শরীফুল রুকন : ঘরে ঘরে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্তে বাধ্যতামূলকভাবে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে কাজে লাগাচ্ছেন নাগরিকেরা। কিন্তু চট্টগ্রামের বেশকিছু সরকারি ওয়েবসাইটে সঠিক ও পর্যাপ্ত তথ্য মিলছে না। এক সময় তথ্য দেয়া হলেও সেগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে না। এমনকি ডোমেইনের মেয়াদ চলে গেলেও ‘রিনিউ’ করা হচ্ছে না, এমন একাধিক সরকারি ওয়েবসাইটও মিলেছে। যার কারণে কয়েক বছর চালু থাকা সেসব ওয়েবসাইট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফলে তথ্য ও অন্যান্য সেবা পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন নাগরিকেরা।
২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের ওয়েবসাইটের ডোমেইন (acland-sadarctg.gov.bd) চালু করা হয়। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ডোমেইনটি রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ চলে গেছে। এরপর ‘রিনিউ’ না করায় ওয়েবসাইটটি বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুমা জান্নাতের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি।
একই অবস্থা চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের ওয়েবসাইট (acland-agrabadctg.gov.bd) ও চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের ওয়েবসাইটেরও (acland-chandgaonctg.gov.bd)। উক্ত ডোমেইন দুটি ২০১৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ডোমেইনটির মেয়াদ চলে যায়। সেই থেকে ওয়েবসাইট দুটি বন্ধ।
এ বিষয়ে চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামনুন আহমেদ অনিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা যে ডোমেইনটি কিনেছিলাম সেটির মেয়াদ চলে গিয়েছিল। এরপর সেটি আমরা রিনিউ করলে সমস্যা দেখা দেয়। এ পর্যন্ত চার-পাঁচবার ঠিক করা হয়েছে। গত মাসেও সেটি সচল ছিল। এখন একটু সমস্যা করতেছে, সেটি ঢাকা থেকে মেইনটেইন করে তো, এ কারণে।’ আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য জানা যায়নি।
এছাড়া খোঁজ নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া, কাট্টলী ও পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শনিবার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভূমি অফিসের ওয়েবসাইটগুলো সচল করে দেয়া হবে। আমাদের সফটওয়্যারের সমস্যা ছিল গত ৬-৭ মাস ধরে। সফটওয়্যারটা আপডেট করতে হয়েছিল। আজকে সকালেও কথা হয়েছে, আরও এক-দেড় মাস সময় লাগবে হয়তো।’ যদিও বিটিসিএলের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ভূমি অফিসের উক্ত ডোমেইনগুলো টাকা দিয়ে রিনিউ করা হয়নি।
এদিকে সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের জন্য .bd (ডট বিডি) ও .বাংলা (ডট বাংলা) ডোমেইন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং ডাইনামিক ওয়েবসাইট তৈরি ও সেখানে হালনাগাদ তথ্য রাখতে সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
এর আগে ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরেকটি চিঠি দিয়ে জানানো হয়, “সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং তাদের আওতাধীন সকল অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থা কর্তৃক .bd (ডট বিডি) ও . বাংলা (ডট বাংলা) ডোমেইন নিবন্ধন বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশন এবং ডায়নামিক ওয়েবসাইট তৈরির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর ও ৮ নভেম্বর এ বিভাগ হতে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। উক্ত পত্র প্রাপ্তির পর কোনো কোনো দপ্তর তাদের দপ্তরের জন্য জাতীয় তথ্য বাতায়নের ডাইনামিক কাঠামোতে সংযুক্ত না হয়েই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুনভাবে ডাইনামিক ওয়েবসাইট তৈরির জন্য কমিটি গঠন বা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন মর্মে জানা গেছে, যা অপ্রয়োজনীয়।” যদিও নির্দেশনা অমান্য করে কর অঞ্চল-১, চট্টগ্রাম এর ওয়েবসাইটটির ডোমেইন (taxctg.com) ডট বিডিতে নেই।
এছাড়া বিভিন্ন সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বারবার চিঠি দিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি ও হালনাগাদ রাখতে তাগাদা দেয়া হলেও চট্টগ্রামের কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান এসব কথা আমলেই নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে, কোন তথ্যই নেই। পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে অন্যান্য কর্মকর্তাদের কারও নাম নেই। তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তি হিসেবেও কারও নাম নেই। নোটিশ বোর্ড, খবর ও সেবা নামে যে অপশন আছে, সেখানেও কিছুই নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি এখন বাইরে আছি। অফিসে গিয়ে ওয়েবসাইটের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবো।’
একই অবস্থা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেরও। সেখানেও কোন তথ্য নেই। তথ্যপ্রদানকারী কর্মকর্তার নাম থেকে শুরু করে কিছুই নেই। নোটিশ বোর্ড ও খবর নামে যে বিভাগ আছে সেগুলো খালি। অন্যদিকে পাট অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেও কোন প্রকার তথ্য নেই। নোটিশ বোর্ড, খবর, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা, অফিস প্রধান, কর্মকর্তাদের নাম, সেবার তালিকা- বিভাগগুলোতে কিছুই নেই, সবই খালি। একই অবস্থা চট্টগ্রামে আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের ওয়েবসাইটেরও। সেখানে গিয়ে আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নাম, সেবার তালিকা কিছুই পাওয়া যায়নি।
এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কপোরেশন (বিএডিসি-বীজ) চট্টগ্রাম অফিসের ওয়েবসাইটটিতেও তেমন তথ্য নেই। প্রতিষ্ঠানটির কাজ কী, কী কী সেবা দেয়, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা কে- কিছুই নেই। তবে অফিস প্রধান হিসেবে যুগ্ম পরিচালক মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশ বোর্ড নামের বিভাগে প্রতিষ্ঠানটির যুগ্ম পরিচালক মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত ইন্টারনেট সংযোগের বিলের একটি ভাউচার দেয়া হয় শুধু; যাতে লেখা রয়েছে, “বীজ বিপনণ দপ্তরের জন্য প্লাস নেট থেকে ব্রডব্যান্ড সংযোগ নেয়া হয় মাসিক এক হাজার টাকা ব্যয়ে, জেলা প্রশাসন থেকে কোন ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হয়নি।” বিলের এই তথ্য সাধারণ মানুষের জেনে কী লাভ হবে, সেটা বুঝা মুশকিল।
চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের ওয়েবসাইটে নোটিশ বোর্ড, খবর, সেবার তালিকা বিভাগে কিছুই নেই। জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা কে সেটিও উল্লেখ নেই ওয়েবসাইটে। বিএসটিআই চট্টগ্রাম অফিসের ওয়েবসাইটে নোটিশ বোর্ড, খবর ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা বিভাগে কিছু লেখা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা কে সেটিও তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ নেই। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের নোটিশ বোর্ড ও খবর বিভাগটিও খালি; তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নামও লেখা নেই।
এদিকে চট্টগ্রামের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে গত বছর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)- টিআইবি। এতে বেশিরভাগ সরকারি ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। এ প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৪ অক্টোবর জেলা প্রশাসনের আইসিটি শাখা থেকে সরকারি দপ্তরগুলোতে চিঠি দিয়ে ওয়েবসাইট হালনাগাদ করতে অনুরোধ জানানো হয়। এরপরও তেমন একটা হালনাগাদ করা হয়নি।
জানতে চাইলে টিআইবি চট্টগ্রামের এরিয়া ম্যানেজার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সরকারি ওয়েবসাইটের সাতটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছিলাম। একেকটি ওয়েবসাইট একেকভাবে ডিজাইন করা হলেও সাধারণত প্রতিটি ওয়েবসাইটে নোটিশ বোর্ড, খবর, অফিস প্রধানের তথ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার তথ্য, সেবাসমূহের তথ্য ও যোগাযোগের তথ্য থাকে।’
‘এই সাতটি বিষয় যাচাই-বাছাই করতে চট্টগ্রামের ৮৮টি সরকারি অফিসকে আমরা কাউন্ট করেছিলাম। এরমধ্যে ২০টি ওয়েবসাইটে আমরা শতভাগ বা সাতটি তথ্য পেয়েছি। ৬টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে মাত্র একটি তথ্য পেয়েছি। দুটি তথ্য ছিল সাতটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। তিনটি তথ্য ছিল আটটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। চারটি তথ্য ছিল ৯টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। পাঁচটি তথ্য ছিল ১৬টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। ৬টি তথ্য ছিল ১১টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে।’ এছাড়া গবেষণার জন্য বাছাই করা ৮৮টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মধ্যে ৬২টির নোটিশ বোর্ড ও খবর নামে বিভাগে কিছু আপডেট করা হয়নি বলেও জানান তৌহিদুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি বিভাগের ওয়েবসাইটে ডিডি হিসেবে যার তথ্য দেওয়া হয়েছে, তিনি দুই-তিন বছর আগে অবসরে গিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট ছাড়া কোন ওয়েবসাইটে শতভাগ আপডেট নেই। তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার তথ্য বেশিরভাগ ওয়েবসাইটে নেই। অথচ ২০০৯ সালে গেজেট প্রকাশের পর থেকে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সব দপ্তরে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা থাকতে হবে। জেলা প্রশাসনকে এসব বলার পর গত বছরও জেলা প্রশাসন দপ্তরগুলোতে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু এখনো বেশিরভাগ ওয়েবসাইটে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার তথ্য নেই, মোবাইল নাম্বার, ইমেইল আপডেট নেই।’
সরকারি ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য না রাখলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি দেয়ার বিধান রয়েছে বলেও জানান টিআইবি চট্টগ্রামের এরিয়া ম্যানেজার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকারি ওয়েবসাইটগুলো সবসময় আপডেট রাখা উচিত। আপডেট রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে আমি নির্দেশনা দিয়ে দেবো।’
সনাক-টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের কিছু সরকারি দপ্তরের অফিসের ওয়েবসাইট নেই। অনেকগুলো ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য নেই। সেসব সমস্যা চিহ্নিত করে টিআইবি প্রতিবেদন দেয়ার পরও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সম্ভবত গুরুত্ব দেননি বা মনিটরিং করেননি। যদিও এই কাজটি একেবারে জনস্বার্থে করা হয়েছিল, প্রশাসনের স্বার্থে করা হয়েছিল, সবার মঙ্গলের জন্য করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত সব সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। এ ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে যে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা আমরা বলছি, সেটি এগিয়ে যাবে। দিন শেষে যারা সেবা নেন তারা উপকৃত হবেন, সার্বিক অর্থে প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ঘটবে।’