শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

একটি খেলার মাঠ ফিরে পাচ্ছে, তাতেই এত আনন্দ!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, মার্চ ২৩, ২০২১, ১:৪৮ অপরাহ্ণ

এম মোয়াজ্জেম হোসেন, রাঙ্গুনিয়া : রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন এলাকায় নেমে কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে দুইশ’ গজ পেরুলেই সরফভাটা ইউনিয়নের ক্ষেত্রবাজার। বাজার সংলগ্ন মেহেরিয়া মাদ্রাসার কাছে ৩ একরের বিশাল এক খেলার মাঠ। যে মাঠ শুধু সরফভাটা নয়, পুরো রাঙ্গুনিয়ার ক্রীড়ামোদি মানুষদের খেলাধূলা চর্চার বড় ঠিকানা ছিল, ছিল খেলোয়াড় তৈরির আঁতুরঘর।

এই মাঠে অবারিত ফুটবলচর্চা আর কসরত থেকে একসময় ওঠে এসেছেন ইছামতির বাসু বড়ুয়া, পদুয়ার প্রভাত বড়ুয়া, রাঙ্গুনিয়া সংলগ্ন রাইখালীর বিপ্লব মারমা, জনি মারমার মতো বরেণ্য ফুটবলাররা। কিন্তু দেড়যুগেরও বেশি সময় ধরে এ মাঠে আর কোনো খেলা হয় না, মাঠে গড়ায় না ফুটবল, ওঠে আসে না ফুটবলার-ক্রিকেটার। প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠটা যদি না-ই থাকে, বেদখল হয়ে যায় তাহলে খেলোয়াড় ওঠে আসবে কেমন করে?

হ্যাঁ, চরম খেলাবিদ্বেষী, প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিদস্যু গোষ্ঠীর আগ্রাসী থাবায় মাঠটি তার নিজস্ব অবয়ব, চেহারাসৌষ্ঠব হারিয়েছিল ১৮ বছর আগে। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের উদগ্র-উচ্ছৃঙ্খল থাবায় সেটি পরিণত হয় বনবাদাড় অতপর নিজস্ব সম্পত্তিতে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত সাকা চৌধুরীর তৎকালীন অনুচরদের আস্ফালন-উল্লম্ফনের সর্বনাশা ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ওইসময়ের মাঠদখল-কাণ্ডে।

২০০৮ থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতিশীল শক্তির সরকার ক্ষমতায়। সে থেকে আশায় বুক-জোট দুটোই বেঁধেছিল সরফভাটাবাসী; এবার হয়তো দখল হওয়া মাঠ তারা ফিরে পাবেন। ফুটবলে-ক্রিকেটে আবার জমবে মেলা, হাটখোলা। কিন্তু সে আশায় যেন গুঁড়েবালি! স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মাঠটিকে সমহিমায় ফেরাতে আন্তরিক হলেও আলোর মুখ দেখছিল না কিছুতেই।

শেষপর্যন্ত এলাকাবাসীর ধুমায়িত অসন্তোষ ক্ষোভ-বিক্ষোভে পরিণত হয়। সেই বিক্ষোভের দামামায় গত বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) উদ্ধার হলো স্বপ্নের খেলার মাঠটি। আর তাতে অকুণ্ঠ সমর্থন-সহযোগিতা দিলেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ফরিদ উদ্দিন ও সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুল ইসলাম সরফী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ ১৮ বছর পর মাঠ ফিরে পাওয়ার আনন্দে ভাসছে এলাকার শিশু-কিশোর, ক্রীড়ামোদী মানুষেরা। পুরো এলাকায় যেন আনন্দ-উৎসব। এ যেন স্বাধীনতা লাভের আনন্দ। স্থানীয়রা বলছেন, স্বাধীনতার পর আনন্দে এতটা উদ্বেল হননি সরফভাটার জনগণ।

তবে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়াও আছে মাঠ দখলমুক্তকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে। মাঠটি ফিরে পেতে চান আওয়ামী ঘরানার এমন কয়েকজন বললেন, রাঙ্গুনিয়ার অভিভাবক, মাননীয় তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদও আন্তরিক- এলাকাবাসীর দাবি অনুযায়ী মাঠটি তার হৃত গৌরব ফিরে পাক। সেজন্য তিনি একটি সুষ্ঠু স্বত:সিদ্ধ প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন। আগামী ৬ মাসের মধ্যে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাঠটি দখলমুক্ত করতে সঠিক দিক-নির্দেশনাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই অতি উৎসাহী দুই চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দুর্বৃত্তপনার মধ্যদিয়ে মাঠটি দখলমুক্ত করা মোটেও সুন্দর, শোভন হয়নি।

আবার কেউ কেউ বলছেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকে মাঠটি ফিরে পেতে আকুতি জানিয়ে আসছে এলাকার জনমানুষ। মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতার কথাও আমরা জানি। কিন্তু মাঠটি নিয়ে ঘাঁপটি মেরে থাকা সাকা চৌধুরীর প্রেতাত্মারা পদে পদে যে জটিলতা সৃষ্টি করেছে তাতে করে শত চেষ্টা করলেও সহসা মাঠটি উদ্ধার করা কঠিন হতো। তাই মাঠটি এই পন্থায় উদ্ধার হওয়াটাই বরং সঠিক, সময়োপযোগী। মাঠ উদ্ধারের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে যে সব কথাবার্তা হচ্ছে তা স্থানীয় গ্রুপিং রাজনীতিরই ফল-ফসল বলেও মনে করেন তারা। মাঠ উদ্ধারের ক্রেডিট চেয়ারম্যান শেখ ফরিদ ও মুজিবুল ইসলাম সরফীর ঘরে যাওয়টাকে সহ্য করতে না পেরেই পক্ষে-বিপক্ষের এসব ‘বাহাস’ বলেও মনে করেন কেউ কেউ।

সোমবার (২২ মার্চ) সকালে সরেজমিনে স্থানীয় লোকজনের সাথে এ বিষয়ে কথা হয় একুশে পত্রিকা প্রতিনিধির। তারা জানান,  ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলোচ্য মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের মাঝে একটি প্রীতিফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। রেফারির একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ধুন্ধুমার গণ্ডগোল বাধে সেই খেলায়। মুহূর্তেই পণ্ড হয়ে যায় ফুটবল। হুড়োহুড়ি, ছোটোছুটিতে আহত হয় বেশ কয়েকজন।

আর সেই সুযোগে নিজেদের জমি দাবি করে রাতারাতি বেশকিছু চারা রোপণ করে মাঠটি দখলে নেন রেড করিম, মুরাদ মাস্টার, ফারুক চৌধুরী প্রমুখ; যারা প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা দোর্দান্ত প্রতাপশালী সাকা চৌধুরীর সাঙ্গপাঙ্গ ও উচ্ছ্বিষ্টভোগী হিসেবে পরিচিত। সেই থেকে শতবছরের প্রাচীন, এই অঞ্চলে খেলাধূলার ‘সবেধন নীলমনি’ হয়ে থাকা মাঠটি বেদখল হয়ে যায়। তখন বিএনপি’র প্রভাবে সরফভাটায় এ নিয়ে কথা বলার মানুষ ছিলো না।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, মাঠের জায়গাটির মালিক প্রয়াত শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ এএ রেজাউল করিম চৌধুরীর চাচা সাবেক চেয়ারম্যান তোফায়েল চৌধুরী ও আলী আহমদ বি.কম। ১৯৬০ সালের আগে মাঠটি তারা সরফভাটা হাইস্কুলের তত্ত্বাবধানে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করতে দেন। এরপর স্থানীয়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি খনন করে জায়গাটি খেলার মাঠে রূপান্তর করেন। আর সেই খেলার মাঠটি দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে দখল করে রেখেছিলো উল্লেখিত ব্যক্তিরা।

সরফভাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম একুশে পত্রিকাকে জানান, ১৯৬৯ সালে যখন তিনি স্কুলের ছাত্র ছিলেন, তখন খেলার মাঠটি পরিপূর্ণ করতে প্রতি বছরই সংস্কার করা হত। আর সেই ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠটি বিএনপি সরকারের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ২০০৩ সালে দখল করে নিয়েছিল কথিত জায়গার মালিকানা দাবিদারগণ। আজ ১৮ বছর পর আবারো মাঠটি দখলমুক্ত করে খেলার মাঠে পরিণত হতে যাচ্ছে, যা সরফভাটা ইউনিয়নের জন্য সৌভাগ্য। মাঠটি দখলমুক্ত হওয়ায় অত্যন্ত খুশি হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সরফভাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ হোসেন একুশে পত্রিকাকে জানান, খেলার মাঠটি অনেকেরই স্মৃতিবিজড়িত। কতই না ভাল লাগত খেলোয়াড়েরা এখানে যখন এসে খেলতেন! আর তা উপভোগ করতেন সমগ্র ইউনিয়নের মানুষ।  দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মাঠটি দখল করে রেখেছিল এক শ্রেণীর স্বার্থপর মানুষ। দীর্ঘদিন পর এ খেলার মাঠটি উদ্ধার হওয়া একটি বিজয় ছিনিয়ে আনার মতই। মাঠটি উদ্ধার হওয়ায় এলাকার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দ বিরাজ করছে।

এদিকে সরফভাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও উপজেলা শেখ রাসেল ফুটবল একাডেমির সদস্য মো. সাকিবুল আলম একুশে পত্রিকাকে জানান, আমাদের ইউনিয়নে ভাল কোনো খেলার মাঠ না থাকায় এলাকার বাইরে গিয়ে প্র্যাক্টিস করতে হয়। আমাদের বয়সের অনেক ছেলেই খেলাবিমূখ হয়ে আসক্ত হয়ে পড়েছে মাদকে অথবা স্মার্টফোনের বিভিন্ন গেইমসে। আর তার একটাই কারণ আমাদের কোনো খেলার মাঠ নেই। দীর্ঘদিন পর আমাদের ইউনিয়নে একটি খেলার মাঠ পাচ্ছি যেখানে আমরা প্র্যাক্টিস করতে পারবো, খেলতে পারবো- ভাবতেই অনেক ভালো লাগছে।

সরফভাটার সন্তান রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউনুছ একুশে পত্রিকাকে বলেন, মাঠ উদ্ধারের বিপক্ষে আমরা কেউ নই। এলাকাবাসীর প্রাণের দাবির প্রেক্ষিতে রাঙ্গুনিয়ার অভিভাবক, মাননীয় তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাঠটি দখলমুক্ত করতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। বিএনপির আমলে রেড করিমরা মাঠটি দখল করেছিলেন যেমন সত্য, ঠিক তেমনি মাঠের ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এজন্য মন্ত্রী মহোদয় মাঠটি এমনভাবে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন যাতে করে কেউ তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই সাথে কোনো অসন্তোষ যেন থাকে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ার আগেই সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের আশায় এভাবে রাতারাতি মাঠ উদ্ধার প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও মনে করেন যুবনেতা মোহাম্মদ ইউনুছ।

এ প্রসঙ্গে সরফভাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, সরফভাটার ৬৫ হাজার মানুষের জন্য এটি ছাড়া আর কোনো খেলার মাঠ নেই। ১৯৬০, ৭৩ ও ৭৬ সালে মাঠটির উন্নয়নে তৎসময়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই মাঠটিই বিএনপির আমলে গণ্ডগোলের ছুতোয় বেদখল হয়ে যায়। রাঙ্গুনিয়ার মানুষের অভিভাবক, আমাদের প্রিয় নেতা মাননীয় তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছেও এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি ছিল মাঠটি ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তিনিও এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক।

কিন্তু স্থানীয়দের দাবিপূরণের বিষয়টিকে বাধাগ্রস্ত করতে স্বার্থান্বেষী মহলের বিভিন্ন ফাঁদে এলাকাবাসীর দাবিটি আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার এলাকাবাসিই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে কটি গাছ ছিল তা কেটে মাঠটি পুনরুদ্ধার করেছেন। আমি যেহেতু জনগণের প্রতিনিধি। তাই জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট, স্বতঃস্ফূর্ত চাওয়ার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমার নেই। সঙ্গতকারণে মাঠটি উদ্ধারের ব্যাপারে আমি জনগণের পাশে ছিলাম। ভবিষ্যতেও থাকবো।’- যোগ করেন চেয়ারম্যান ফরিদ। এটা নিয়ে নোংরা রাজনীতি না করার জন্যও তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ জানান।

এদিকে মাঠ দখলমুক্ত করতে দুই শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে এলাকাবাসী বলেন, গাছ না কেটে মাঠটি উদ্ধার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যে প্রক্রিয়ায়, যখনই উদ্ধার হতো তখনই গাছগুলো কাটা লাগত জানিয়ে স্থানীয়রা জানান, কাটা গাছগুলো বর্তমানে মাঠেই স্তূপ হয়ে আছে। গাছের মালিক যারা, তাদেরকে সেগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টার কথা শুনেছেন বলে জানান তারা।