শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

মহিষের গলায় ছুরি চালালেই ধোঁয়া বের হয় গাছ থেকে!

প্রকাশিতঃ শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১, ৭:০৮ অপরাহ্ণ


আবছার রাফি : মহিষের গলায় ছুরি চালালেই ধোঁয়া বের হয় গাছ থেকে! শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এমন ঘটনাই ঘটে আসছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার মধ্যম করলডেঙ্গা গ্রামে হযরত শাহ বুঁ-আলী কালন্দর (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে। এলাকাবাসীর দাবি, ওরশের দিন সূর্যাস্তের সময় ভক্ত-অনুরক্তের নেয়া মহিষ জবাই করলে মাজারের চারপাশে থাকা জীবন্ত গাছের আগা দিয়ে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। জাতীয় তথ্য বাতায়নেও এমন তথ্য দেওয়া আছে। সম্প্রতি ধোঁয়া উড়ার দৃশ্য সম্বলিত একটি ভিডিও প্রকাশ হলে এই ঘটনা আবারও আলোচনায় আসে।

এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বোয়ালখালী উপজেলার মধ্যম করলডেঙ্গা গ্রামে হযরত শাহ বু-আলী কালন্দর (র:) এর মাজার অবস্থিত। এই ওরশ শতবর্ষ পুরনো। ১৯০০ সাল থেকে ২ ও ৫ই ফাল্গুন এই ওরশ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ মাজার নিয়ে অনেক উপাখ্যান প্রচলিত থাকলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় হল, মহিষ জবাই করলে গাছ থেকে ধোঁয়া বের হওয়া। ওরশের দিন সূর্যাস্তের সময় মহিষ জবাই করলে মাজারের চারপাশে জীবন্ত গাছের আগা দিয়ে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। এই অলৌকিক দৃশ্য দেখার জন্য ওরশ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার নারী ও পুরুষ ভক্ত জড়ো হয় মাজার এলাকায়; যা ধর্মানুরাগীদের ভেতর উৎসাহ আর উদ্দীপনায় আবেগ মিশ্রিত পরিবেশ সৃষ্টি করে।

জানতে চাইলে বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আছিয়া খাতুন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি শুনেছি তবে কখনও সরেজমিন যাওয়া হয়নি সেখানে। বোয়ালখালী নামের উৎপত্তি হয়রত শাহ বুঁ- আলী কালান্দর (র:)-এর নামে হয়েছে; স্থানীয়ভাবে এমন জনশ্রুতি আছে বলেও এসময় উল্লেখ করেন তিনি।

একই প্রসঙ্গে করলডেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হামিদুল হক মান্নান বলেন, ‘আমরা পূর্ব পুরুষ থেকে এটা শুনে আসছি। স্বচক্ষে দেখছি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে। প্রতিবছর ২ ও ৩ ফাল্গুন সূর্যাস্তের সময় এটা দেখা যায়, তবে মাঝে কয়েকবছর আমরা তা দেখিনি।’

এ ব্যাপারে আবু শাহাদাত মো. সায়েম নামের এক ভক্ত বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে পীর-দরবেশ নিয়ে অনেক অলৌকিক ঘটনা শুনেছি তবে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে এ প্রথম। হযরত শাহ বুঁ-আলী কালান্দর (র:)- এর জন্য আমরা বোয়ালখালীবাসী ধন্য; আমাদের উপজেলার নামকরণ ও ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে উনার জন্য’।

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা আবু সৈয়দ বলেন, ‘প্রত্যেক বছর ওরশ হলে আমরা এটা দেখতে ছুটে যাই। এখানকার ভক্তবৃন্দ হযরত শাহ বুঁ-আলী কালান্দর (র:)-এর মাজারে বিপদ-আপদে ছুটে গিয়ে মনে প্রশান্তি লাভ করে। কালের সাক্ষী হয়ে এ মাজার আমাদের ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, থাকবে।

প্রসঙ্গত, শেখ শরফুদ্দিন বুঁ- আলী কালন্দর পানিপতি (১২০৯-১৩২৪ খ্রিস্টাব্দ) চিশতিয়া তরিকার একজন সূফি সাধক, যিনি ভারতে বাস করতেন। পানিপথের শহরে তার দরগাহ (মাজার) অবস্থিত যা একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান। তাঁর আসল নাম ছিল শেখ শরফুদ্দিন কিন্তু তিনি বুঁ- আলী শাহ নামেই অধিক পরিচিত। তাঁর পিতার নাম শেখ ফখর উদ্দিন, যিনি তাঁর সময়ে মহান পণ্ডিত এবং দরবেশ ছিলেন। তিনি খুব অল্প বয়সে তাঁর পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরবর্তীকালে প্রায় বিশ বছর দিল্লির কুতুব মিনারের নিকটে পড়াশোনা করেন। দিওয়ানে হযরত শরফুদ্দিন বুঁ-আলী কালান্দার নামে তিনি ফার্সি কবিতার একটি সংকলন প্রকাশিত করেন যা পরবর্তকালে খাজা শাহাউদ্দিন কর্তৃক পাঞ্জাবি ভাষায় অনূদিত হয়।

এই মহান সাধকের অনেক উপাখ্যান লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। একটি উপখ্যান এমন রয়েছে যে, প্রায় ৩৬ বছর কার্নাল নদীর পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে সাধনা করার ফলস্বরূপ হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁকে বু আলী (আলীর সুবাস) উপাধি দান করেন। এ মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়ার পর অনেক মহান সুফি সাধক তাঁর সাক্ষাত লাভ করার জন্য আসেন।

অন্য আরেকটি উপাখ্যানে উল্লেখ আছে, একদিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বেশারতে (স্বপ্ন) আসেন এবং তাকে একটি ইচ্ছা পূরণের আশ্বাস দেন। কালান্দর নবুওয়াতের আবেদন করলেন এবং তাঁকে বলা হল নবুওয়তের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) হচ্ছেন শেষ নবী। তারপর তিনি আলী হতে চাইলেন এবং বলা হল ঐ মর্যাদাটিও আগেই পূর্ণ হয়েছে। এরপর তিনি আলীর অন্তত সুবাস পাওয়ার জন্য আবেদন করলেন এবং তাঁর এই ইচ্ছা পূর্ণ করা হল।