শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ৭, ২০২১, ৭:৫৩ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : ১৮৮৪। বৌঠান কাদম্বরী, অভিমানে আফিম খেয়ে মারা গেলেন ঠাকুরবাড়ির এক বিমর্ষ, করুণ ঘরে। এত কাছের, এত হাসিখেলার সাথী এক নিমেষে স্বপ্নের মতো মিলিয়েই গেলেন না শুধু, রবীন্দ্রনাথের জন্য রেখে গেলেন নিকষ কালো এক-জীবন অন্ধকার। এই অন্ধকারই তার পর যেন তৈরি করে দিল সর্বকালের সেরা এক কবিকে। আড়ালে একটা চারাগাছকে রাখলে, যেমন সে আলোর খোঁজে মাথা তোলে, কাদম্বরীর না-থাকার অন্ধকারের বেড়া ঠেলে রবীন্দ্রনাথ তেমনই যেন খুঁজে বেড়ালেন এক আলোর পথ।

লিখলেন, ‘…সেই অন্ধকারকে অতিক্রম করিবার পথ অন্ধকারের মধ্যে যখন দেখা যায় না তখন তাহার মতো দুঃখ আর কী আছে!’ জীবনের মধ্যে থেকে মৃত্যুকে আর দুঃখকে সহজে বরণ করার কথা তিনি বারবার বলেছেন। উপনিষদ থেকে তাঁর ভাবানুবাদ করা এই শ্লোক যেন তাঁর নিজের মৃত্যু চিন্তারই প্রতিধ্বনি,‘শোনো বিশ্বজন, শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ/ দিব্যধামবাসী। আমি জেনেছি তাঁহারে মহান্ত পুরুষ যিনি/ আঁধারের পারে জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে তাঁর পানে চাহি/মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পার, অন্য পথ নাহি।’ আবার, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’ (পূজা-২৪৮) স্থানটির আলোকে সহজে অনুমান করা যায় রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তায় নান্দনিকতার সফল উপস্থিতি আছে।

আসলে জীবনের এতোসব আয়োজনের মধ্যে মৃত্যুই সত্য। সেটিকে রুধিতে পারে এমন সাধ্য কার? করোনার এই সময়টাতে এসে কতো কতো মানুষকে আমরা হারালাম। হারিয়ে ফেললাম যেমন চেনা পরিচিত কাউকে তেমনি স্বনামে খ্যাত অনেকে চলে গেলেন করোনার করাল গ্রাসে।

পবিত্র কোরানের সেই বাণীটি মাঝে মাঝে কানে বাজে। ‘প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদের ভালো ও খারাপ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করি। আর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে।’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৫)। ৩ মার্চ মারা গেলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য হোসেন তৌফিক ইমাম, যিনি মূলত এইচ টি ইমাম নামে পরিচিত। তাকে সবাই জানে আওয়ামী লীগের দুঃসময় ও সুসময়ের থিংকট্যাংক। ঠাণ্ডা মাথা, অল্প কথা, অধিক কাজ ও সময়ের কাজটি সময়ে করে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসাতে তার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু এতো এতো ক্ষমতা প্রতিপত্তি নিমিষেই মৃত্যু এসে ঢেকে গেলো। তাই মাঝে মাঝে ভাবী কেন এই হিংসা দ্বেষ, কেন এই ছদ্মবেশ। কেন এই মান-অভিমান। আমরা রঙিন মানুষ। দম ফুরালেইতো টুশ! কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় কবি জীবনানন্দ দাশ আহত হন। তারিখটা ছিল ১৪ অক্টোবর, ১৯৫৪ সাল। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তাঁর শরীর দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। ভেঙে গিয়েছিল কণ্ঠ, ঊরু ও পাঁজরের হাড়।

অনেক জীবনানন্দ গবেষক মনে করেন জাগতিক নিঃসহায়তা কবিকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল এবং তাঁর বাঁচার স্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা যেন কবির মাথায় দানা বেঁধেছিল। তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন, যে কথা তাঁর কিছু লেখাতেও পাওয়া গেছে। চিকিৎসক ও নার্সদের সব প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ প-িত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। গত ১০০ বছরে ট্রাম দুর্ঘটনায় কলকাতায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র একটি। তিনি আর কেউ নন, কবি জীবনানন্দ দাশ। মৃত্যুচিন্তা জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। এমনকি, ‘বনলতা সেন’-এর মতো রোমান্টিক প্রেমের কবিতায়ও মৃত্যুচিন্তা রোমান্টিকতাকে এতটাই ছাড়িয়ে গেছে যে শেষ বিবেচনায় একে মৃত্যুবিষয়ক কবিতা বলেই মেনে নিতে হয় যখন বলা হয়: ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন/সন্ধ্যা আসে, ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পা-ুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;/সব পাখি ঘরে ফেরে – সব নদী – ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’। বৃষ্টিকে ভালোবাসতেন আমাদের দেশের জনপ্রিয় লেখক হূমায়ুন আহমেদ। অবশেষে বৃষ্টিসঙ্গী করে যাত্রা করলেন হূমায়ুন আহমেদ।

‘আমি কী স্বপ্নে দেখেছি সেটা বলি, বিশাল একটা হাওর। হাওরের মধ্যে পানি, পানি আর পানি। কলাগাছের মতো একটা জিনিস ধরে আমি ভাসছি। পানি অল্প ঠান্ডা। কলাগাছের মতো জিনিসটা মনে হচ্ছে একটা যান। সেটা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে মনে হলো, মাই গড! এতো আনন্দের পৃথিবী ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি! সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা বন্ধ হলো। আবার ফিরে এলাম। আমার এই বাড়ি ঘর সব আগের মতো। আমি দেখলাম। তখন আমার মনে হলো, আর কী? এবার যাই। আমার যাত্রা আবার শুরু হলো। অনেক দূর গিয়ে আবার মনে হলো, ও মাই গড! সব ফেলে আমি কোথায় যাচ্ছি! আবার ফিরে এলাম। তারপর আবার মনে হলো, এই তো সব। আর কী? এরপর যানটা একটা অকল্পনীয় গতিতে ছুটতে শুরু করল। কোন দিকে যাচ্ছি, কিছুই বুঝতে পারছি না। দূরে ছোট্ট একটা আলো।

হুমায়ূন আহমেদের এই বইটি প্রকাশ হয় ২০১২ এর একুশে বইমেলায়। শুরুটা এমন, ‘আমি মারা গেছি, নাকি মারা যাচ্ছি। এখনো বুঝতে পারছি না। মনে হয়, মারা গেছি। মৃত অবস্থা থেকে অলৌকিকভাবে যারা বেঁচে উঠে, তাদের মৃত্যু অভিজ্ঞতা এর নাম, এনডিই। বাংলায় মৃত্যু অভিজ্ঞতা। তারা সবাই দেখে, লম্বা এক সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। অন্তহীন যাত্রার শেষের দিকে খানিকটা আলো দেখা যায়। আলো আসে সুড়ঙ্গের শেষ মাথা থেকে। সেই আলোর চুম্বকের মতো আকর্ষণী ক্ষমতা। কঠিন আকর্ষণে অন্ধের মতো আলোর দিকে এগিয়ে যেতে হয়।’

যারা মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছে তাদের একেক জনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তবে আমার পর সমাচার এই যে উপন্যাসের নায়িকার মৃত্যুর বিষয়টি আমার প্রিয় এক মানুষের সাথে মিল আছে। মৃত্যু যাতনা বা অন্তিম মুহূর্ত সবার জন্য বেদনার। তবুও মনে হয় রবি ঠাকুরের মতো এতোটা গভীরভাবে কে-ই বলতে পারে।

‘হে বন্ধু, বিদায়।
মোর লাগি করিয়ো না শোক—
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যের করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।’

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক