শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

দুদকের সনদ : দুর্নীতির আঁতুরঘরে কোনো দুর্নীতি নেই!

প্রকাশিতঃ বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১, ৩:৫৬ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে অনিয়ম আছে- যা সংশ্লিষ্ট সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন। সেখানে শুল্ক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পণ্যের তথ্য গোপন করে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ সব কাজের জন্য গড়ে ওঠা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কাছে কাস্টম হাউসও জিম্মি বলে আলোচনা আছে। অথচ কাস্টম কেন্দ্রিক দুর্নীতির বেশকিছু অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমে সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যার কারণে অভিযোগগুলো নথিভুক্ত করে সংশ্লিষ্টদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার বিষয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়নি দুদক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ ও চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট থেকে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আত্মসাত করা হয়েছে- এমন একটি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুদকের প্রধান কার্যালয়। ২০১৭ সালে অভিযোগটির অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযোগটি অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান দুদক প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী, উপপরিচালক এস এম আখতার হামিদ ভূঞা ও মোছা. সেলিনা আখতার মনি।

এরপর দীর্ঘ প্রায় চার বছর অনুসন্ধান করেও শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগটির সত্যতা পাননি দুদক কর্মকর্তারা! গত বছরের ৩১ আগস্ট অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা অভিযোগটি নথিভুক্ত করার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার সুপারিশ করেন। এরপর ৯ নভেম্বর দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান) সাঈদ মাহবুব খান অভিযোগটি নিষ্পত্তি করার বিষয়টি দুদকের সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দিয়ে জানান। অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে কারও নাম চিঠিতে উল্লেখ নেই। এছাড়া প্রায় চার বছর অনুসন্ধান করেও অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরে চিঠিতে কিছুই বলা হয়নি।

এদিকে ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ, ঢাকা কাস্টম হাউজ, কমলাপুর আইসিডি, ঢাকার বন্ড কমিশনারেটের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি ও শুল্ক নির্ধারণে দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয় দুদকে। ২০১৫ সালে উক্ত অভিযোগটির অনুসন্ধান শুরু হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য টিম লিডার নিয়োগ দেয়া হয় দুদক প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীকে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কাস্টম হাউসগুলোতে বিভিন্ন নথিপত্র চেয়ে দুদক থেকে চিঠি দেওয়া হয়। এভাবে প্রায় পাঁচ বছর অনুসন্ধানের পর গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান) সাঈদ মাহবুব খান দুদকের সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে উক্ত অভিযোগগুলো নথিভুক্ত করার বিষয়টি জানান। অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে কারও নাম উক্ত চিঠিতে উল্লেখ নেই।

অন্যদিকে ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের যুগ্ম কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করা ফিরোজ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী রুনা লায়লার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে। একই বছর অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য দায়িত্ব পান দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মলয় কুমার সাহা। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে বদলি করা হয় ফিরোজ উদ্দিন আহমেদকে।

এক বছরের বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান করে ফিরোজ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী রুনা লায়লার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পাননি দুদক কর্মকর্তা মলয় কুমার সাহা। গত বছরের ৩১ আগস্ট অভিযোগটি নথিভুক্ত করে নিষ্পত্তি করার সুপারিশ করেন তিনি। এ প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৬ নভেম্বর দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান) সাঈদ মাহবুব খান অভিযোগটি নিষ্পত্তির বিষয়টি রুনা লায়লাসহ দুদকের সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে জানান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, গণমাধ্যম, হটলাইন, ইমেইল, গোয়েন্দা সংস্থা ও অভিযোগ বাক্সসহ বিভিন্ন উৎস থেকে দুর্নীতির অভিযোগ-তথ্য পাওয়ার পর তা দুদকের এক বা একাধিক যাচাই-বাছাই কমিটি খতিয়ে দেখে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যাচাই-বাছাই কমিটি সুপারিশ করলেই কেবল অনুসন্ধান শুরু করা হয়।

সে হিসেবে যেসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়, স্বাভাবিকভাবে তার ভিত্তি থাকতে হয়। এ ধরনের অভিযোগ পেয়েই বিগত সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তাদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও গিয়েছেন।

এমন অবস্থায় বছরের পর বছর অনুসন্ধান করেও কাস্টমের মতো জায়গায় দুর্নীতি খুঁজে না পাওয়ার উক্ত কয়েকটি ঘটনা অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি বা সনাক-টিআইবি, চট্টগ্রামের সভাপতি আকতার কবির চৌধুরী।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুর্নীতি বন্ধ করার পবিত্র দায়িত্ব যাদের হাতে রাষ্ট্র ন্যস্ত করেছে, আইন মানার দায় যাদের বেশি তারাই আইন মানছে না। যাদেরকে ধরবে তাদের চাইতে যারা ধরবে তাদের সমস্যাটা বেশি। দুর্নীতিবাজ ও ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া ব্যক্তিরা তাদেরকে বশে নিয়ে ফেলছে। ফলে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি ও আত্মসাতের অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্টরা সহজে দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন।’

আকতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘দুর্নীতিবাজরা এখন বুক ফুলিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, বলবে আমি নির্দোষ, নিরপরাধ, সৎ ছিলাম বলেই তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কিছু আসেনি। তার চেয়ে তদন্ত না হওয়া অনেক ভালো ছিল। তদন্তে ছাড় পাওয়ার একটা সার্টিফিকেটের চেয়ে তদন্ত না করাটা অনেক ভালো। দুদককেই সততা, স্বচ্ছতার জায়গায় আনতে হবে। দুর্নীতি তদন্তের নামে জাতির সাথে তামাশা করা একেবারে উচিত নয়।’

দুদকের মুখপাত্র ও পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য একুশে পত্রিকাকে বলেছেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে দুদক কাউকেই ছাড় দেয় না। অনুসন্ধানে কোনো অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়া গেলেই কেবল অব্যাহতি দেওয়া হয়। কমিশন কোনো মামলা করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে করে থাকে।’