মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

পর্যটকদের বিনোদন-বিড়ম্বনায় ঝুঁকিতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার সূর্যমুখী

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, মার্চ ৯, ২০২১, ৩:০৯ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : বাংলাদেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সূর্যমুখী চাষ। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে চাষীদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি সৌন্দর্যপ্রেমীদেরও হাতছানি দিয়ে ডাকছে সবুজের বুকে হলুদ ছড়ানো মাঠ। সূর্যমুখীর মাঠে প্রতিদিনই ভিড় করছেন পর্যটকরা। কিন্তু তাদের এই বিনোদন আর্থিক ক্ষতি ডেকে আনছে চাষীদের। কেউ ছবি তুলতে ফুল ছিঁড়ে, কেউ মাঠে গিয়ে চারা মাড়িয়ে চাষীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছেন। পর্যটকদের এমন বিনোদন বিড়ম্বনায় এখন ঝুঁকির মুখে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা!

সরেজমিনে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার পশ্চিম দেওয়ানপুর গিয়ে দেখা যায়, সূর্যমুখী ফুলের বাগানের চারপাশে জালের ঘেরাও দিয়ে রাখা হয়েছে। বাগানের বেশিরভাগ অংশেই ফুলের গাছ ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয়রা জানান, দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়ের কারণে ফুলের বাগানের ক্ষতি হচ্ছে বলেই এই জালের ঘেরাও দেওয়া হয়েছে। সেখানে উপজেলা আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এলাকায় সড়কের পাশে এক একরের বেশি জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন সফর আলী। চাষের শুরুতে আবহাওয়া এবং পোকামাকড় নিয়ে শঙ্কায় থাকলেও এই চাষির সব ভয় এখন দর্শনার্থীদের নিয়ে!

শুরুর দিকে এই জমি থেকে তিনি ৪০ হাজার টাকা লাভ পাবেন বলে আশা করে থাকলেও এখন চেষ্টা করছেন লোকসান কমানোর। তার মতে, প্রায় আধা একর জমির ফুলই মাড়িয়ে নষ্ট করে ফেলেছেন দর্শনার্থীরা। শুধু তাই নয়, জালের ঘেরাও দেওয়া সত্ত্বেও তা ছিঁড়ে, টপকে বাগানের ভেতর প্রবেশ করছে সূর্যমুখীপিয়াসিরা।

বেড়াতে আসা সাজনিম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, আমি বন্ধুদের কাছে এই সূর্যমুখী ফুলের বাগানের কথা অনেক শুনেছি। সবাই বাগানটিতে আসছিল, ভাবলাম আমিও যাই। আমরা ১৫ জন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম শহর থেকে এখানে বেড়াতে এসেছি। ছবি তুলেছি, অনেক মজাও করেছি। আমার অনেক বন্ধুরা আসতে পারেনি তাদের জন্য কিছু ফুলও নিয়ে যাচ্ছি।’
তবে কারও কারও এমন আচরণে বিরক্ত অনেক পর্যটকও। আরিয়ানা তাসনীম নামের এক পর্যটক বলেন, ‘সূর্যমুখী ফুল দেখতে এসেছি। সৌন্দর্য যতটা মুগ্ধ করছে ততটাই বিরক্ত করছে কা-জ্ঞানহীন মানুষেরা। ফুল মাড়িয়ে, ছিড়ে একাকার করেও কারো কারো শান্তি হচ্ছে না। বাসায়ও নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। এসব কর্মকা- আমাদের রুচিবোধ যে কোন পর্যায় ঠেকেছে তারই বহিঃপ্রকাশ।’

পর্যটকদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ সূর্যমুখী চাষীরা। আহমদ মুন্সী নামের এক চাষী বলেন, ‘আমি চাষ করেছিলাম কিছু লাভের আশায়। কিন্তু আমার বাগানটা পা দিয়ে মাড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে লোকজন। ১৮ হাজার ঋণ নিয়ে বীজ, সার, কীটনাশক কিনেছি। সেই টাকাও আমার এখন মনে হয় উঠবে না। শুধু আমি নই, অনেক চাষিরই আমার মত অবস্থা। দর্শনার্থীরাই আমাদের কাল হয়ে দাড়ালো।’

তবে এতো কিছুর পরও সূর্যমুখীর হলুদ আভায় ছেয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ মাঠের নজরকাড়া সৌন্দর্যে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছে শত শত মানুষ। তারা ছবি তুলছেন, মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু এটা করতে গিয়ে তারা ক্ষতি করে বসছেন চাষীদের। তাদের কেউ কেউ ছবি তুলতে গিয়ে ছিঁড়ে ফেলছেন সূর্যমুখী তেলের মূল উপাদান সেই ফুল। কেউ বেপরোয়া হেঁটে নষ্ট করছেন চারা। জমিতে পড়ে থাকা অর্ধভাঙা চারা এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ফুলও সাক্ষি দেয় এমন বেপরোয়া বিনোদনের।

এদিকে, দর্শনার্থীদের একটি বড় অংশ সূর্যমুখী ফুলের বাগানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপলোড দেওয়ার জন্য। আবার কেউ বানাচ্ছেন টিকটক ভিডিও। অতি উৎসাহী কেউ কেউ ফুল ছিড়ে হাতে নিয়ে, মাথায় পড়েও ছবি তুলছেন। এদিকে দর্শনার্থীদের সূর্যমুখী ফুল গাছ নষ্ট করা, ফুলছেঁড়ায় বিরক্ত এক কৃষকের ক্ষোভ প্রকাশের একটি ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে। ভিডিও ক্লিপে সেই কৃষককে বলতে শোনা যায়, ‘আমার বাগান থেকে তোরা চলে যা। আমি কিন্তু এখন কী করবো জানি না।’ এরপরই ফুল ছিড়ে ফেলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে চিৎকার করে বকাবকি করতে দেখা যায়।

এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে উঠে সমালোচনার ঝড়। ভিডিওটিতে লাইক কমেন্টের বন্যার পাশাপাশি অনেকে এসবের প্রতিবাদও করছেন, স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। ভিডিওটি পারভেজ ইসলাম জুয়েল নামে একজন শেয়ার করে লিখেন, ‘কথাগুলো গালির মতো শুনালেও আসলে এগুলা গালি নয়! এক স্বপ্নবাজ কৃষকের চোখের সামনে স্বপ্ন ধূসর হয়ে যাওয়ার বোবা কান্নার স্বর গালি হয়ে ঝরছে। আপনাদের কি মনে হয়, অনেকের বাগানে আসবেন, গাছ মাড়িয়ে নষ্ট করবেন, ফুল ছিড়বেন আর বাগানের চাষি আপনাদের সাথে প্রেমালাপ করবেন?’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে মঈনুদ্দিন মাসুম নামে একজন লিখেছেন, ‘যা আমাদের কাছে আনন্দের খোরাক, চাষির কাছে তা উপার্জনের সংস্থান। যা আমাদের কাছে একটি ফুলের বাগান, কারো কাছে সেটি দুইবেলা খাবারের উৎস। ফুলের বাগান দেখতে গিয়ে যেন, রক্ত পানি করা মানুষগুলোর স্বপ্নকে বেড়ে উঠতে বাধাগ্রস্থ না করে ফেলি।’
সাঈদ খোকন নামে এক যুবক নিজের ফেইসবুক প্রোফাইলে লিখেছেন, সূর্যমুখী বাগানের ছবি/টিকটক ভিডিও তো অনেক করছেন। ফুলগাছ মাড়িয়ে, ফুল ছিড়ে কি আপনি খুবই আনন্দ পাচ্ছেন? আপনার ফটোসেশান যেন কৃষকের কষ্টের লাগানো ফসলের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

জয়িত্রী জয়া নিজের ফেইসবুকে লিখেছেন, কৃষকদের ঘামঝরানো পরিশ্রমের ফসলগুলোই আমার-আপনার মতন মানুষেরা হাত দিয়ে ধরে ছিড়ে, লাফ-ঝাপ করে নষ্ট করে দিয়ে আসছি। যে ফুলগুলো হাওয়ায় নেচে ওঠার সেই ফুলগুলোকে আপনাদের কারণে কর্তৃপক্ষকে চারপাশে জাল দিয়ে ঘেরাও করে দিতে হচ্ছে। তাও শান্তি নেই! জানার জন্য, দেখার জন্য অবশ্যই যাবেন। তবে সকলের মাথায় রাখা উচিত অন্তত কৃষকের যেন ক্ষতি না হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে বছরে তিন-চার হাজার টন সূর্যমুখী তেলবীজ উৎপন্ন হয়। ডিসেম্বরের শেষদিকে বীজ রোপণ করা হয়। ফুল ফোটার পর পরিপক্ক বীজ সংগ্রহ করা হয় মে মাসে। বপন থেকে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত ৯০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে বীজ সংগ্রহ করা হয়। প্রতি একর জমিতে সূর্যমুখী আবাদে বীজ প্রয়োজন হয় পাঁচ কেজি। এক বিঘা জমি চাষে কৃষকের খরচ হয় ৪-৫ হাজার টাকা। প্রতি শতকে ৪০-৪৫ কেজি বীজ পাওয়া যায়।

পুষ্টিবিদদের মতে, সূর্যমুখী তেলে মানবদেহের জন্য উপকারী ওমেগা ৬ ও ওমেগা ৯, অলিক অ্যাসিড, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট প্রোটিন ও পানি বিদ্যমান। এই তেল কোলেস্টেরলমুক্ত, ভিটামিন ‘ই’, ভিটামিন ‘কে’ ও মিনারেল সমৃদ্ধ। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও কিডনি রোগীর জন্যও সূর্যমুখীর তেল নিরাপদ।