়। ভালোবাসার মানুষ আছে বলেই তো হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে সায়ন পথ থেকে অ্যান্ড্রোমিডা অবধি।

করে না? একজোড়া চোখের শিথিল মায়াবি দীঘিতে স্নান করতে ইচ্ছেতো হয়ই। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করেনি তার স্পর্শে মহাকাল থেকে মহাকাল। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? আহারে ফেলে আসা দিনগুলো। হাহাকার কিংবা কাব্যিক উচ্ছ্বলতা বা হৃদয় কুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসা। কিন্তু হেলাল হাফিজ এক নিমিষে বলে ফেলেন-

‘আমাকে দুঃখের শ্লোক কে শোনাবে?
কে দেখাবে আমাকে দুঃখের চিহ্ন কী এমন,
দুঃখ তো আমার সেই জন্ম থেকে জীবনের
একমাত্র মৌলিক কাহিনী’।

‘ভুলো না আমায়’ লেখা চিঠি ফুলের পাপড়িসহ ভুল বানানে প্রেমপত্র পাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অনেকের হয়তো আছে। একজন মানুষ চিঠিতে তার জীবনের সবচেয়ে গোপন অথচ বেদনার কথাগুলো অকপটে বলে দিতে পারে। তেমনি পারে অন্যের বেদনাকে জাগিয়ে দিতেও। তাই আজও লিখি। তোমার চোখের ওপর থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে নেওয়া, ঘুম থেকে ওঠার ঠিক পরের দৃশ্য। সদ্য ফোঁটা ফুলের মতো চোখ দুটো যখন একটু একটু করে খুলতে, রেস্তোরাঁয় বসে প্রিয় খাবারটি খাওয়ার সময়ে আমার দিকে যখন তুমি তাকাতে, কোনও কিছু ভাবার সময়ে যখন ঠোঁট কামড়াতে, প্রাণ খুলে হাসতে, স্নান করার পরে যখন বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা কপাল থেকে গড়িয়ে পড়তো তখন কী যে ভালো লাগতো, অথচ কতোদিন হয় সে দৃশ্য দেখা হয় না।

নদী আর চাঁদ পাশাপাশি দেখা মিললে দস্যুর মতো চাঁদ যেমন ঝাঁপিয়ে পড়তো নদীর বুকে তোমার মনে আছে, তেমন তরঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলিঙ্গনে অস্থির করে তুলতে। প্রবাহিনী নদী চাঁদের আকর্ষণ হতে ছুটে চলছে। কী অসাধারণ সে রতি-রঙ্গ।

একবার নাকি কবি শামসুর রাহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জীবন আপনাকে কি শিখিয়েছে? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবন শিখিয়েছে জীবনকে ছেড়ে যেতে নেই।’ এরপরও দেখো না জীবনের কতো কিছুই তো আমরা ছেড়ে গেছি। জীবনও ছেড়ে দিয়েছে অনেক কিছু। গায়ক অঞ্জন দত্তকে পুরনো গিটার দিয়েছে অনেক কিছু। হুট করে কাউকে ভালোলাগা, ভালোবাসা। ফেলে আসা কতো গান, নাম ঠিকানা।

তবে কবি শ্রীজাতের কথাগুলো একটু পরিবর্তন করে মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই কতোকাল আগে কেনা মুঠোফোনের নাম্বারটা এখনো আমার কাছে রয়ে গেছে। ভাবি, কত লোক ছেড়ে গেছে, সে তো যায়নি। অথচ সে আসলে পারমুটেশন আর কম্বিনেশনের একটা সম্ভাবনা মাত্র। হঠাৎ মনে হয়, এগারো সংখ্যার এই নম্বরের তৃতীয় সংখ্যাটি পাল্টে গেলে যার টেলিফোন নম্বর পাওয়া যাবে, সে হয়তো পুলিশের এক কনস্টেবল। আজ তার ঘুষ ঠিকমতো জুটেনি বলে খুব বিরক্ত। বাসায় ফিরতে হবে খালি হাতে। শিশু, বৃদ্ধা মায়ের জন্য কিছুই নিতে পারবে না। সপ্তম সংখ্যাটি বদলে দিলেই পাওয়া যাবে বৃদ্ধাশ্রমের এক বৃদ্ধাকে, যিনি আজও তাঁর মস্তবড় অফিসার ছেলের আশায় পথ চেয়ে আছেন। অনেক রাত জেগে থাকেন ছেলে-মেয়ের ছবি বুকে নিয়ে।

আবার দ্বিতীয় সংখ্যাটা বদলে ফেললেই মিলবে কলেজ পড়ুয়া এক টিনএজ তরুণী যে প্রেমিককে শরীর দেবার জন্যে একটা ঘর খুঁঁজছে অনেকদিন ধরে। এইভাবে আমি দেখতে পাই এক উচ্চপদস্থ আমলা, এক বেশ্যার দালাল, এক উঠতি নায়িকা, এক তরুণ লেখক, বিজ্ঞাপনের এজেন্ট, সার্কাসদলের মালিক, এক সিনেমার এক্সট্রা, প্রমোটার ও আরও আরও আরও অনেককে।

তারপর ভাবি, এই ক’টা নম্বর পরপর বসে থেকেই তৈরি করেছে আমাকে। এর মধ্যে যে কোনও একটা বদলে গেলেই আমি ছিটকে যেতে পারতাম যেখানে খুশি। না, আমি ছিটকে যাইনি। এখনো তোমার হাত ধরবো বলে চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে আছি। গ্রহণ লাগা চাঁদ ইথারে তোমার কাছে ভেসে নিয়ে যাবে আমার গোপন বাসনা।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক