শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

বিস্ফোরক পরিদপ্তর দুর্বল, সুযোগ নিচ্ছে কারা?

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ৭, ২০২১, ৩:৪৫ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : বিস্ফোরক ও পেট্রোলিয়াম আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সংকুচিত গ্যাস, বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনাপ্রবণ বিপজ্জনক পদার্থ উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ দেখভাল করার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। এছাড়া দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, মানুষের আহত হওয়া ও জীবনহানি প্রতিরোধ এবং ধ্বংসের হাত থেকে সম্পদ রক্ষার দায়িত্বও এ প্রতিষ্ঠানটির। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে বর্তমানে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের জনবল আছে মাত্র ৫০ জন! আর পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার দায়িত্বে রয়েছেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী!

শুধু জনবল সংকট নয়, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের নিজস্ব অফিস ভবন এবং আধুনিক সরঞ্জামাদি সম্বলিত পরীক্ষাগার নেই। আইটি সংক্রান্ত লোকবলও নেই। বিপজ্জনক পদার্থ থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য নিজস্ব কোন যানবাহন নেই। বিস্ফোরকের অপব্যবহার সম্পর্কে আধুনিক জ্ঞান লাভ ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বৈদেশিক প্রশিক্ষণেরও তেমন সুযোগ পান না কর্মকর্তারা। এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে বছরের পর বছর দুর্বল করে রাখার কারণ অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-টিআইবি, চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ এবং অসৎ ব্যবসায়ীদের ত্রিমুখী আঁতাতের কারণে বিস্ফোরক পরিদপ্তর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘খোঁড়া’ হয়ে আছে। তাদের জনবল কম, তারপরও যা আছে তারাও ঠিকমতো পরিদর্শন, তদারকি করেন না, লাইসেন্স বাণিজ্য করেন। দাহ্য পদার্থের ব্যবসার লাইসেন্স ও নবায়নের জন্য দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ পর্যন্ত তারা ঘুষ আদায় করে বলে গতবছর টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবাসিক ভবন বা বহুতল ভবনে বিশেষ করে নিচতলায় রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম ভাড়া দেয়া অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ বা অননুমোদিত গুদাম চিহ্নিত করে তেমন একটা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। কারণ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরাও কারখানা ও গুদামের মালিক বা এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।’

অভিযোগ আছে, এসব রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা থেকে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় করে বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা। ফলে রাসায়নিকের গুদামগুলো তদারকিহীনভাবে টিকে আছে, বিস্ফোরকদ্রব্য অনিরাপদ উপায়ে কেনাবেচা হচ্ছে। লাইসেন্স ছাড়াই যত্রতত্র বিক্রি হচ্ছে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে জঙ্গি-অপরাধীরা সহজে বিস্ফোরক দ্রব্য সংগ্রহ করতে পারছে, বিভিন্ন সময় জঙ্গি আস্তানা থেকে বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার হয়েছে, তেমনি একের পর এক অগ্নিদুর্ঘটনা, বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২০ সালে গ্যাস লাইন ও গ্যাস সিলিন্ডারে ৯৫৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে; এতে ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮২ হাজার ২৯০ টাকা। একই বছরে বয়লারে ২০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে; ক্ষতি হয়েছে ৫৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এছাড়া উক্ত সময়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে ১২টি ও বাজি পোড়ানোর কারণে ৫০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে গ্যাস সরবরাহ লাইন, সিলিন্ডার ও বয়লার বিস্ফোরণে ১৮ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন ১১২ জন। অর্থ্যাৎ গত বছরের বেশিরভাগ সময় করোনার কারণে দেশজুড়ে স্থবিরতা থাকলেও ছোট-বড় মিলিয়ে এক হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের উৎস ওই দাহ্য রাসায়নিক, গ্যাস। তবে অভিযোগ আছে, এসব দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি যথাযথভাবে পরিমাপ করা হয় না। কারণ এগুলোর মজুত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণে পারতপক্ষে কোনো স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয় না।

রাজধানীর চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশে উল্লেখ করা হয়, গুদামের সামনের রাস্তা ৬-৯ মিটার প্রশস্ত, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে গুদামের দূরত্ব হবে পাঁচ মিটার, আবাসিক এলাকা ও ভবন বা বহুতল ভবনে রাসায়নিক মজুতের লাইসেন্স দেয়া যাবে না। অথচ এসব সুপারিশের কিছুই মানা হচ্ছে না। পুরান ঢাকার মতোই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আবাসিক ভবনেই চালিয়ে যাচ্ছেন রাসায়নিকের ব্যবসা। চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা নজুমিয়া লেন এক নম্বর গলি, বান্ডেল রোড ও জেল রোড এলাকায় বেশকিছু রাসায়নিক গুদাম দেখতে পাওয়া যায়। পাথরঘাটা ৪ নম্বর বান্ডেল রোডের হক মার্কেটে রাসায়নিকের একাধিক দোকান ও গুদাম রয়েছে। এসব দোকান করা হয়েছে আবাসিক ভবনের নিচতলায়। দোকানগুলোর ওপরের চারতলায় মানুষ বাস করে। ৩ নম্বর বান্ডেল রোডের আব্দুল লতিফ মার্কেটেও আছে রাসায়নিকের দোকান। তার ওপরেও রয়েছে চারতলার আবাসিক ভবন। ৮ নম্বর জেল রোডের আল-মাদানী মার্কেটে রয়েছে কেমিকেলের একাধিক দোকান। এসব রাসায়নিক দোকান ও গুদামের ওপরও রয়েছে চারতলার আবাসিক ভবন।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, খুচরা দোকানে বিক্রির জন্য সর্বোচ্চ ১০টি গ্যাস সিলিন্ডার রাখা যায়। ১০টির বেশি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করতে হলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। এছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি ও মজুত স্থানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও। অথচ চট্টগ্রাম নগরসহ বিভিন্ন স্থানে মুদি দোকানে পর্যন্ত লাইসেন্স ছাড়াই এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। নগরের বাদুরতলা জঙ্গি শাহ মাজার গেইট এলাকাসহ জনবহুল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার গুদামজাত করা হয়েছে। অধিকাংশ দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। কিছু দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র টাঙানো হলেও তা অকেজো ও মেয়াদোত্তীর্ণ।

জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার দায়িত্ব পালন করছি আমিসহ মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখানে আরও পাঁচটি পদ খালি আছে। এত কম জনবল নিয়ে আমরা যতটুকু পারছি তদারকি করছি।’

এদিকে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের মোট জনবল কাঠামো ৬৯ থেকে ১০৪ জনে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদিও নতুন সৃষ্ট পদগুলোতে এখনো নিয়োগ দেয়া হয়নি। এছাড়া পুরনো জনবলের মধ্যে কেউ কেউ অবসরে গেছেন, চাকরি ছেড়েছেন। বিস্ফোরক পরিদর্শক মনিরা ইয়াসমিন একুশে পত্রিকাকে জানান, বর্তমানে ৫৪টি পদ খালি আছে বিস্ফোরক অধিদপ্তরে; এর মধ্যে কর্মকর্তাদের পদ ১৩টি।

জনবল সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের কাজের পরিধি বাড়লেও জনবল একেবারেই কম, এটা সত্য। এই জনবল দিয়েই গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমরা ৭ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করেছি। কিছুদিন আগে ছয়জন কর্মচারী নিয়োগের জন্য আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। এ কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। তখন কিছুটা হলেও সেবা বাড়ানো যাবে।’ বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে প্রায় ৫ বছর আগে বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে শক্তিশালী ও আধুনিকায়নের জন্য ১ হাজার ১২০ জনবল নিয়োগের বিশিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তাব বিভিন্ন দপ্তর হয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হয়। এ পরিকল্পনার ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সব বিভাগীয় শহরগুলোতে আরও জনবল নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি অফিস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া ৫৩ জেলায় আলাদা অফিস নিয়ে জনবল নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলার পর গত ২৭ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভায় উপসচিব (প্রশাসন-৩) মোর্শেদা ফেরদৌস জানান, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের জনবল কাঠামো তৈরির বিষয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির সভার প্রেক্ষিতে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কারিগরি কমিটি বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে শক্তিশালী ও বৃহৎ পরিসরে নেয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। এ কারণে জনবল কাঠামো তৈরির কার্যক্রমটি আপাতত বন্ধ রয়েছে।

তখন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান জানান, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় ও কেমিক্যাল সংক্রান্ত লাইসেন্স যে সকল প্রতিষ্ঠান দেয় তাদেরকে একটি ছাতার নিচে এনে যাতে সেবা দেয়া যায় সে লক্ষ্যে মন্ত্রিসভা কমিটি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কমিটিতে প্রস্তাব করা হয়। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কাজের পরিধি বর্তমানে ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাই কারিগরি কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর এ বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবসার লাইসেন্স প্রদান, পরিবহন, বিপণন, পরিদর্শনসহ অন্যান্য কার্যক্রম একটি দপ্তরের অধীনে আনার পরিকল্পনা চলছে। ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’র মতো একটি নতুন ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করার বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নে কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সেখানে অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে সেটা আমার জানা নেই।’ তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অফিস ভবন নির্মাণের জন্য ঢাকার আগাঁরগাতে ১০ কাঠা জমি নেয়া হয়েছে। সেখানে ভবন নির্মাণের চেষ্টা চলছে। এছাড়া আধুনিক সরঞ্জামাদিসহ পরীক্ষাগার স্থাপনের জন্যও চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য যানবাহন সংগ্রহেরও চেষ্টা করছি।’

এসব বিষয়ে জানতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের গঠন করা কারিগরি কমিটির সদস্য এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অপারেশন) মো. আবুল মনসুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে শক্তিশালী করার কাজ কতটুকু এগিয়েছে জানতে চাইলে আবুল মনসুর বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখনই কিছু বলতে চাচ্ছি না। পরে কথা হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দাহ্য রাসায়নিকের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি সরকারের একটি অমার্জনীয় ব্যর্থতা। রাজধানীর নিমতলী ও চুড়িহাট্টার দুটি রাসায়নিক বিপর্যয়ে প্রায় দুইশ’ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে না পারলে আগামীতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।’