শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

আসল পুরুষ!

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ২১, ২০২১, ৫:১০ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : কবীর সুমনের গান শুনছিলাম। ইউটিউবে একটার পর একটা চলছিল। হাতে অন্য কাজ, লেখালেখি। মাঝে মাঝে চায়ের জল গরম হয়েছে কিনা দেখা। বইয়ের আলমারির পাশে তাকিয়ে থাকা বা কোনো বই নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে দেখা। হঠাৎ মনোযোগ বাড়লো। সুমন গাইছেন- ‘আমার শহরে এসেছে মেয়েটা হালচাল জানা নেই, বিশ্বাস করে বসলো কেন যে তিনটি পুরুষকেই?

পুরুষ কিংবা নপুংসকের রয়েছে গায়ের জোর, তিন থেকে ছয় পুরুষের জয় ধর্ষণে রাতভোর।’ দেশে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, খুন হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকছে লাশ, আবার মাঝে মাঝে উদ্ধার হচ্ছে পঁচে গলে যাওয়া মৃতদেহ। সাম্প্রদায়িক উসকানিতো আছেই। খুব বড় ঘটনা না হলে আমরা চেপে যাই। কারণ এতে আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করি। আবার দেখা যায় বড় বড় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। কারণ তাদের টাকা আছে, ক্ষমতার জোর আছে। এদের জামিন হয়। রাষ্ট্র সমর্থন জোগায়। পরিবার এদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে।

এ প্রসঙ্গে বছর তিনেক আগের একটা ঘটনা মনে পড়লো। বনানীর এক হোটেলে আলোচিত ধর্ষণ ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর পত্রিকার পাতা সয়লাব এ ধরনের ঘটনায়। তখন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার সাফাই গাইলেন পুত্রের পক্ষে। ‘তরুণ বয়সে ছেলে নাকি এমন আকাম-কুকাম করতেই পারে।’ একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, তিনিও মাঝে মাঝে এমন করেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সমস্ত মানুষদের নিয়ে একটি লেখা চোখে পড়লো। শেয়ার করলাম। মেয়েটি গোসল করছে বা পোশাক পাল্টাচ্ছে… অনেক ছেলে আছে তা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে। সে এতে ফিলিংস পেলেও এটি একটি বিকৃত যৌনআচরণ বা সেক্সুয়াল পারভার্শন। মেডিকেলের ভাষায় এটিকে ভয়েরিজম বলে। দুনিয়াতে এরকম নানারকম সেক্সুয়াল পারভার্শন রয়েছে। অনেকে আছে ভিড়ের মধ্যে মেয়ে দেখলেই শরীর ঘেঁষার চেষ্টা করে, বা কনুই দিয়ে বুক স্পর্শ করে। এটাকে বলা হয় ফ্রটিউরিজম। আবার অনেকে আছে অন্যের সামনে উলঙ্গ হলে বা নিজের যৌনাঙ্গ দেখালে ভালো লাগে। বিশেষ করে মেয়েদের হোস্টেলের আশেপাশে ইচ্ছে করে কিছু লোক প্রস্রাব করার উছিলায় বিশেষ অঙ্গ দেখানোর চেষ্টা করে। এটাকে এক্সিবিশনিজম বলে।

আমাদের গ্রামে একজন ডাক্তার রয়েছেন। তিনি একবার নাকি গরুর সাথে ‘অকাম’ করেছিলেন। প্রাণির সাথে এরূপ সেক্স করাকে বিস্টিয়ালিটি বলা হয়। অনেকে আছেন অন্যের প্রস্রাব করা দেখে সেক্সুয়াল ফিলিংস পায়। এটিকে বলা হয় ইউরোল্যাগনিয়া। আমাদের গ্রামে এক বোবা লোকের মধ্যে এটা আমি দেখেছি। মা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে, সেটি দেখে যাদের সেক্সুয়াল ফিলিংস জাগে সেটি হল গ্যালাকটোফিলিয়া।

শুধু তাই নয়, মৃত নগ্ন শরীর দেখেও অনেকে সেক্সুয়াল ফিলিংস পায়, যেটাকে বলে নেক্রোফিলিয়া। এগুলো সবই সেক্সুয়াল পারভার্শন। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক পারভার্শন হল পেডোফিলিয়া। শিশুদের প্রতি যৌন আকাক্সক্ষা তৈরি হওয়াকে পেডোফিলিয়া বলে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৫৪৬ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে, আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। এছাড়া ৯৭৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আগের বছর ২০১৯ সালে ১৪১৩ জন নারী ও ৯৮৬ জন শিশু এবং ২০১৮ সালে ৭৩২ জন নারী ও ৪৪৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গেল নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১২৪৭টি নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের তথ্য পেয়েছে।

সব ঘটনা সামনে না আসায় ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা এসব পরিসংখ্যানের চেয়ে আরও অনেক বেশি। মানুষের মধ্যে যৌনাকাক্সক্ষা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা বিকৃত হলেই সর্বনাশ। বড়লোকের ছেলেদের মতো প্রতিদিন ‘নারীদের নিয়ে’ টাকা ওড়ানোর যে নেশা সেটাতো কোনো মতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

মডেল ও প্রয়াত পপ কিং মাইকেল জ্যাকসনের মেয়ে প্যারিস জ্যাকসন বলছেন, নগ্নতা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। মানুষকে মানবিক করে তোলার একটি অংশ এই নগ্নতা। এর সঙ্গে যৌনতার কোনো সম্পর্ক নেই। বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে নিজের একটি নগ্ন ছবি পোস্ট করেন ১৯ বছর বয়সী মডেল প্যারিস। ছবিটি নিয়ে ভক্ত-ফলোয়াররা বেশ সমালোচনা করেন। এ কারণেই ১৪ লাখ ফলোয়ারের উদ্দেশে নিজের নগ্ন ছবি নিয়ে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন মাইকেল জ্যাকসন কন্যা।

ওই পোস্টে প্যারিস বলেন, ‘নগ্নতাবাদ এসেছে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার একটা উপায় হিসেবে। এটা একটা দর্শন। এর মাধ্যমে পৃথিবীর সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়। যখন আমি বাগানে থাকি, তখন প্রায়ই নগ্ন হই। এ সময় অন্য রকম এক ভালোলাগার সৃষ্টি হয়।’

বাংলাদেশে নারী হয়তো এতোটা স্বাধীন নয়। শুধু বাংলাদেশই বা বলি কেনো, কঙ্গোর উদাহরণতো আরো ভয়াবহ। সুইডেনের বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্ট্রম এক সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১০ সালে তিনি একবার আফ্রিকার দেশ কঙ্গো সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পর সফরের বিস্তারিত নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করার সময় ওয়ালস্ট্রম বলেন, বিশ্বে ধর্ষণের রাজধানী হলো আফ্রিকার দেশ কঙ্গো। সেখানে নারীরা অব্যাহতভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে এটা এই কারণে নয় যে, তাদের রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত আইন নেই। বরং আইন প্রয়োগের অভাবে এসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এখনো সেখানকার অবস্থা কিন্তু খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

যেমনটি আমাদের দেশে আইন থাকার পরও কতো ধর্ষণের ঘটনার বিচার হয়েছে! খুব বেশি আলোচিত না হলো সেটা হারিয়েই যায় অথবা লোকলজ্জার ভয়ে মিটমাট করে ফেলতে হয়। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সে শাসকের ভূমিকা পালন করতে ভালোবাসে। সে মনে করে যৌনতাই আসলে পুরুষত্ব?

কিন্তু আসলে কি তাই? তাহলেতো পশুর সঙ্গে আমাদের কোনো পার্থক্য থাকে না। নিজের পুরুষত্ব দেখাতে গিয়ে যার তাঁর সাথে ‘কুকামে’ লিপ্ত হওয়া বা শিশু বাচ্চাকে জোর করে বা রাস্তাঘাটে একাকি কোনও মেয়েকে পেয়ে ‘র‌্যাপ’ করে হত্যা করাই কি পুরুষত্ব?

আসলে এগুলো পশুত্ব। পশুত্ব আর পুরুষত্ব এক জিনিস নয়। একজন সত্যিকার পুরুষ সবসময় নারীদের সম্মান করে। তার কাছে একজন নারী সবসময় নিজেকে নিরাপদ বোধ করে। একজন সত্যিকার পুরুষ কখনো কোনও নারীকে আঘাত করে না, জোর করে না। যদি সে কাউকে চায়, নিজ যোগ্যতা দিয়ে তাকে অর্জন করে। তবেই না পুরুষ।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ভাষায়, ‘নারী তুমি ভোগ্য নও, পুরুষ তুমি ভোগ্য নও; নারী-পুরুষ শ্রমে-প্রেমে পরস্পরের যোগ্য হও।’ তবেই না শহীদ কাদরীর ভাষায় কবীর সুমনের সুরে বলা যাবে, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, এমন দিন এনে দেবো দেখো সেনাবাহিনীর বন্দুক নয়, শুধু গোলাপের তোড়া হাতে কুচকাওয়াজ করবে তোমার সামনে। শুধু তোমাকেই তোমাকেই স্যালুট করবে দিনরাত।’

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক