শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

তালাকের প্রতিশোধ নিতে ধর্ষণ মামলা!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১, ৯:০১ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামে ‘ধর্ষণের’ সাজানো মামলায় প্রায় দুইমাস ধরে কারাভোগ করছেন শাহাদাত হোসেন নামে এক যুবক। অভিযোগ উঠেছে, তালাকের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে শাহাদাতের সাবেক স্ত্রী জরিনা বেগম মামলাটি করিয়েছেন। এ কাজে জরিনাকে সহযোগিতা করেছেন নগরের চান্দগাঁও থানার এএসআই হামিদসহ দুজন পুলিশ সদস্য। আর মামলার ‘বাদী’ হিসেবে রাখা হয়েছে ‘রোবি আকতার’ নামের এক নারীকে, যার প্রকৃত নাম আয়েশা বেগম।

ভুক্তভোগী শাহাদাত হোসেন বাঁশখালী থানার বাহারছড়ার রত্নপুর গ্রামের লেদু মিয়ার ছেলে। গত ২৭ ডিসেম্বর ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারে আছেন তিনি।

উক্ত ‘ধর্ষণ’ মামলার কথিত বাদী ওই নারী সম্প্রতি আদালতের নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে গিয়ে হলফনামা সম্পাদন করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘তার নাম আয়েশা বেগম প্রকাশ রোবি। আসামি শাহাদাত হোসেনকে তিনি কখনো দেখেননি। ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মামলায় দায়ের করা নাম-পরিচয় ও ঘটনার বর্ণনা সব মিথ্যা হলেও মোবাইল নাম্বারটি সঠিক বলে জানান আয়েশা।’

নাম্বারটিতে আসামি পক্ষ যোগাযোগ করলে আয়েশার স্বামী মোহাম্মদ রফিক চান্দগাঁও থানায় গিয়ে ঘটনার বিষয়ে জানতে ব্যর্থ হন; পরে আদালতে গিয়ে মামলাটি দায়েরের খবর পান তারা।

অভিযোগ উঠেছে, ‘ধর্ষণ’ মামলায় যাকে বাদী বানানো হয়েছে এজাহারে তিনি প্রকৃত নাম-ঠিকানা গোপন করেছেন। বাদী নিজের প্রকৃত নাম গোপন করে মামলার এজাহারে ব্যবহার করেছেন আরেকজন নারীর নাম-ঠিকানা।

এসব বিষয়ে জানতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই কাজল দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে এ ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল ১ লাখ টাকা দেনমোহরে কুমিল্লার মুরাদনগরের জরিনার সাথে শাহাদাতের বিয়ে হয়। জরিনার বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানাধীন কোম্পানিগঞ্জ গ্রামে। বাবার নাম আবুল হাশেম। গত বছরের ১২ নভেম্বর জরিনাকে তালাক দেন শাহাদাত। তখন দেনমোহরও পরিশোধ করেন তিনি।

অভিযোগ আছে, তালাকের প্রতিশোধ নিতে শাহাদাতকে ধর্ষণের মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন জরিনা। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে টাকার বিনিময়ে ‘ভাড়া’ করেন এক নারীকে, যিনি এজাহারে নিজেকে রোবি আক্তার পরিচয় দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জরিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তার মোবাইল নাম্বার ও ঠিকানা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কেউ দিতে পারেননি।

এজাহারে কথিত বাদী উল্লেখ করেন, ২০০৭ সালে লোকমান নামে এক যুবকের সাথে বিয়ে হয় তার। সন্তান না হওয়ায় ‘ঘটনার’ দুই মাস আগে তার স্বামী তাকে চন্দ্রঘোনায় এক কবিরাজের কাছে নিয়ে যান। কবিরাজকে কল করার সময় ‘ভুলে’ শাহাদাতের মোবাইলে চলে যায়৷ নিজেকে কবিরাজ পরিচয় দিয়ে রোবির সমস্যার কথা জানতে চান শাহাদাত। সন্তান না হওয়ার বিষয়টি জানালে তাকে কিছু কবিরাজি ওষুধ দেবেন বলে জানান শাহাদাত।

ওষুধ দেয়ার কথা বলে গত ২৬ ডিসেম্বর ‘রোবিকে’ বহদ্দারহাট জামান হোটেলে আসতে বলেন শাহাদাত। কিছু ওষুধ দিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন শাহাদাত। ২৭ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় শাহাদাত ঝাড়ফুঁক দেয়ার কথা বলে রোবিকে নিয়ে যান বহদ্দারহাট ‘খান আবাসিক হোটেলের চার তলায় ৪০২ নম্বর কক্ষে। একপর্যায়ে ফুসলিয়ে রোবিকে দুইবার ‘ধর্ষণ’ করেন শাহাদাত।

‘অভিযোগ’ পেয়ে ওই হোটেল থেকে শাহাদাতকে আটক করেন থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ‘ভিকটিমকে’ পাঠানো হয় চমেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। এর আগে বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় শাহাদাতের বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণ’ মামলা করেন কথিত রোবি আকতার। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শাহাদাতকে আদালতের মাধ্যমে পাঠানো হয় কারাগারে।

শাহাদাতের বর্তমান স্ত্রী কামরুন নাহারের দাবি, ‘ভিকটিম’ রোবি আকতারের শারীরিক পরীক্ষার প্রতিবেদন দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এতে তারা বলেছেন ‘বর্তমানে ভিকটিমকে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। অতীতে তার সাথে শারীরিক সম্পর্কের আলামত বিদ্যামান।’

জানা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী কথিত ‘রোবি আক্তারের’ প্রকৃত নাম আয়েশা বেগম। বাবার নাম ছাবের আহমদ। মায়ের নাম দিলুয়ারা বেগম। তার এনআইডি নং (২৩৬৪৯৫১৬০৪)। ঠিকানা-পূর্ব বাকলিয়া (পাট-১) চান্দ গাজীর বাড়ি। স্বামীর নাম-মোহাম্মদ রফিক। বাবার নাম মো. শফি (এনআইডি নং:৬৮৮০১৬৬৪৮০)। ঠিকানা একই এলাকার। অন্যদিকে এজাহারে বাদী নিজের নাম উল্লেখ করেছেন, রোবি আক্তার (২৭)। স্বামী- লোকমান। পিতা-মৃত বাবুল আহমদ। সাং-পাহাড়তলী। বড় মুন্সির বাড়ি। পূর্ব রাউজান, চট্টগ্রাম। এজাহারে বর্ণনায় রোবি নিজেকে নিঃসন্তান দাবি করেছেন; অন্যদিকে শারমীন (১৩) ও হাসান (১৬) নামে দুটি সন্তান আছে আয়েশার।

এদিকে কিছুদিন আগে আয়েশা এবং তার স্বামী মোহাম্মদ রফিককে চান্দগাঁও থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।

ভুক্তভোগী শাহাদাতের পরিবারের অভিযোগ, ‘ধর্ষণের’ অভিযোগের মামলাটি সাজানো। মিথ্যা মামলা রেকর্ড করার ঘটনায় চান্দগাঁও থানার এএসআই হামিদসহ দুজন পুলিশ সদস্য জড়িত।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে আজ বৃহস্পতিবার এএসআই হামিদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এরপর মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এএসআই হামিদ। পরে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ করেননি তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কারও প্রতি অবিচার করা হবে না। তদন্তাধীন বিষয়ে মতামত দেওয়া ঠিক না। তদন্ত শেষ হোক। অভিযোগের সত্যতা না পেলে ফাইনাল রিপোর্ট দেব। পাশাপাশি বাদীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’