বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

কলেজ ছাত্রলীগের দায়িত্বে মোবাইল চোর, থানার দায়িত্বে সাইকেল চোর!

প্রকাশিতঃ সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২১, ৯:৫৬ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : দীর্ঘ তিন যুগ পর ঘোষিত সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের কমিটিতে আহ্বায়ক হয়েছেন ‘মোবাইল চুরি’ এবং বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার দায়ে অভিযুক্ত কাজী নাঈমকে।

অন্যদিকে, হালিশহর থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন ‘সাইকেল চুরির’ ঘটনায় অভিযুক্ত আব্দুর রহিম জিসান। অভিযোগ উঠেছে, বিবাহিত হওয়ার পাশাপাশি জিসানের নেই ছাত্রত্বও।

এছাড়া চকবাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ইভান বিয়ে করেছেন প্রায় দুই বছর আগে। বিভিন্ন থানায় কয়েকটি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ; বাকলিয়া, হালিশহর, চকবাজার, পাহাড়তলী, বায়েজিদ থানা এবং পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, চকবাজার, দক্ষিণ কাট্টলী, সরাইপাড়া ও রামপুর ওয়ার্ডে, এবং পরেরদিন বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ থানা ছাত্রলীগের কমিটিসহ মোট ১৩ টি কমিটির অনুমোদন দেন নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। অনুমোদিত এসব কমিটির কোনওটি পূর্ণাঙ্গ, আবার কোনওটি আংশিক।

অভিযোগ উঠেছে, ঘোষিত এসব নতুন কমিটির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে অছাত্র ও বিবাহিত। অনেকে আবার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত।

সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী বোরহান উদ্দিন ইমন, সালাউদ্দিন আকাশ ও ইলিয়াছ চৌধুরীসহ অনেকেই অভিযোগ করে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় ২০১৬ সালে গণধোলাইয়ের শিকার হন কাজী নাঈম। শুধু তাই নয়, গত বছরের শেষের দিকে কলেজে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত ছাত্রলীগের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলতে দেখা গেছে নাঈমকে। কলেজের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি হয়েছে ভাইরাল।

কমিটি দিয়েই গত বুধবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকায় চলে যান নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। এদিকে কমিটি অনুমোদন দেওয়ার সাথে সাথে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্রলীগের ত্যাগী ও পদবঞ্চিতরা। বিতর্কিত এসব কমিটি নিয়ে ছাত্রলীগে বিরোধ এখন তুঙ্গে। অনেকটা ঘরের আগুনেই পুড়ছে ছাত্রলীগ। ইতোমধ্যে বিক্ষুব্ধ ও পদবঞ্চিতরা ঘোষণা করেছে পাল্টা কমিটি।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ২৯ বছর পর্যন্ত যাদের বয়স রয়েছে, শুধু তাঁরাই কমিটিতে স্থান পাবেন। নিয়মিত ছাত্রত্ব থাকার পাশাপাশি হতে হবে অবিবাহিত। কিন্তু কমিটি গঠনে এসব শর্ত কিংবা গঠনতন্ত্র কিছুই মানা হয়নি। যার কারণে ঘোষিত এসব কমিটিতে অছাত্র এবং বিবাহিতরাও পেয়েছেন শীর্ষ পদ।

নগর ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাদের অভিযোগ, নতুন কমিটি দেওয়ার আগে ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো বৈঠকও করেননি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। অছাত্র, বিবাহিত ও অপরাধীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ও গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওয়াহিদ রাসেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ মহানগর ছাত্রলীগ কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার জন্য বেশ কয়েকবছর ধরেই বলে আসছি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা থেকে শুরু করে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা সবাইকে আমরা এই বিষয়ে অবহিত করেছি। নিয়ম অনুযায়ী এই কমিটি কিন্তু নতুন কোনো কমিটির অনুমোদন দিতে পারে না। কিন্তু তারা দিয়েছে। তাই আমরা আমাদের প্রতিবাদস্বরূপ পাল্টা কমিটি দিয়েছি।’

নগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মিঠুন মল্লিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তিনটি কমিটির পরিবর্তন হলো। কিন্তু নগর ছাত্রলীগের কোনো পরিবর্তন তো আসেইনি, উল্টো ১ বছরের অনুমোদন নিয়ে বাড়তি সাত বছর এই কমিটি পার করেছে। এখন তো নিজেদের ছাত্রলীগের নেতা বলতেও লজ্জা লাগে। কারণ আমাদের ছাত্রলীগ করার বয়স নেই।’

পাল্টা কমিটি দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সংগঠনের নেতাদের সাথে কোনো আলাপ না করেই কমিটিগুলো দিয়েছে। যারা সংগঠনকে ভালোবেসে সবসময় কাজ করে গেছে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে সেই মনগড়া কমিটিগুলোতে। তাই তাদের সংগঠনের প্রতি আস্থাশীল করার পাশাপাশি এসব অনিয়মের প্রতিবাদস্বরূপ পাল্টা কমিটি করেছি।’

নগর ছাত্রলীগের সদস্য ইফতেখার হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ঘোষণা করা ১৩ টি কমিটির নবনির্বাচিত বেশিরভাগ নেতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। যেমন, হালিশহর থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আব্দুর রহিম জিসানের বিরুদ্ধে সাইকেল চুরির অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে আসতে শুরু করেছে।

নগর ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল এক নেতা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের আহ্বায়কের মত পদে সাইকেল চোরকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। জিসানের বিরুদ্ধে যে শুধু সাইকেল চুরির অভিযোগ আছে তা নয়, চাঁদাবাজী এবং নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথেও সে জড়িত। আর এই বিষয়গুলো হালিশহর এলাকার ওপেন সিক্রেট।’

এদিকে, মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে পারলে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের নতুন ঘোষিত কমিটির আহ্বায়ক কাজী নাঈম।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। যদি পারে আমি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবো। ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ের রোষানলের কারণে আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে কাজী নাঈম বলেন, ‘আমি যে সংগঠন করি এর শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ছবি সম্বলিত ব্যানার আমি কেন ছিঁড়বো। কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে ছাত্রনেতাদের কমিটমেন্ট ছিল যে, কোনো ব্যক্তিগত ব্যানার দেওয়া যাবে না। কেউ এই চুক্তি উপেক্ষা করে ব্যানার ঝুলালে তা সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। আর যে ব্যানারটি সরানো হয়েছিল সেটা কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সরানো হয়েছিল।’

অন্যদিকে, সাইকেল চুরির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে হালিশহর থানা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত আহ্বায়ক আব্দুর রহিম জিসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যারা এই অভিযোগ তুলছেন তারা প্রমাণ করতে পারলে আমি যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবো। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’

হালিশহর থানার পাল্টা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাক্ষর জালিয়াতি করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘পাল্টা কমিটি অনুমোদনের বিষয়ে জানতে মহানগর ছাত্রলীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সাথে আমি কথা বলেছি। তারা আমাকে জানিয়েছেন এই বিষয়ে তারাও অবগত নন। তারা আমাদের সাথে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।’ -যোগ করেন জিসান।

জানতে চাইলে চকবাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ইভান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি বিবাহিত বলে বেশকিছু মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু সত্যি বিষয়টি হলো আমি বিয়েই করিনি। আর মামলার বিষয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সেগুলোও ভিত্তিহীন। আমাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল, যেগুলোতে আমার সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে ৩ বছর আগেই আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহাম্মেদ ইমুর মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল দিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরের নাম্বারে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়, প্রতিবার রিং হলেও তিনি সাড়া দেননি।