শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

জয়তু একুশে পত্রিকা

প্রকাশিতঃ বুধবার, মার্চ ২৪, ২০২১, ৪:৩৯ অপরাহ্ণ

 

ওমর ফারুক হিমেল : সাংবাদিকতা নেশা হলেও প্রবাসজীবন শুরু করার পর এই নেশার ইতি টেনেছি বহু আগে। কারণ কোরিয়ার মত দেশে অহর্নিশ কর্মব্যস্ততায় গাঁথুনিপূর্ণ লেখা প্রসব করা খুবই দুরূহ. কষ্টসাধ্য। কিন্তু আমার মন মানে না! জীবনের মাঝপথে, আমার হৃদয়ে এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়, অনুক্ষণ কর্মপ্রেষণায় আমি হাফিয়ে ওঠি।

এই শূন্যতা থেকে বাঁচতে, নিজেকে বাঁচাতে শনি-রবিবার বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটাই। হৈ-হুল্লোড়, আনন্দে-আহ্লাদে পার করার চেষ্টা করি। তবুও শূন্যতা আমার হৃদয়-আসনে বহমান। বাসন্তী বাতাবরণে আবারও সিদ্ধান্ত নিই আবার শুরু করব লেখালেখি। সে থেকে যান্ত্রিকতা ছেঁদ করে বের করে আনা সময়ে দেশের জাতীয় দৈনিকে প্রবাসকেন্দ্রিক ফিচার লিখতে থাকি। একসময় সেটি নিয়মিত নেশায় পরিণত হয়।

কোরিয়ান জীবনের শেষ তিনবছর চাকরির পাশাপাশি আমার দুটি নেশাময় কাজ ছিল- কোরিয়ান ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধি, আর লেখালেখিতে বুঁদ হওয়া। জাতীয় পত্রিকায় ফিচার লিখে মনের খোরাক যখন মিটছে না, তখন আমি যোগাযোগ করি চট্টগ্রামের সাহসী সাংবাদিক, একাত্তর টেলিভিশনের প্রাক্তন সিনিয়র রিপোর্টার, একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদারের সাথে। তিনি লিখতে উৎসাহ জোগালেন, বললেন হাত খুলে লেখ।

সবচেয়ে দারুণ, বিমুগ্ধ বিষয় হচ্ছে- আজাদ ভাইয়ের লেখার গাঁথুনি, শব্দচয়ন, প্রুফ রিডিং, বাক্যবিন্যাস এক কথায় অননসাধারণ, অতিশে ঝরঝরে। বহু আগে থেকেই আমি তার ভক্ত প্রাণপ্রাচুর্যময় ‘লেখামালা’র জন্যে।

যেটি বলছিলাম, সে থেকে প্রবাসের নানান খবর একুশে পত্রিকায় লিখতে থাকি। বরাবরের মতো গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়, আপলোড হয় একুশে পত্রিকায়। যে পত্রিকা ১৬ বছর ধরে সহিমায় দাঁড়িয়ে আছে বন্দর নগরীতে। মাসিক থেকে সাপ্তাহিক; শুরুতে ম্যাগাজিন আকারে, তারপর অনলাইন যাত্রা, সরকারের নিবন্ধন পাওয়ার পর পেশাদার অনলাইন প্রকাশনার পাশাপাশি ব্রডসিট কাগজে সপ্তাহান্তে একুশে পত্রিকার ছাপাকাগজও এখন বাজারে সাংবাদিকতার আলোর মশাল হয়ে জ্বলছে।

বলাবাহুল্য, অনলাইন পত্রিকা হিসেবেও পত্রিকাটি দেশ-বিদেশে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। লাখো পাঠক মুখিয়ে থাকে, একুশের তথ্যভিত্তিক সংবাদের জন্য । দক্ষিণ কোরিয়ায় গড়ে উঠেছে বিশাল পাঠককূল। সৃষ্টি হয়েছে শক্তিশালী পাঠকফোরাম। বর্তমানে ফিচারের গুণগতমান আর অনুসন্ধানী সংবাদের জন্য, একুশে পত্রিকা হয়ে উঠেছে অজস্র-অগণন মানুষের প্রাণের পত্রিকা।

পাঠককে যে কথা বলতে গিয়ে, এখনো বলা হয়নি- কোরিয়ার প্রবাস জীবনের ইতি টেনে ডিজিটাল মিডিয়ায় উচ্চতর ডিগ্রি নিতে জার্মানিতে আমার হিজরত। জার্মানিতে চলমান লকডাউনের কারণে অনেকদিন ধরে ঘরবন্দি। জার্মানিতে আমার কোর্স চলছে অনলাইনে, কোরিয়ায় চাকরি জীবন শেষে। এখন পড়াশোনা আমার জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জও বটে। যাই হোক, জার্মানির লকডাউনে হাাফিয়ে উঠায়, মাথায় চিন্তা ভর করলো কার্ডটা পেলে দেশে যাব বাবার কাছে।

এসেই দেখি বাবার দাতের অবস্থা ভাল নয়। বয়স বাড়লে যা হয় আর কী! নিদাঘ সূর্যের তলে আশ্রয় আমার। মাতৃহৃদয়ের মতো কোমল হৃদয়ের অতলান্ত-অসীম হৃদয়ের বাবার কাছেই আমার ঠায়। রক্তের এই বাঁধনকে ঘিরে বাঁচতে চাই আমি। বাবাকে নিয়ে, চট্টগ্রামের তরুণ চিকিৎসক ডা. একিউএম মহিউদ্দিন মাসুমের কাছে গেলাম কদিন আগে। মাসুম আমার ছাত্রজীবনের বন্ধু। অত্যন্ত নিখুঁত ছেলে। তার স্ত্রীও চিকিৎসক, দুইজনই বিসিএস (স্বাস্থ্য কর্মকর্তা)।

মাসুম ব্যক্তিগতভাবে সব মতের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রেখেই চলে। সাংবাদিকদের সাথে তো তার হৃদ্যতার সম্পর্ক । আমি তার চেম্বারে বসে আছি আব্বাকে নিয়ে। সেদিন রোগী বেশি থাকায়, আব্বা অপেক্ষায় কাতর হয়ে হঠাৎ গভীর মনোযোগে চোখ রাখলেন ম্যাগাজিনের পাতায়। দূর থেকে বিষয়টি আমার চোখ এড়ায়নি। বাবা আমার একনাগাড়ে আধাঘণ্টা চোখ রেখেছেন একুশে পত্রিকার একটি পুরোনো প্রকাশনায়- ম্যাগাজিন জমানায়। যে ম্যাগাজিনের পরতে পরতে ছন্দ। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম বাবা কী করছেন। বললেন একুশে পত্রিকা পড়ছি। এর মধ্য একটি লেখা তোমার ।

চট্টগ্রামে আসার একদিন পরে ডাক্তারের চেম্বারে একুশে পত্রিকা দেখে খুবই আনন্দ অনুভব করলাম। বসে বসে চিন্তা করছি, দীর্ঘসময় দেশ-বিদেশে চ্যালেঞ্জিং সাংবাদিকতা করে বহু ঝাল, মিষ্টিময় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদার। তিনি নতজানু, বোঝাপড়ার সাংবাদিকতা করেননি এই জীবনে । স্বাধীন সাংবাদিকতা করেছেন। অনেক রথী-মহারথীর বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম সচল, সক্রিয় রেখেছেন সবসময়। সে জন্যই হয়তো একুশে পত্রিকা দেশ-বিদেশের নন্দিত পত্রিকা।

আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার বলেছিলেন , সাংবাদিকের কলম যত মুক্ত হবে, সমাজ তত বেশি উপকৃত হবে। আমার বিশ্বাস, মুক্তভাবে একুশে পত্রিকা লিখেই যাবে, সমাজকে উপকৃত করার জন্য, সমাজের মানুষকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য।

জয়তু একুশে পত্রিকা, জয়তু আজাদ তালুকদার।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক