শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

কাফকোর সিএফও হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর এ কেমন খায়েস?

প্রকাশিতঃ বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১, ২:৫২ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর বিরুদ্ধে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশের অন্যতম বড় এই ইউরিয়া সার কারখানাটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু নানা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির লাভের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে এই কর্মকর্তার পকেটে।

অভিযোগ আছে, কাফকো কোম্পানির সকল ধরনের স্থানীয় বীমা এবং ব্যাংক আমানত থেকে কমিশন নেন তিনি। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ সরকার, জাপান, নেদারল্যান্ড এবং ডেনমার্কের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির আন্তর্জাতিক সকল বীমা পদাধিকারবলে মোকাবিলা করেন হাবিব উল্লাহ মঞ্জু। সে সুবাদে এখান থেকে তিনি হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ।

কোম্পানির তরল কস্টিক সোডা জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্যাদি সংগ্রহের দায়িত্বে আছেন তিনি। মিশর, ওমান এবং সৌদি আরব থেকে ইউএফ-৮৫ রাসায়নিক ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই কর্মকর্তা বড় অংকের কমিশন নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তরল এমোনিয়া বিদেশে রপ্তানি এবং জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইউরিয়া সার পাঠানোর জন্য কাফকো কোম্পানির রয়েছে নিজস্ব জেটি। জাহাজের ধাক্কায় জেটির একটি স্তম্ভ নষ্ট হলে কোনোরকম টেন্ডার ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে সেই জেটি মেরামতের জন্য সিঙ্গাপুরের একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি।

তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, একটি মাত্র স্তম্ভ মেরামতের জন্য সংস্থাটির সাথে প্রায় ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি করেছেন হাবিব উল্লাহ। টেন্ডার ছাড়া এই জেটি মেরামতে অস্বাভাবিক অর্থব্যয় প্রকারান্তরে হাবিবুল্লাহ মঞ্জুর পকেট ভারি করারই একটি কূটকৌশল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানের অর্থসাশ্রয় বা লাভ-ক্ষতির চেয়ে অস্বাভাবিক অর্থ রোজগারের উদগ্র বাসনাই হাবিব উল্লাহর ধ্যানজ্ঞান। তার লক্ষ্য-কেবল টাকা আর টাকা। যেভাবেই হোক, যে পন্থায় হোক কাড়ি কাড়ি টাকা কামানো তার অসম, অদ্ভুত এক খায়েস!’

শুধু কি টাকা উপার্জনের নেশা? হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর বিরুদ্ধে আছে যৌন হয়রানি ও নানা স্ক্যান্ডাল। অভিযোগ, কর্মস্থলে অধীনস্থ নারীকর্মীদের যৌন হয়রানি করেন শুধু নয়, ইনিয়ে-বিনিয়ে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব, নানা কৌশলে তাদের বাগে আনার চেষ্টা করেন তিনি। প্রস্তাবে সম্মত না হলে তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে।

সূত্র মতে, ইতোমধ্যে সোনারগাঁও হোটেল, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর চাকরি খোয়ানোর বড় কারণ হচ্ছে দুর্নীতির পাশাপাশি মহিলাকর্মীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ।

জানা যায়, কাফকোতে চাকরি পেতেও তিনি নিয়েছেন বড় ধরনের জালিয়াতির আশ্রয়। কাফকোতে দেওয়া নিজের সিভিতে পূর্বের কর্মস্থলে চাকরি হারানো এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের নাম গোপন করেছিলেন তিনি। এছাড়া কাফকো থেকে বাড়তি বেতন সুবিধা পেতে ডিবিএলে যা পেতেন তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেতন দেখিয়েছেন মঞ্জু।

শুধু তাই নয়, ৩ বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পেলেও বাংলাদেশী বোর্ডের কয়েকজন সদস্যকে মোটা অংকের অর্থ এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা দিয়ে ৩ বছর পার হওয়ার পরও অধ্যবধি বহাল তবিয়তেই আছেন হাবিব উল্লাহ।

একাধিক সূত্র মতে, মূলত কাফকোতে যোগদানের পর অর্থনৈতিকভাবে বেশ  ফুলে ফেঁপে উঠেন তিনি। এখানে যোগদানের পর থেকে তার সম্পত্তি কেনার প্রবণতা বেড়ে যায়। দেশে বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্টের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরেও রয়েছে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। অভিযোগ আছে সেই ব্যাংক একাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করছেন এই কর্মকর্তা।

সূত্র মতে, হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর আছে প্রবল সিঙ্গাপুরপ্রীতি। আর এর যথার্থতা পাওয়া যায় সিঙ্গাপুরের সংস্থাকে অবৈধভাবে বিনাটেন্ডারে জেটি মেরামতের কাজ পাইয়ে দেয়া, সিঙ্গাপুরে ব্যাংক একাউন্টের পাশাপাশি প্রতিবছর স্ব-পরিবারে সিঙ্গাপুরে বিলাসবহুল ভ্রমণে। আর কাফকোতে যোগদানের পর থেকে বিদেশভ্রমণ তার নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে।

তবে এতসব অভিযোগের কোনোটাই সত্য নয় বলে একুশে পত্রিকার কাছে দাবি করেছেন কাফকোর সিএফও হাবিবুল্লাহ মঞ্জু; তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে কেউ হয়তো আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব অভিযোগ যে মিথ্যা তা আমি প্রমাণ করতে পারবো। এ সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আমার কাছে আছে, যা আপনারা চাইলে বা আমার অফিসে এলে দিতে পারবো।’

এরপর তিনি তার অফিসে চায়ের নিমন্ত্রণ জানিয়ে দফায় দফায় ফোন করেন। এক পর্যায়ে একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে আসারও ইচ্ছে পোষণ করেন। কিন্তু অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেখা-সাক্ষাৎ বর্জন করে হোয়াটসআপ বা মেইলে ওইসব ডকুমেন্টস পাঠাতে অনুরোধ করা হলে তিনি পাঠাননি। সর্বশেষ গত রোববার (১৪ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত ডকুমেন্টস পাঠানোর জন্য সময় নিয়েও তিনি তা পাঠাননি। পরবর্তীতে টেলিফোনে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে সুর পাল্টে ফেলেন এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, নারীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ ভিত্তিহীন। কোনো নারীকে আমি হেনস্তা করেছি কেউ বলতে পারবে না। আর সিঙ্গাপুরে আমার ব্যাংক একাউন্ট থাকতেই পারে। এতে তো সমস্যার কিছু নেই। আর পরিবার নিয়ে আমি প্রতিবছরই ঘুরতে যাই।

এসময় হাবিব উল্লাহ বলেন, আমাদের কোম্পানির কিছু পলিসি আছে। সেই পলিসির বাইরে আমাদের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি এই কোম্পানিতে চাকরি করি। আমি চাইলেই কোনও একক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমি এই কোম্পানির একটি ছোট্ট অংশ মাত্র।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রতিবেদককে প্রতিবেদন না করার অনুরোধ জানান তিনি। কারণ হিসেবে বলেন, ‘জেটির ইন্স্যুরেন্স থাকায় এর ক্ষতির সম্পূর্ণ টাকা আমরা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী থেকে ফেরত পাবো, যা প্রক্রিয়াধীন। এই মুহূর্তে যদি প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয় তাহলে আমাদের বিরাট একটি ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী তখন নানা অজুহাত দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে চাইবে না।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশ হলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে জানিয়ে হাবিব উল্লাহ মঞ্জু বলেন, আমার সম্মন্ধে মানুষের একটি খারাপ ভাবমূর্তি তৈরি হবে। আর আমার অবস্থান সম্পর্কে তো আমি জনে জনে জানাতে পারি না। তাই মানুষ যখন এধরনের কিছু জানবে তখন সেটা আমার জন্য ক্ষতিকর হবে।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক এক সভাপতির মাধ্যমেও নিউজটি না করতে তিনি একাধিকবার অনুরোধ করেন এবং দফারফার চেষ্টা করেন।

একুশে/জেআইএস/এটি