শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

ডেটলাইন বহদ্দারহাট : পুলিশ যখন সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রক!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪, ২০২১, ৪:৫৬ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : সন্ধ্যা হলেই চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট মোড় সংলগ্ন রাস্তাগুলোর ফুটপাত ধরে হাঁটার জো থাকে না। ফুটপাত তো বটেই, সড়কের কিছু অংশ দখল করে বসানো হয় হকার। বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে চাঁদা। এক টাকা বা দুই টাকা নয়, প্রতিদিন তোলা হচ্ছে লাখ টাকার বেশি।

অভিযোগ আছে, স্থানীয় মাস্তান ছাড়াও চান্দগাঁও থানা পুলিশের পকেট ভারি হচ্ছে এই টাকায়। চাঁদা দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাবার কথা স্বীকারও করেছেন একাধিক হকার। বহদ্দারহাট মোড় ঘিরে অবৈধ যানবাহন, পরিবহন স্ট্যান্ড, ভাসমান দোকান, মাদক ও জুয়ার স্পট ও পণ্যবাহী যানবাহন থেকে পুলিশের নামে চাঁদা তোলা হয়।

ঘুরেফিরে এ চাঁদাবাজির নেপথ্যে যার নাম উঠে আসছে তিনি হলেন বহদ্দারহাট পুলিশ বক্সের ইনচার্জ সাব ইন্সপেক্টর রূপক কান্তি চৌধুরী৷ তার হয়ে হকারদের থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ আছে পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ইমন বড়ুয়ার বাবা রঞ্জিত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে। বহদ্দারহাট মোড় ঘিরে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে তিনি ব্যবহার করছেন স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও বিভিন্ন কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারী চক্রকে। সরকারি জায়গা, ফুটপাত, এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থান দখলে নিয়েও চাঁদাবাজি চালায় গ্রুপগুলো।

অনুসন্ধান বলছে, বহদ্দারহাট মোড় ও আশপাশের এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অটো টেম্পো, ইজিবাইক টমটম ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড এবং অন্তত চার শতাধিক ভাসমান হকার। এসব স্ট্যান্ড ও হকার থেকে প্রতিদিন আদায় হয় ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। বহদ্দারহাট পুলিশবক্স ও চান্দগাঁও থানার নামে এই চাঁদা তোলা হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, বহদ্দারহাট মোড় ঘিরে প্রতিদিন অন্তত চার শতাধিক ভাসমান দোকান বসে। শ্রেণিভেদে প্রতিদিন ৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা নির্ধারিত চাঁদার বিনিময়ে দোকানিদের বসানো হয়।

অভিযোগ, এসআই রুপক কান্তির প্রশ্র‍য়ে কিশোর গ্যাং দিয়ে ফ্রুট সোহেল বহদ্দারহাট এলাকার অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকারদলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দেন তিনি। অথচ কয়েক বছর আগেও হক মার্কেটের সামনে ফল বিক্রি করতেন সোহেল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বহদ্দারহাট ঘিরে সক্রিয় সন্ত্রাসীদের মধ্যে আছে- অপরাধী ছিনতাই চক্রের দলনেতা হামকা রাজুর ভাই কসাইপাড়ার ধামা জুয়েল, শাহাদাত হোসেন ওরফে ল্যাংড়া রিফাত, ইমন বড়ুয়া, হৃদয় বড়ুয়া, আরমান হোসেন, ফ্রুট জসিম, কামরুল হাসান, রুবেল, রনি সরকার, নেওয়াজ শরীফ ওরফে কিরিচ নেওয়াজ, খাঁজা রোডের শাখাওয়াত ওরফে লম্বা অভি।

জানা গেছে, ফরিদারপাড়া মাজার গলি ও বহদ্দারহাট বাসটার্মিনালে রয়েছে দুটি বড় মাদকস্পট। এসব থেকে প্রতিমাসে ২-৩ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। ফরিদার পাড়া মাজার গলির মাদকস্পট নিয়ন্ত্রণ করেন কালাম ও মহিউদ্দিন। বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের মাদকস্পট নিয়ন্ত্রণ করেন সুমন চাকমা।

সূত্র জানায়, রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত জনৈক শোয়েব মিথুন, ছিনতাইকারী হামকা রাজু গ্রুপের কালা সেলিমসহ বেশ কয়েকজন পুলিশের নামে টাকা তোলেন। 

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে চান্দগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ কোনো যানবাহন, বাসস্ট্যান্ড, অবৈধ দোকান বা মাদক স্পট থেকে চাঁদা নেয় না। চাঁদাবাজির বিষয়ে আমাদের একদম জিরো টলারেন্স নীতি। এসআই রূপক কান্তি চৌধুরীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেব।

এক প্রশ্নের উত্তরে ওসি মোস্তাফিজুর রহমান মঙ্গলবার চান্দগাঁও থানা কার্যালয়ে একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমাদের থানায় তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীরা জামিনে মুক্ত হয়ে ফের অপরাধে জড়ালে কী করার আছে। কেউ পুলিশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে এসআই রূপক কান্তি চৌধুরীর নাম বারবার উঠে আসলেও তিনি বহাল তবিয়তে রয়ে যান বছরের পর বছর। বহদ্দারহাট মোড়কেন্দ্রিক তিনি গড়ে তুলেছেন চাঁদাবাজির এক সাম্রাজ্য। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সাথেও তার আছে বিশেষ সখ্যতা। চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে তিনি ব্যবহার করেন সন্ত্রাসীদের।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে এসআই রূপক কান্তি চৌধুরীর সোর্স হিসেবে কাজ করেন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী ও সবুর হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইমন বড়ুয়ার বাবা রঞ্জিত বড়ুয়া। এই পুলিশ কর্মকর্তার হয়ে ফুটপাতের দোকান, গাড়ি স্ট্যান্ড, মাদক কারবারি, জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন খাত থেকে পুলিশের নামে মাসোহারা আদায় করার দায়িত্বে আছেন কথিত সোর্স রঞ্জিত বড়ুয়া।

অভিযোগ আছে, নানা অজুহাতে নিরীহ লোকজনকে বহদ্দারহাট পুলিশ বক্সে ধরে এনে হয়রানি এবং জোরপূর্বক টাকা আদায় করেন এসআই রূপক কান্তি। তার প্রশ্রয়ে দালাল সোর্সসহ অপরাধীদের আঁখড়ায় পরিণত হয়েছে বহদ্দারহাট পুলিশবক্স।

এরআগে এসআই রূপক কান্তি ও থানা পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ঘুম ভাঙছে না পুলিশ কর্তৃপক্ষের। কাউকে তোয়াক্কা করেন না এসআই রূপক।

অভিযোগ আছে, সড়ক কিংবা ফুটপাতে ভাসমান যে কোনও দোকান বসাতে প্রথমে তাকে (এসআই রূপক) দিতে হয় এককালীন টাকা। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী মাসিক চাঁদা নির্ধারিত হয় ২০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত। থানা পুলিশ এবং স্থানীয় মাস্তানের পক্ষে নিয়মিত চাঁদা তুলেন বারইপাড়ার মহিউদ্দিন ও রুবেল।

পুলিশ সূত্র জানায়, ল্যাংড়া রিফাতের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানার মামলা নম্বর- ১(৩)১৯, পাঁচলাইশ থানার-৭৭৬/১৯, চকবাজার থানার-৫(০৮)১৬ মামলাসহ অন্তত একডজন মামলা রয়েছে।

এসআই রূপক কান্তি চৌধুরীর ‘সোর্স’ রঞ্জিত বড়ুয়ার ছেলে চাঞ্চল্যকর সবুর হত্যা মামলার প্রধান আসামী ইমন বড়ুয়ার বিরুদ্ধে আছে অস্ত্র, ছিনতাই ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৬টি মামলা। শাহী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাহাতাব কবিরের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় আছে একাধিক মামলা। সম্প্রতি ছিনতাই মামলা ১৩(২)২১ গ্রেফতার হয় মাহাতাব। জামিনে এসে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি।

জানা গেছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বহদ্দারহাটে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন এক যুবক। এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় অভিযোগ দিলে ওসি মোস্তাফিজুরের নির্দেশে জুয়েল ওরফে ধামা জুয়েল নামে এক তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে আটক করে বহদ্দারহাট পুলিশ বক্সের ইনচার্জ এসআই রূপক। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর এসআই রুপক তাকে ছেড়ে দেন।

অভিযোগ রয়েছে,আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বহদ্দারহাট ও আশপাশের এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী রাজু বাদশা ওরফে হামকা রাজু ও ফ্রুট সোহেলের গ্রুপ। ছিনতাই থেকে চাঁদাবাজি, জমি দখল থেকে বাইক চুরি, মাদক ব্যবসা থেকে জুয়ার আসর। এসব অপকর্ম থেকে প্রাপ্ত মাসোহারা পৌঁছে যায় এসআই রূপকসহ চান্দগাঁও থানা পুলিশের কাছে।

কিছুদিন আগে দুই যুবকের মোটর সাইকেল ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে ফ্রুট সোহেল ও তার সহযোগীরা। কাঁচাবাজার থেকে হক মার্কেট পর্যন্ত ভাসমান দোকান বসিয়ে দৈনিক চাঁদা নেয় সোহেল। তার বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানার তিনটি মামলা হয় বিভিন্ন সময়।

গতবছর ৩ নভেম্বর র‍্যাবের হাতে অস্ত্রসহ আটক হয় ছিনতাই চক্রের দলনেতা হামকা রাজু। এখন তার হাল ধরেছে তারই ভাই ধামা জুয়েল। জুয়েলের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানার দ্রুত বিচার আইনে মামলা নম্বর- ৩৩(৪)১৭, পাঁচলাইশ থানার মামলা নম্বর- ১৭(২)১৮ বিচারাধীন।

বহদ্দারহাট মোড় ঘিরে ফুটপাতের হকার, পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি এবং পেশাদার ও দাগী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সথ্যতাসহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই রুপক কান্তি চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমার নামে কেউ ফুটপাতের হকার বা অন্যান্য খাত থেকে চাঁদা তুললে তাকে ধরে যেন পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। কেউ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। ঢালাওভাবে অনেকেই অনেক কথা বলতে পারেন। আমি আমার জায়গায় একদম ক্লিয়ার। রঞ্জিত বড়ুয়া নামে পেশাদার ছিনতাইকারীর বাবাকে আমি চিনি না। সন্ত্রাসীদের সাথে সখ্যতার প্রশ্নই উঠে না।’

এসআই রুপক কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘আমি এই পুলিশ বক্সের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি ৭-৮ মাস আগে। আমি আসার আগে বহদ্দারহাট মোড়ে দিনে ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতো। এখন শূন্যের কোঠায়। প্রচণ্ড শীতে পুলিশ বক্সের ফ্লোরে রাত জেগে পাহারা দিয়েছি অপরাধীদের ধরতে। নির্ঘুম রাত কাটানোর কারণে সফলতাও পেয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ সব মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক।’