শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

ছিন্নমূলদের কাঁদিয়ে স্বাবলম্বীদের হাসালেন ইউএনও!

প্রকাশিতঃ বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১, ৯:২৪ অপরাহ্ণ

জিন্নাত আয়ুব,  বাঁশখালী ঘুরে এসে : উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের জঙ্গল কালিপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ যোগ্যতাভিত্তিক পুনর্বাসিত ১৪ ছিন্নমূল পরিবারকে উচ্ছেদ করে সেখানে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও জায়গাজমি থাকা লোকদের বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউএনও মোমেনা আক্তার ও কালিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ ন ম শাহাদাত আলমের বিরুদ্ধে।

তবে বাঁশখালীর ইউএনও মোমেনা আক্তার দাবি করেন, এরা এতদিন সেখানে অবৈধভাবে ছিল। এখন যাচাই-বাছাই করে যাদের ঘর নেই, তাদেরকেই নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

ইউএনও’র কথার সূত্র ধরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাওয়া ফনিদ্র রুদ্রকে ফোন দিলে তার স্ত্রী বাসন্তি রুদ্র ফোন ধরেন। আপনার ঘর কোথায়- জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান কালিপুর কুমারপাড়া। কুমারপাড়ার ঘরটি নিজস্ব কিনা জানতে চাইলে তিনি তার স্বামী ফনিদ্র’র নিজস্ব ঘর বলে স্বীকার করেন।

‘ঘর থাকা সত্ত্বেও আশ্রয়ন প্রকল্পে কেন ঘর নিলেন,  ঘরটিতো তালাবদ্ধ’- এমন প্রশ্ন শুনে তিনি খানিকক্ষণ চুপ থাকেন, এরপর ওমা সাংবাদিক মনে হয়…চেয়ারম্যান সাহেব তো সাংবাদিকের ফোন ধরতে মানা করেছিলেন-হায় এখন আমি কী করব- বলেই ফোন কেটে দেন।

যারা ঘরে থাকে না তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে- ইউএনও মোমেনা আক্তারের এমন বক্তব্যের সত্যতা জানতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাছমিন আক্তার স্বামী দেলোয়ার হোসেন ও দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৮ নাম্বার ঘরে আছেন।

প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে দেলোয়ার হোসেন হাউ-মাউ করে কেঁদে বলেন, ইউএনও আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলছেন, আমি এই বয়সে বউ-বাচ্ছা নিয়ে কোথায় যাব। আমার কোন বাড়িঘর নেই ২০১৫ সালে তৎকালীন ইউএনও সাব্বির ইকবাল যাচাই-বাছাই করে আমাকে এই ঘর দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ইউএনও বলছেন, আমরা নাকি অবৈধভাবে বসবাস করছি।

এ ব্যাপারে বাঁশখালীর সাবেক ইউএনও, বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির ইকবালের মুখোমুখি হয় একুশে পত্রিকা। তিনি বলেন, উচ্ছেদের বিষয়ে আসলে আমি অবগত নই। তাছাড়া বর্তমান ইউএনও মোমেনা আক্তার তো ভালো। ওনি এরকম করার তো কথা না। এই ব্যাপারে না জেনে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে ২০১৫ সালে বাঁশখালী ছেড়ে আসার আগে আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা জানান সাব্বির ইকবাল।

এদিকে ৫ বছর ধরে আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর ১০ নাম্বার ঘরে বসবাস করে আসা মো. চুন্নু মিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, চেয়ারম্যান শাহাদাত আমাদের এখান থেকে চলে যেতে বলার পর আমি চেয়ারম্যানের পায়ে ধরে বলি আমার থাকার কোনও জায়গা নেই, কোথায় যাব- একথা বলার সাথে সাথে তিনি আমাকে লাথি মেরে ফেলে দেন।

চুন্নু মিয়ার ছেলে মো. শাহ আলম বলেন, চেয়ারম্যানের কথামত ইউএনও আমরা ১৪ পরিবারকে উচ্ছেদ করে চেয়ারম্যান শাহাদাতের পছন্দমত লোকদের এখানে আশ্রায় দিয়েছেন। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা ইউএনওএর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন। অথচ আগের ইউএনও সাব্বির ইকবাল সবকিছু যাচাই-বাছাই করে এই প্রকল্পে আমাদের  আশ্রয় দেন। সেই থেকে গত ৫ বছর ধরে আমরা বসবাস করে আসছি।

প্রকল্পের বাসিন্দা মো. শাহজাহান বলেন, এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের গাড়ির চালক সুবোধ দাশ ও ইউএনও’র গৃহপরিচারিকা রুবি আকতারকে এই প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের যে ১৪ পরিবার উচ্ছেদ করেছে তাদের কাছে কারো জমি কিংবা ঘর নেই।

নতুন বরাদ্দের তালিকায় দেখা যায়, ৭ নম্বরেই এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের ড্রাইভার সুবোধ দাশের নাম। তালিকায় তার যে মোবাইল নম্বরটি দেওয়া হয়েছে সেটি অদ্ভুত এক নাম্বার। সেই নাম্বারটিতে ( ০১১১৫৬৫১১১) ফোন করলে বারবার ভুল নাম্বার বলে ফিরতি বার্তা আসে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরাদ্দ পাওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের সেই বাড়িটিকে ড্রাইভার সুবোধ দাশ ব্যক্তিগত অফিস বানিয়েছেন।

তথ্যানুসন্ধানের এক পর্যায়ে টেলিফোনে ফের ইউএনও মোমেনা আক্তারের  মুখোমুখি হলে তিনি বলেন, আমরা যাচাই-বাছাই করে এই আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরগুলো নতুনভাবে বরাদ্দ দিচ্ছি। এসব প্রসেসিং করে নথিপত্র জেলা প্রশাসক মহোদয় বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছি। ফনিদ্র রুদ্র ও সুবোধের বিষয় তুলে ধরলে ইউএনও ফোন কেটে দেন।

‘আপনার গাড়ির চালক সুবোধ দাশ জঙ্গল কালীপুর আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এ একটি ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন’- একুশে পত্রিকার এমন প্রশ্নে বাশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান পাল্টা প্রশ্ন করেন, এটা আপনার কী দরকার? যাদের ঘর নেই তাদের উচ্ছেদ করে আপনার ড্রাইভারকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক-এই প্রশ্নে এমপি বলেন, এটা আমি জানি না। এটা প্রশাসনের কাজ, প্রশাসন দিয়েছে।

কালিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ ন ম  শাহাদাত আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও কোনোবার তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

একুশে/জেআই/এটি