বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৮

জামালখানে পাহাড়খেকোদের আবাসন-আগ্রাসী থাবা!

প্রকাশিতঃ রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১, ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পাহাড়কাটা সম্পর্কে বাধা-নিষেধ রয়েছে। আইনানুসারে ‘সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়-টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না।’

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিনিষেধ অমান্য করে নগরের প্রাণকেন্দ্র জামালখানেই পাহাড় (গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের পাহাড় হিসেবে পরিচিত) কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে আবাসিক ভবন। প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করলেও পাহাড়টিকে ক্রমশ মাটিতে শুইয়ে দিয়ে আবাসনের আগ্রাসী থাবা বন্ধে আর কোনো খবর রাখেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। যেন ‘অন্ধ’র ভূমিকা পালন করছে তারা।

শুধু যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে তা নয়, সিডিএ’র দেওয়া শর্তের তোয়াক্কা না করে আবাসনের নামে নগরীর অন্যতম বড় পাহাড়টি দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও কাটা হচ্ছে সমান গতিতে। সিডিএ’র শর্ত ভঙ্গ করে চলামান আবাসন কার্যক্রমের বিষয়ে জানে না খোদ সিডিএ। পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার বিষয়ে জেনেও নামমাত্র শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে আবাসন প্রকল্পের অনুমতি। কিন্তু সেই শর্তও মানার প্রয়োজনবোধ করছে না পাহাড়খেকোরা। পাহাড়কেটে ভবন নির্মাণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তারা।
এ পরিস্থিতিতে শর্তভঙ্গের বিষয়ে তদারকি কিংবা প্রয়োজনীয় কোনও পদক্ষেপ নিতেও দেখা যাচ্ছে না সিডিএকে। শর্তের কথা বলে তারাও যেন দায় সারছে। দুই প্রতিষ্ঠানের এমন দায়সারা ভাব প্রকারান্তরে প্রভাবশালী পাহাড়খেকোদের সাথে সমঝোতার ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।

তাদের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তরের নিরব ভূমিকা আর সিডিএ’র গাফিলতির সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী পাহাড়খেকোরা ধ্বংস করছে পাহাড়, নষ্ট করছে পরিবেশের ভারসাম্য।

এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিডিএ পাহাড়কাটার ব্যাপারে জেনেও মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধমে এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও পাহাড়কাটার বিষয় পরিবেশ অধিদপ্তরের গাফিলতিকেই দুষছে সিডিএ। পক্ষান্তরে সিডিএ’র ভূমিকা ও বক্তব্যে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা-ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পরস্পর দোষারোপে ব্যস্ত সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর।

সিডিএ সূত্র জানায়, কোতোয়ালী থানার এসএস খালেদ রোড সংলগ্ন রিমা কমিউনিটি সেন্টারের ঠিক সামনের পাহাড়ি জায়গায় আবাসিক ভবন নির্মাণে অনুমোদনের জন্য সিডিএ’র কাছে আবেদন করেন সজল চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি।

আবেদনকারীর প্রস্তাবিত জায়গা পরিদর্শন করে ১৪টি শর্তসাপেক্ষে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) নগর পরিকল্পনাবিদরা ২০২০ সালের ৯ আগস্ট ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান করেন। আবেদনকারীর প্রস্তাবিত ভূমিটি পাহাড় এলাকা হওয়ায় সিডিএ’র ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রে উক্ত ‘পাহাড় কর্তন, পরিমার্জন বা পাহাড়ের আকার পরিবর্তন করা যাবে না’- এমন শর্তও দেওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, ম্যাপ অনুযায়ী প্রস্তাবিত ভূমি আবাসিক হলেও প্রস্তাবিত ভবনের দখল, সর্বোচ্চ পরিধি ও ভবনের উচ্চতা নির্ধারণের জন্য মাস্টার প্ল্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী সিডিএ’র নগর উন্নয়ন কমিটি থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল সেই ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রে।

এরপর গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে সজল চৌধুরী গং লিখিত আবেদন করলেও নগর উন্নয়ন কমিটি সেই আবেদনের অনুমোদন দেয়নি বলে জানা যায়। কিন্তু এসব শর্ত ও নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের জন্য দিনে দুপুরে কাটা হচ্ছে পাহাড়।

এর আগে গত বছরের ১৮ ও ৩১ মে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগরের কর্মকর্তারা গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক পাহাড় সরেজমিন পরিদর্শন করেন। কিন্তু ততক্ষণে ২৮ হাজার ঘনফুট পাহাড় কেটে ফেলা হয়। সরেজমিনে এ অবস্থা দেখে সংশ্লিষ্টদেরকে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরবর্তীতে, ১ জুন পরিবেশ অধিদপ্তরের শুনানিতে বিবাদী পক্ষের সনজিৎ দত্ত, এডভোকেট নিখিল কুমার নাথ, এডভোকেট সুভাষ নাথকে সেই জরিমানা ৭ দিনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী সেই টাকা পরিশোধও করেছে বিবাদী পক্ষ।

একই সাথে কর্তনকৃত পাহাড়কে পূর্বাবস্থায় ফেরৎ আনাসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা অনুমতি ছাড়া ভবিষ্যতে পাহাড়কাটা, বহুতল ভবন নির্মাণ অথবা যে কোনও উন্নয়নমূলক কর্মকা- না করার নির্দেশ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও সতর্ক করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

কিন্তু জরিমানা পরবর্তী দেওয়া সতর্কতার তোয়াক্কা না করে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়টিকে পূর্বাবস্থায় ফেরত আনার নির্দেশনা দেওয়া হলেও সেই নির্দেশনা পালন দূরের কথা, বরং পাহাড়টি আরও কেটে ফেলা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এমন নিরবতায় বিভিন্ন প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে।

শুধু তা নয়, পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার পর সিডিএ থেকে সেই পাহাড়ি ভূমিতে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

মঙ্গলবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রিমা কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীতে ক্ষতবিক্ষত পাহাড়টিতে রঙিন টিন দিয়ে বেশ উঁচু ও বড় বেষ্টনি দেওয়া হয়েছে। বাড়তি নিরাপত্তার জন্য এই বেষ্টনির ভিতরে রাখা হয়েছে আরও একটি ঘেরাও।

এসব বেষ্টনীর ভিতরে প্রবেশের জন্য দরজা থাকলেও সেগুলো ছিল তালাবদ্ধ, ছিলো না কোনো নিরাপত্তাপ্রহরী। ফলে পাহাড়টির ভেতরে প্রবেশ করা যায়নি। আশপাশে বেশকিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর একজন নিরাপত্তা সহকারীর দেখা মিলে; তিনি বললেন, ভেতরে বহিরাগত কারো প্রবেশ নিষেধ। এব্যাপারে স্যারদের নিষেধ আছে। পরে পাশের একটি ভবন থেকে দেখা যায়, পাহাড়টির উপরের অংশের প্রায় সবকটি গাছ কেটে সেখানে নির্মাণ সামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

পাহাড়ের নিচের টিলা অংশ কেটে তার উপর রঙিন ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। রাস্তা সংলগ্ন বেষ্টনীর ঠিক ভেতরের অংশের টিলা খনন করার ফলে সেখানে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দেখেই বোঝা যায়, ভবনের পাইলিংয়ের কাজ শুরু করতেই চলছে এই খননযজ্ঞ!

স্থানীয় আসবাবপত্রের এক দোকানদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বেশ কয়েকমাস ধরে এখানে পাহাড় কাটা হচ্ছে। দিনের বেলা তো কাটছেই, রাতেও পুরোদমে চলে পাহাড়কাটা। শুনেছি বড় বিল্ডিং হবে। তবে পাহাড় কাটার বিষয়টি এই এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর কয়েকদিন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। শুনেছি বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ও বিত্তবান লোক এর সাথে জড়িত। তাই কোনও কিছুকেই তারা তোয়াক্কা করছে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্শ্ববর্তী ভবনের কেয়ারটেকার বলেন, ‘গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বেশ কিছু অফিসার এসে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। শুনেছি বড় অংকের আর্থিক জরিমানাও করেছিল পাহাড় কাটার দায়ে। কিন্তু এর সপ্তাহখানেক পর আবার পাহাড় কাটা শুরু হয়। এখন তো পাহাড় কাটা প্রায় শেষ। ছাদ থেকে দেখলাম কাটা অংশের উপর বড় পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ কাজের সরঞ্জামও নিয়ে গেছে তারা।’

তবে এ পরিস্থিতিতে আইনের সীমাবদ্ধতাকেই দুষছেন দ্য ডেইলি স্টার’র পরিবেশ বিটের আলোচিত রিপোর্টার মোস্তফা ইউসুফ। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অবৈধ কর্মকা- সংঘটনের ক্ষেত্রে পরিবেশ আইনের কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, পাহাড়কাটার দায়ে যাকে পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা করছে তিনি এটাই ভেবে নেন, একবার জরিমানা যেহেতু হয়েছে এখন আর কোনো সমস্যা নেই। জরিমানার মধ্যদিয়ে বোধহয় অবৈধ্য ব্যাপারটি জায়েজ হয়ে গেল!’

তিনি বলেন, ‘পাহাড় কেটে সমতল করা জায়গায় কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও এই স্থাপনা নির্মাণে অনুমতি দিতে পারবে না’-এমন নির্দেশনা যদি আইনে উল্লেখ করা হতো তাহলে এধরনের কর্মকা- অনেক কমে আসতো বলে আমি মনে করি।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা করেই দায় সারে। কিন্তু এর তদারকি করার যে বিষয়টি সেটা তারা অনুসরণ করে না। আর সিডিএ’র যে দায়িত্ব সেটা তো তারা ঠিকমতো পালন করছেন না। যে স্থানে পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা করছে সেই স্থানেই আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি সিডিএ দিচ্ছে। সমন্বয়হীনতার কারণেই এই অবৈধ কর্মকা- ঘটছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এই দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।’ বলেন ডেইলি স্টারের স্টাফ করসপনডেন্ট মোস্তফা ইউসুফ।

এক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রিমা কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীতে যে আবাসিক স্থাপনাটি করার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল আমরা এর অনুমতি দেইনি। তবে নগর পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্ব ছিল বিষয়টি তদারকি করার। তাদের উচিত এই বিষয়টি তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। তারা যদি না দেখে তাহলে আমাদের কী করার আছে বলুন?’

পাহাড়কাটা দেখভালের বিষয়ে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাহাড়কাটার বিষয়টি মূলত দেখবে পরিবেশ অধিদপ্তর। আমাদের এখতিয়ার না থাকায় আমরা পাহাড়কাটা নিয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারি না। আমরা অনুমতি দিই ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত কাজে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর যদি এই বিষয়ে একটি নোটিশ দিতো তাহলে এর উপর ভিত্তি করে আমরা সিডিএ থেকে কিছু একটা করতে পারতাম।’

এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরকেই অভিযুক্ত করতে চান সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস; তিনি বলেন, ‘বায়েজিদে পাহাড় কেটে রাস্তা করার অজুহাতে পরিবেশ অধিদপ্তর সিডিএকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করতে পারে, কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে যখন পাহাড়কাটা হয় তখন কি তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়? এখন পরিবেশ অধিদপ্তর কিছু করবে না, কারণ তারা ম্যানেজড। সরকারি কাজে তারা বাধাবিঘœ ঘটায়, যেটা প্রাইভেট প্রপার্টির ক্ষেত্রে করে না, কারণ তারা এগুলো থেকে পয়সা পায়।’

সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পাহাড় না কেটেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন আমরা দিয়েছিলাম। পাহাড় কাটা হলে সেটা পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ারের মধ্যে। যদি পাহাড় কাটতে হয় তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন লাগবে। এখন যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন না নিয়ে পাহাড় কাটা হয় তাহলে তারা ফৌজদারি মামলা করতে পারে।’

সিডিএ’র গাফেলতি বা তদারকি না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে অথরাইজড অফিসার তদারকি করার কথা। আমরা যেখানেই ব্যবস্থা নিতে যাই, তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে বা অন্যভাবে তারা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। তবে আমাদের লোকবল সংকট আছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি এই বিষয়গুলো তদারকি করার।’

পাহাড় কাটার অভিযোগটি মিথ্যা দাবি করে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, পাহাড়টি কাটার দায়ে আমরা গত বছরের জুনে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করে কাজ বন্ধ করেছি। জরিমানার টাকাও তারা পরিশোধ করেছে। আর পাহাড় কাটা হচ্ছে না সেটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। কারণ আমার বাসা থেকে খুব স্পষ্ট পাহাড়টি দেখা যায়। তারা এমনিতে ঘেরাও দিয়ে রেখেছে। এখানে অভিযোগের কোনো সুযোগ নেই, কেউ হয়তো মিথ্যা অভিযোগ করছে।’

তিনিও সিডিএ’র দিকে পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, ‘সিডিএকে আমরা বলেছিলাম পাহাড়ে আবাসন প্রকল্পের কাজ করার অনুমতি না দিতে। আমাদের জরিমানার অনুলিপিও সিডিএকে দিয়েছিলাম। পাহাড়ে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য অনুমতি দেওয়ার আগে তারা সেটা দেখে দিবে না? কিন্তু সিডিএ তো এতো কিছুর পরও অনুমতি দিয়েছে।’

আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সিডিএ’র অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিডিএ আমার বিরুদ্ধে কীভাবে এই অভিযোগ করছে? অফিসিয়ালি আমি সিডিএ’র বোর্ড মেম্বার, আগামী বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি আমি তুলবোই। – বলেন নুরুল্লাহ নুরী।

জানতে চাইলে নগর উন্নয়ন কমিটির মেম্বার অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণে অনুমোদনের জন্য যখন তারা আবেদন করে, তখন আমরা সাইটটি পরিদর্শন করি। তবে সেই সাইটটি পাহাড়ি অবস্থায় থাকায় আমরা অনুমতি দিইনি। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন নগর উন্নয়ন কমিটি দেয় না, ভবিষ্যতেও দিবে না।’

তিনি বলেন, ‘পরিবেশ আইনে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়টিকে পূর্বাবস্থায় ফেরত আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যারা পাহাড় কেটেছে তারা কি আসলে পাহাড়কে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারবে? কারণ নদী পুকুর খনন বা ভরাট করলে সেগুলো পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, কিন্তু পাহাড় কাটলে তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না।

অ্যাডভোকেট রানু বলেন, আমরা চাই এমন একটা আইন হোক যেখানে উল্লেখ থাকবে, পাহাড়কাটা স্থানে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। পাহাড় পাহাড়ের জায়গায় থাকবে। শুধু জরিমানার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ আইনের সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। পাহাড়কে যারা রক্তাক্ত করে শুইয়ে দিচ্ছে, তাদেরকেও জরিমানার পাশাপাশি মামলা, প্রয়োজনে মৃত্যুদ-ে দ-িত করা উচিত। পাহাড়কাটার মত আইনবহির্ভূত কার্যক্রমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই একমাত্র বিকল্প।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পাহাড়কাটার যে অভিযোগ উঠেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার পর কোনো পাহাড় কাটা হয়নি। এধরনের অভিযোগ যদি কেউ করে তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ করে বলবো যে, জরিমানার পর চুল পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়নি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিডিএ’র কাছে আমরা যে অনুমোদনটি চেয়েছিলাম সেই প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদেরকে শর্ত দিয়েছিল, সিডিএ’র অনুমোদন পেলেও আমরা পাহাড়ের কোনো ক্ষতি করতে পারবো না। সেই শর্ত মেনেই আমরা প্রকৌশলীদের সাথে আবাসন প্রকল্পের কাজ করার জন্য পরিকল্পনা করছি।’

কর্তনকৃত পাহাড় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে ছোট একটা অংশ আমরা কেটেছিলাম। তবে সেগুলো বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়নি, সেখানেই মাটিগুলো দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এরপরও আমরা বালি দিয়ে বেশকিছু জায়গা ভরাট করেছি। আর কাটা অংশ যাতে ভেঙে না পড়ে সেজন্যে আমরা ত্রিপল দিয়ে ওই অংশটি ঢেকে রেখেছি।’