শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

জনসম্মুখে নারীদের পেটালেন আওয়ামী লীগ নেতা (ভিডিও)!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৫, ২০২১, ৩:৫৪ অপরাহ্ণ

 

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি : নিরীহ দোকানকার আব্দুস সবুরকে (৪২) পেটাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম বাদশা, তার সহযোগী হৃদয় ও সোহেল নামের দুই কিশোরসহ বেশ কয়েকজন। তাদের রুদ্ররোষ থেকে সবুরকে রক্ষা করতে ছুটে যান তার স্ত্রী কুসুম আকতার (৩১), কন্যা ইসরাত রাফি (১৩) ও মা রাফিয়া বেগম (৬৫)।

তাদেরকেও এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করেন বাদশা ও তার লোকজন। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতা বাদশা লোহার রড দিয়ে সজোরে আঘাত করেন বৃদ্ধ রাফিয়া বেগমকে। এতে তিনি বামহাতে গুরুতর আঘাত পান। বাদশার তাণ্ডব-বীভৎসতার ক্ষুদ্র এ অংশটি ধরা পড়ে ৫৮ সেকেন্ডের ছোট একটি ভিডিওতে; এ ঘটনায় বিস্ময়ে হতবাক এলাকার মানুষ!

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকাশ্যে জনসম্মুখে অসহায় নারী-পুরুষকে পেটানো জাহাঙ্গীর আলম বাদশা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় পদুয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি। একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কথায় কথায় ক্ষমতার দাপট দেখানো, মানুষের গায়ে হাত তোলা, সালিশ-বিচারের নামে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থআদায়, কিশোরগ্যাং লেলিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানী করা তার নিত্যকাজ, জীবিকা নির্বাহের হাতিয়ার । আর তারই অংশবিশেষ অসহায় নারীকে পেটানোর এই ঘটনা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার (২৪ মার্চ) সকাল ১০ টার দিকে দলবল নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বাদশা রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের পদুয়া স্কুল-সংলগ্ন আব্দুস সবুরের জায়গার উপর ঘেরাবেড়া দিচ্ছিলেন। সবুর এতে বাধা দিলে বাদশা তাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে একপাশে নিয়ে যান। তারপর কখনো কিলঘুষি, কখনোবা লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। তাতে অংশ নিয়ে বাদশার সহযোগী হৃদয়, সোহেলও তাকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন। সবুরকে রক্ষা করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সবুরের মা, স্ত্রী-কন্যা। আহত আবদুস সবুর ও তার বৃদ্ধা মা রাফিয়া বেগমকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

জানা গেছে, পৈশাচিক উন্মত্ততায় মেতে ওঠেই বসে থাকেননি আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম বাদশা। ঘটনার পর রাঙ্গুনিয়া স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স থেকে মিথ্যা সনদ নেন তিনি। এরপর সবুর, তার মা ও স্ত্রী-কন্যা উল্টো তাকে পিটিয়েছে মর্মে গল্প ফেঁদে রাঙ্গুনিয়া থানায় তাদের ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করতে যান। তবে পুলিশ তার মামলা না নিলেও জিডি নিয়েছে।

অন্যদিকে, অনেক আকুতির পর প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষ থেকে মামলা গ্রহণ করে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ, তাও রাত ৮টার পর। সবুরের দায়ের করা মামলায় জাহাঙ্গীর আলম বাদশা, হৃদয়, সোহেলসহ আরও ৫-৬ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলা নং ২০, তারিখ : ২৪/০৩/২০২১, ধারা : ১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৫০৬। মামলার পর গা ঢাকা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা বাদশা। তবে তাকে বাঁচাতে স্থানীয় ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বারের নেতৃত্বে একটি চক্র তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

এদিকে, নারীর প্রতি এমন অত্যাচার ও সহিংসতার দায়ে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম বাদশাসহ তার সহযোগীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষ।

স্থানীয় তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সংগঠক সাইদ মাহমুদ রনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, জনসম্মুখে নারীর গায়ে হাত তোলা, এলোপাথাড়ি পিটিয়ে জখম করা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও নিন্দনীয়। অপরাধী যেই হোক, তার গ্রেফতার ও বিচার হতে হবে। শান্তির জনপদ পদুয়ায় এমন বর্বরোচিত ঘটনা কারো কাম্য নয়। এতে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করেন সাইদ মাহমুদ রনি।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভিকটিম আবদুস সবুর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর প্রণব বিকাশ দাশগুপ্ত থেকে পদুয়া হাইস্কুলের পেছনের অংশে তিন দাগে ৭৯ শতক জমি কিনে তা শান্তিপূর্ণভাবে ভোগ-দখল করে আসছিলাম। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে স্কুলে অনুষ্ঠিত এএসসি পরীক্ষায় নকল-প্রতিরোধে নিরাপত্তাবেস্টনি তৈরি করার কথা বলে আমার ৬ শতক জমিও খুঁটি গেড়ে ঘিরে ফেলা হয়। তখন স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বাদশা জানিয়েছিলেন পরীক্ষা শেষ হলে ঘেরা তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু দুইবছরেও সে ঘেরা না তুলে উল্টো সেখানে মাছচাষ শুরু করেন তিনি।

গত ৭-৮ মাস আগে জায়গাটি বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাদশা আমার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা দাবি করলে আমি তাকে নগদে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করি। টাকা প্রদানের বিষয়টি বাচা মেম্বার, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সাত্তার সাহেবের ছেলে ডা. আকতার হোসেনসহ অনেকেই জানেন। এছাড়া এ সংক্রান্ত ফোনালাপের রেকর্ডিং আমার কাছে থাকার কথা। খুঁজলে  নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এরপরও আমাকে জায়গা বুঝিয়ে না দিয়ে গতকাল (বুধবার) দলবল নিয়ে স্কুলের সীমানায় ঘেরাবেড়া দেওয়ার নাম করে খুঁটি গেড়ে উল্টো আমার অবশিষ্ট জায়গারও কিছু অংশ ঢুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়।

‘এতে বাধা দিলে বাদশা ও তার বাহিনীর লোকজন আমি, আমার মা, আমার স্ত্রী ও কন্যাকে বেধড়ক পেটান। বাদশার লোহার রডের আঘাতে আমার মা-র বামহাতের কব্জি থেতলে গেছে। আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে এখনো ফুলা, রক্তাক্ত জখম। রক্তজমাট বেধে আছে সারা শরীরে। ভূমিদস্যু বাদশার কবল থেকে তার সারাজীবনের সঞ্চয়ে কেনা জায়গা ফেরৎ পাওয়ার পাশাপাশি নারী নির্যাতনের ঘটনায় বাদশার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান আবদুস সবুর। সবুর বলেন, গত দুই বছর ধরে বাদশার মানসিক অত্যাচারে আমি রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েছি। কিছুদিন আগে মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সে আমাদের মেরে আহত করলো।’

ন্যক্কারজনক এই ঘটনার পর সুখবিলাশ ফিশারিস অ্যান্ড প্ল্যানটেশনের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এরশাদ মাহমুদ সহানুভূতি নিয়ে তাৎক্ষণিক পাশে দাঁড়ানোয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ভুক্তভোগী আবদুস সবুর।

আবদুস সবুরের স্ত্রী কুসুম আকতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, আপনারা ভিডিওতে যা দেখেছেন তা সামান্য। আধঘণ্টা ধরে বাদশা ও তার লোকজন আমাদেরকে পিটিয়েছে। বাদশা নিজেই আমার তলপেটে, বুকে, পিঠে উপর্যুপরি লাথি ও ঘুষি মেরেছে। আমার সমস্ত শরীর এখন ব্যথা।
তিনি বলেন, আমার মেয়ে এই ঘটনা ভিডিও করার সময় বাদশা ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে আমার মেয়ের দিকে তেড়ে যায়। আমার মেয়ে দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে কোনোরকমে আত্মরক্ষা করে। এরপর সে আর ভিডিও করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ওসি তদন্ত মাহবুব মিল্কী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘হ্যাঁ, জাহাঙ্গীর আলম বাদশা একটি জিডি করেছেন। সেটি আমরা তদন্ত করছি।’

জাহাঙ্গীর আলম বাদশার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা যে মামলা করেছেন সেটার কী অবস্থা- একুশে পত্রিকার এই প্রশ্নে মাহবুব মিল্কী বলেন, ‘ও, বাদশার বিরুদ্ধেও একটা মামলা হয়েছে নাকি! আমি তো খেয়াল করিনি। হুম, কাল রাত আটটার দিকে যে মামলা হয়েছে সেটি তদন্তের জন্য এসআই মুজিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ এরপর মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরে কথা বলার প্রতিশ্রুতিতে বিদায় নেন ওসি মাহবুব মিল্কী।

এরপর শিলক উপ থানার ইনচার্জ এসআই মুজিবুর রহমানকে ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘ভাই একটা জিডি হয়েছে বলে জানি। মামলা হয়েছে কিনা কিংবা আমিই সে মামলার তদন্তকারী অফিসার কিনা এখনো জানি না। আমি অন্য একটা কাজে রাঙামাটির বেতবুনিয়া চলে এসেছি ভোরে। আমি থানায় ফিরে বিস্তারিত আপনাকে জানাচ্ছি।’

এর কিছু সময় পর এসআই মুজিবুর রহমান ফিরতি ফোন দিয়ে একুশে পত্রিকাকে জানান, ‘হ্যাঁ, ওসি স্যারের সাথে আমি কথা বলেছি। মামলার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। বাদশা খারাপ মানুষ। এলাকার মানুষের কাছে তার রিপুটেশন ভালো নয়। এ ব্যাপারে আইনগতভাবে যা করার আমরা করবো। – যোগ করেন এসআই মুজিব।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বাদশা একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি তাদের মারিনি। ডাহা মিথ্যা কথা। বরং তারাই লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাকে মারতে এসেছে। বাদশার মারধরের ভিডিও একুশে পত্রিকার কাছে আছে জানালে তিনি বলেন, এটা বানানো ভিডিও। সবুরের অভিনয়। এসব কাহিনী করে আমাকে কিছুই করতে পারবে না।

পদুয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একুশে পত্রিকাকে বলেন, সবুর জায়গাটি কিনে নিয়েছে। এটা তার কেনা, বৈধ জায়গা। এরপরও জাহাঙ্গীর আলম বাদশা যখন এটা নিয়ে ঝামেলা করছেন, আমি তখন দুইপক্ষকে নিয়ে এটার একটা সমাধান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই বাদশা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন। যদিও আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। কিন্তু মানুষের মুখে আমি সবুর, তার স্ত্রী-কন্যা ও মাকে মারধরের ঘটনা শুনেছি। এমন ঘটনা যে-ই করুক এটা নিন্দনীয়। কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ব্যাপারে স্থানীয় মেম্বার কাজী  আরকান উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান। তিনি বলেন, গতকাল একটা ঘটনা ঘটেছে বলে জানি। কিন্তু কী ঘটেছে আমি বিস্তারিত জানি না। নারীর গায়ে হাত তোলার বিষয়টি ভিডিওতে ধারণ আছে-এটা বলার পর তিনি বলেন, হ্যাঁ এ কাজটা ঠিক হয়নি। সমস্যা, ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, তাই বলে গায়ে হাত তোলা উচিত নয়। এধরনের বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতো।