শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

সব মনে রাখা হবে সব

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ১৫, ২০২১, ২:২৪ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : ‘রিস্ট ওয়াচের দিকে চেয়ে লাইলী চমকে ওঠলো। তারপর বইখাতা নিয়ে ইতিহাসের ক্লাস করার জন্য পা বাড়ালো। সে লাইব্রেরিতে বসে একটা নোট লিখছিল। তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এসে সিঁড়িতে উঠার সময় সেলিমের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার হাত থেকে বই খাতাগুলো নিচে ছড়িয়ে পড়লো। ইয়া আল্লাহ, একি হলো- বলে লাইলী কী করবে ঠিক করতে না পেরে সেলিমের দীর্ঘ বলিষ্ঠ স্বাস্থ্য ও পৌরুষদীপ্ত চেহারার দিকে লজ্জামিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সবকিছু ভুলে গেলো।

এতো নিঁখুত সুন্দরী মেয়ে এই প্রথম সেলিম দেখলো। তার মনে হলো, এ যেন ফুটন্ত গোলাপ।’

প্রিয়, বেশ অবাক হলে। এটা আবার কেমন ধরনের লেখা। কিছুটা টানটান উত্তেজনা, কিছুটা ধর্মমিশ্রিত রোমাঞ্চ আর কিছুটা বাংলা সিনেমার মতো গ্রাম্যতা। তুমি হয়তো চিনছো না, কিন্তু এটাই একসময় ছিল ‘হট কেক’। এটা ইসলামী আদলে লেখা রোমান্টিক উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’র শুরুর কয়েকটি লাইন। লেখক কাশেম বিন আবু বাকার। তো এই কাশেম বিন আবু বাকারকে নিয়ে হঠাৎ করেই বছর দু’য়েক আগে প্রতিবেদন প্রকাশ করে পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলো। ব্রিটেনের ডেইলি মিরর, বার্তা সংস্থা এএফপি, ভারতের টাইমস নাওসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মেইন স্ট্রিম পত্রিকাগুলো তাকে সেভাবে তুলে না আনলেও সাধারণ পাঠকরা তার বই একচেটিয়া কিনে থাকে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গেও তার বইয়ের ব্যাপক বাজার রয়েছে।’

এবার বসন্ত দিনে অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়নি। শুরু হওয়ার কথা মার্চের মাঝামাঝিতে। তবে এখন পর্যন্ত কারো তেমন উচ্ছ্বাস চোখে পড়ল না। আসলে সময়ের কাজ সময়ে না হলে যা হয় আর কী! কাশেম বিন আবু বাকারও এখন ঝিমিয়ে আছেন। বাংলাদেশে এমনই হয়। এখনতো ভাইরালের যুগ, কখন কে কোথায় কেন ভাইরাল হয়ে যায় ঠিক নেই। এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাই তার বই নিয়ে হয়তো তেমন মাতামাতি হবে না। শহুরে তরুণ-তরুণীরা তাকে ঠিকমতো চেনেই না। তিনি অবশ্য এই নিয়ে ভাবেনওনি কোনওদিন।

এখনো গ্রামের বোরখাপরা মেয়েরা বা টুপি পাঞ্জাবি পরা লাজুক লাজুক প্রেমিকটি তার বই উপহার হিসেবে দেয়-নেয়। বয়সের ভারে এখন তিনি অনেকটা বৃদ্ধ। পান-চুনে দাঁত তরমুজ বিচির মতো রঙ ধারণ করলেও মেয়েরা এখনো তার সাথে প্রেম করতে চায়, চিঠি লিখে। ফেসবুক, টুইটার ও হোয়াটস আপের যুগে জানি চিঠি কিছুটা অচল। এরপর চিঠির আবেদন যে অন্যরকম। তাতে লেগে থাকে প্রেরকের ছোঁয়া। আগে কোচিং ক্লাসের পছন্দের মেয়ের কাছে চিরকুট যেতো রসায়ন, পৃষ্ঠা নম্বর, ৫০। মেয়ে বই খুলে দেখত, ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…’।

জবাবি চিরকুটে লিখে পাঠাত পদার্থবিদ্যা, পৃষ্ঠা-৬১। ‘তুমি খুশি থাক আমার পানে চেয়ে চেয়ে…।’ আবার কখনো লেখা হতো, ‘তেঁতুল পাতা, তেঁতুল পাতা, তেঁতুল বড় টক-তোমার সাথে প্রেম করতে আমার বড় শখ।’ ‘বাড়ির সামনে নারিকেলের চিকন চিকন পাতা-তুমি ছাড়া কারে বোঝাই এই মনের ব্যথা।’ আরও সরল সময়ের কথা ভেবে ‘নিমন্ত্রণে’ রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘মনে পড়ে যেন এককালে লিখিতাম/চিঠিতে তোমারে ‘প্রেয়সী’ অথবা ‘প্রিয়ে’। একালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম- থাক্ সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে।’

আবার এলো সম্বোধনের সময়। প্রিয়তমাসু, সুচরিতাসু, নয়নের মণি, হৃদয়ের রাজা, দুষ্টু প্রজাপতি, আমার প্রাণভোমরা, মানস সুন্দরী ইত্যাদি আরও আরও…। ১৯৩৮ সালের দিকে রাধানাথ বিদ্যাবিনোদ ‘দাম্পত্যসুখচন্দ্রোদয়’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। তাতে দাম্পত্যসুখের নানা উপায়ের কথা বলা ছিল। নিয়মিত চিঠি লেখার পরামর্শও ছিল। প্রবাসী স্বামীকে চিঠি লিখে বেঁধে রাখার পরামর্শ। সরাসরি বউকে চিঠি লিখতে লজ্জা করলে কী করবেন? রাধানাথের পরামর্শ ছিল, ‘পতি যদি প্রবাসে থাকিবে, স্ত্রীকে পত্র দিবে। স্ত্রীকে যদি লজ্জাবশত পৃথকপত্র দিতে সংকোচ বোধ হয়, তবে গৃহকর্তার পত্রাভ্যন্তরেই স্ত্রীকে পত্র দিবে। …স্বামী সেই পত্রে সাংকেতিক বার্তা প্রয়োগ করিতে পারেন যাহা কেবল ওই দম্পতিই বুঝিবে।’

এমনই এক চিঠির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বাবাকে লেখা চিঠিতে ছেলে লিখল, ‘তোমার বউমাকে বলিও আমি মাঝে মাঝেই আরতির স্বপ্ন দেখি। ওর জন্য চাদর নিয়ে যাব।’ বাবা-মা ভাবলেন, ছেলের ধর্মে মতি হয়েছে বুঝি। আর বউমা রতি-লজ্জায় রাঙা হয়ে গেলেন। কারণ, তিনিই তো জানেন সংকেত। আরতির ‘আ’-টুকু বাদ দিতে হবে যে। আর ‘চাদর’ মানে আদর। চিঠি লেখার বিয়োগান্তক গল্পও আছে। ‘দুষ্টু প্রজাপতি’ সম্বোধন করে প্রতিদিন স্ত্রীকে চিঠি লিখতেন প্রবাসী স্বামী। স্ত্রীও ‘প্রাণভোমরা’-কে জবাব পাঠাতেন প্রতিদিন। হঠাৎ স্ত্রীর জবাব বন্ধ দেখে বাড়ি ফিরে মাথায় হাত স্বামীর। তারই চিঠি দিতে আসা ডাক-পিওনের সঙ্গে উড়ে গিয়েছে তার ‘দুষ্টু প্রজাপতি’। আধুনিক যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে চিঠির যুগ কমে যাওয়ায় অনেকটা অবসান হয়েছে সেই আশঙ্কার।

বিখ্যাতদের চিঠি নিয়ে অনেক মজার কা-তো রয়েছেই। সাহিত্যেও চিঠি নিয়ে অসাধারণ সব কাজ হয়েছে। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক বুদ্ধদের গুহ’র ‘সবিনয় নিবেদন’ এক অসাধারণ পত্রোপন্যাস। তার উপন্যাস ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ তে ছুটি ও সুকুমার বা মাধুকরী’তে পৃথু ও কুর্চির চিঠিও উল্লেখ করার মতো। বিখ্যাত রাজনৈতিকদের অনেক চিঠি ঐতিহাসিক মর্যাদা পেয়েছে। যামিনী রায়ের চিঠি বা ধুর্জটি প্রসাদের চিঠির রস অতুলনীয়। মহাদেব সাহার কবিতায় চিঠি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। একজন মানুষ চিঠিতে তার জীবনের সবচেয়ে গোপন অথচ বেদনার কথাগুলো অকপটে বলে দিতে পারে। তেমনি পারে অন্যের বেদনাকে জাগিয়ে দিতেও।’

চিঠির আবেদন নেই বলে খুদেবার্তার আবেদনও তেমন নেই। তবে এরপরও কোনো কোনো বার্তা যেন হুলের মতো বিঁধে অন্যায়কারীদের কাছে। তাই দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা হয়। মিম হয়, আবার অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে মিম হয়, ট্রল হয়। ভীতি আর ত্রাসে কখনো কখনো অনেকেই গলার স্বর নামিয়ে আনেন, আর সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘চুপ! চুপ! দেয়ালেরও কান আছে।’ কিন্তু তারুণ্য আর শিল্পীর স্পর্ধা এসবের থোরাই পরোয়া করে। সুন্দরের স্বপ্ন আর অন্যায়ের প্রতিবাদে তাই তারা ভারতের কবি আমির আজিজের ‘সব ইয়াদ রাখখা জায়েগা’ থেকে বলে ওঠে-

‘তোমরা জমিনে অন্যায় লিখে দাও
আসমানে বিপ্লব লেখা হবে
সব মনে রাখা হবে, সব’

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক