শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

রেলে সবই আছে, হৃদপিণ্ড নেই!

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ২৮, ২০২১, ৫:২৯ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : গ্রামের পর গ্রাম বিদ্যুতের তার-খুঁটি স্থাপন করেও কোন লাভ নেই, যদি বিদ্যুৎ কেন্দ্রই না থাকে। তেমনি উৎপাদনক্ষম কারখানা ও বিশ্বমানের দক্ষ রেলকর্মী না থাকলে নতুন রেলপথ তৈরি করেও লাভ নেই। রেললাইন ও ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখন প্রচুর কর্মী আছে। কিন্তু কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি ও কারখানা নামক হৃদপিণ্ড না থাকলে রেলপথ নামক শিরা-উপশিরা অচল হতে বাধ্য। বর্তমানে এমন অবস্থায়ই যেন বিরাজ করছে রেলওয়েতে। বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না রেলওয়ে।

এদিকে পর্যটন শহর কক্সবাজারকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক জেলায় রেলের সংযোগ স্থাপন করতে নতুন রুট তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভারতের সঙ্গে সংযোগ আরও বৃদ্ধির পাশাপাশি মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গেও রেল যোগাযোগ স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামীতে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে রেলওয়ের প্রস্তুতি কতটুকু- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও বর্তমানে রেলওয়েতে যে চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হয়েছে সেটুকু সামাল দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

অন্যদিকে রেল সেবাকে আরও আরামদায়ক ও দ্রুত করতে দেশে দেশে রেল পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় আসছে আধুনিকায়ন। ট্রেন এবং রেলওয়ে সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন প্রযুক্তি ও কারিগরী ব্যবস্থার প্রচলন এগিয়ে চলছে। রয়েছে পারস্পরিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক রেলযোগাযোগ সহায়তা বৃদ্ধিতে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অব রেলওয়েজ, কমিউনিটি অব ইউরোপীয়ান রেলওয়ে এ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানীজ, ইন্টারগভার্ণমেন্টাল অরগ্যানাইজেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যারেজ বাই রেল, এসোসিয়েশন ফর কো-অপারেশন বিটউইন রেলওয়েজ, সাউদার্ণ আফ্রিকান রেলওয়েজ অরগ্যানাইজেশন কিংবা ট্রান্সপোর্ট করিডোর ইউরোপ ককেশাস এশিয়া এর মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অব রেলওয়েজ বা আঞ্চলিক রেলযোগাযোগ সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ নেই বাংলাদেশের।

রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বমানের কাতারে অংশীদার হতে প্রয়োজন বিশ্বমানের দক্ষ ও সুউচ্চ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন নিবেদিত রেলকর্মী, যা বাংলাদেশে তেমন নেই। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে রেলওয়ে খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া হয় না। যার কারণে রেল সম্পর্কিত কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। এছাড়া রেলওয়ে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও দেশে নেই। কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলওয়ে প্রযুক্তির বিষয়ে বিভাগ খুলে পড়াশোনাও চালু হয়নি। যার কারণে পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল পাচ্ছে না রেলওয়ে।

এদিকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ খোলার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে বিভিন্ন সময়ে চিঠি দেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করার জন্য সুপারিশ করে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এছাড়া ২০১৮ সালে ভারতে রেলওয়ের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে সেই আদলে বাংলাদেশে একটি রেলওয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি। তবে এসব বিষয়ে অগ্রগতি নেই।

এসব বিষয়ে জানতে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে সংসদীয় কমিটির সদস্য বেগম নাদিরা ইয়াসমিন জলি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কমিটির বৈঠকে আমিই সবসময় উপস্থিত থাকি। সেখানে রেলমন্ত্রীও থাকেন। প্রতিবার রেলওয়ের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ খোলার ব্যাপারে কথা হয়। কিন্তু কথাগুলো পড়ে থাকে, এসব নিয়ে কাজ আগায় নি।’

ভারতের আদলে রেলওয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন উষ্মা প্রকাশ করেন; তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভারতে রেলওয়ে প্রকৌশল নিয়ে পড়ানোর জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আগে ভালো করে জানেন, সেখানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিনা, তারপর সাংবাদিকতা করেন।’ ভারতে ‘ন্যাশনাল রেল অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টেশন ইনস্টিটিউট’ নামে রেলওয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে জানালে রেলমন্ত্রী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এদিকে চট্টগ্রামের হালিশহরে বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, সেখানে অনুমোদিত জনবল রয়েছে ৬৭ জন। এছাড়া পাহাড়তলী, ঢাকা ঈশ্বরদী ও পার্বতীপুরে চারটি রেলওয়ে ওয়ার্কশপ ট্রেনিং ইউনিট (ডব্লিউটিইউ) রয়েছে। এই ট্রেনিং ইউনিটগুলোতে যান্ত্রিক বিভাগের ও লোকোমোটিভ এবং রেলওয়ে অপারেশন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চারটি ডব্লিউটিইউতে ৪ জন ট্রেনিং অফিসার, ১৬ জন সিনিয়র প্রশিক্ষক ও ৬ জন ডেমোনেসট্রেটর এবং ৩৬ জন কর্মচারী রয়েছেন। এই সীমিত সামর্থ্য নিয়ে রেলওয়েতে প্রশিক্ষণের কাজ কোনরকমে চলছে।

অন্যদিকে ভারতীয় রেলওয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে জানা গেছে, দেশটিতে ‘ন্যাশনাল রেল অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টেশন ইনস্টিটিউট’ নামে রেলওয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের রেলওয়ে মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা একত্রিত হয়েছেন, রেলপথ ও পরিবহন খাতে দক্ষ জনশক্তি যোগান দিতে। এর বাইরে আরও ছয়টি বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে ভারত, যেখানে রেলওয়ে নিয়ে প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও গবেষণার কাজ চলছে। এর বাইরে আরও অন্তত ১৪টি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ভারতে আছে, যেখানে রেলওয়ে প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ আছে- গুগলে সার্চ করে এসব তথ্য জানা গেছে। দক্ষ রেলকর্মী তৈরির এসব প্রচেষ্টার সুফল ভারত পাচ্ছে, ২০০৪ সাল থেকে ভারতীয় রেলওয়েতে ক্রমাগত লাভের অংক বাড়ছে। অন্যদিকে প্রতিবছর দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়েকে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) আহমেদ মোর্শেদ বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশের রেলযোগাযোগের সামর্থ্যরে সাথে আমাদের দেশের রেল ব্যবস্থাপনাকে সঠিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে কাজ করতে হবে। বিশ্বমানের দক্ষ কর্মী অর্জনে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ একাডেমীসহ আনুষ্ঠানিক উচ্চ ডিগ্রি প্রদানকারী কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে প্রতিষ্ঠা করার সকল ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সাথে অন্যান্য কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলওয়ে প্রযুক্তির বিষয়ে বিভাগ খুলে উচ্চ ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা নেয়াও জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৬০ বছরেরও বেশি সময়ের কারিগরি অভিজ্ঞতা রয়েছে। রেলওয়ের প্রতিটি কাজে ব্যবহৃত হয় কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা। এই কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। যারা অবসরে গেছেন তাদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতাকে সামনে রেখে রেলওয়ের নিজস্ব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গঠন করা যায়। এতে যেমন রেলওয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরামর্শক ব্যয় কমে আসবে, তেমনি কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ নিজেকে দেশের কল্যাণে নিয়োজিত করার সুযোগ পাবেন।’

আহমেদ মোর্শেদ বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে সর্বত্র রেলযোগাযোগ বিস্তৃত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। এ পর্যন্ত অর্জনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশের জমির স্বল্পতা থাকায় নতুন রেললাইন নির্মাণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য প্রয়োজন সর্বোচ্চ মানের প্রযুক্তি, আর্থিক সক্ষমতা এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা। তবে আমার বিশ্বাস, রেলওয়ে অবশ্যই এ সকল বাধা কাটিয়ে উঠতে পারবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের কাতারে সংযুক্ত হয়ে উন্নত মানের রেলসেবা প্রদানে সক্ষম হবে।’

এদিকে দেশ স্বাধীনের পর রেলের জনবল ছিল ৬৮ হাজার আর ৫০ বছর পর এসে রেলের লোকবল হয়েছে ২৬ হাজার ১৩৫ জন। রেলে এখনো ১৪ হাজার ১২৯টি পদ খালি আছে। এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। মাঝে লোকবল নিয়োগের জন্য আমাদের কোনো নীতিমালা ছিল না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ হস্তক্ষেপে সেটা আমরা করে ফেলেছি। দুই-তিন বছরের মধ্যে রেলে লোকবল ঘাটতি দূর করা সম্ভব হবে।’

রেলওয়ে সূত্র বলছে, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় দেশে ৮৫৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন ও ১ হাজার ১৮১ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণ এবং ৭২৫ কিলোমিটার পুনর্বাসন, রেল সেতু ও লেভেল ক্রসিং গেইট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া ইতোমধ্যে সিমুলেটর, রিলিফ ক্রেন, বেশ কিছু লোকোমোটিভ ও বগি সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই সাথে বগি সংস্কারের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ৪৪টি জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরো ১৫টি জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতুর উজানে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন বিশিষ্ট পৃথক রেলওয়ে সেতু নির্মিত হচ্ছে। সেতুটি নির্মিত হলে গতির পাশাপাশি ট্রেন সংখ্যাও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে ট্রান্স এশিয়ান রেল লিংক-১ এর আওতায় দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার এবং রামু-গুনদুম (মিয়ানমার সংলগ্ন) পর্যন্ত মোট ১২৯.৫৮৩ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন নির্মিত হচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে খুলনা-মংলা ব্রড গেজ লাইন নির্মাণ, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী, আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজে রূপান্তর এবং আখাউড়া-লাকসাম সেকশন ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন সংক্রান্ত প্রকল্পসহ মোট ৩৯টি প্রকল্প বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ, দর্শনা-গেঁদে, বেনাপোল-পেট্রাপোল এবং বিরল-রাধিকাপুরসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেল সংযোগের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। তাছাড়া আখাউড়া-আগরতলা, কুলাউড়া-শাহবাজপুর, চিলাহাটি-হলদিবাড়ী সেকশনে সিঙ্গেল ট্র্যাক স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করবে।

এসব নতুন রুটের জন্য যে ইঞ্জিন, বগিগুলো লাগবে, তা কোথায় পাওয়া যাবে? আনা হবে ভারত ও চীন থেকে। ১২০০ একর জমির উপর ১৯৮৭ সালে পাঞ্জাব প্রদেশের কাবুর থালায় যে রেলওয়ে কারখানা ভারত সরকার স্থাপন করে তা প্রতিবছর দেড় হাজার বগি উৎপাদন করে, যা ঘন্টায় ২০০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। ১৮৭০ সালে ১১০ একর ভূমির উপর বাংলাদেশের সৈয়দপুরে রেল কারখানা প্রতিষ্ঠিত হলেও আজ পর্যন্ত তার আধুনিকায়ন হয়নি। উল্টো যা যন্ত্রপাতি আছে তা ব্যবহার না করায় নষ্ট হতে চলেছে। পাহাড়তলী কারখানায়ও একই অবস্থা।

রেলওয়ের তথ্যমতে, সৈয়দপুর রেল কারখানায় মেশিন আছে ৭৪০টি। বয়স ৮০-১৪০ বছর। পাহাড়তলীতে রেলের কারখানায় আছে ৪৩১টি মেশিন। সেই মেশিনগুলোর বয়সও ৫০-৬০ বছর। ১৪০ বছরের পুরোনো ক্যারেজ শপ, কালার শপ ও ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন মেশিন শপে কোচ মেরামত হচ্ছে। বগি পারাপারে ব্যবহৃত হচ্ছে ৮৭ বছরের পুরোনো বৈদ্যুতিক ট্রাভারসার। সৈয়দপুর, পার্বতীপুর ও পাহাড়তলীতে লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। অথচ সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় বাজেট, জনবল, কাঁচামাল ও আধুনিক মেশিন থাকলে বিপুলসংখ্যক বগি ও ওয়াগন তৈরির পাশাপাশি রপ্তানিও করা যেত।

এদিকে ২০ বছর মেয়াদী যে রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে ২৩৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার কথা। মাস্টারপ্ল্যানের লক্ষ কোটি টাকা থেকে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার আধুনিকায়নে মাত্র ১২২ কোটি ২২ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। পাহাড়তলী রেল কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০০৭ সালে জাপানের জেবিআইসি ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকার মিলে ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে যে পুনর্বাসন প্রকল্পটি নিয়েছিল তার কাজই শুরু হয়নি। ১৯৯২ সালের ১৪ মে পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হলেও ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির সুযোগ রাখতেই মূলত এভাবে রেলের কারখানাগুলো অকার্যকর করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বিভিন্ন সময়ে রেলের কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে সংসদীয় কমিটি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনেও রেলের অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে রেলমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রেলের দুর্নীতির বড় উৎস কেনাকাটা। এর মধ্যে ওয়াগন, কোচ, ইঞ্জিন, ডেমু ট্রেন ক্রয় উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে করা রেলপথে ডাবল লাইন ও মিশ্র গেজের লাইন নির্মাণ প্রকল্পেও দুর্নীতি হয়েছে। রেলের নিয়োগেও অনিয়ম-দুর্নীতি বিপুল। এ ছাড়া রেলের কারখানাগুলোতে যন্ত্রাংশ ক্রয় ও পুরোনো যন্ত্রাংশ বিক্রির সময় ব্যাপক দুর্নীতির কথা জেনেছে দুদক। ঠিকাদারেরা চুক্তি অনুসারে রেললাইনে পাথর না ফেলেই বিল নিয়ে যান। এ থেকে রেলের কর্মকর্তারাও ভাগ পান।’

এসব বিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘কেনাকাটা ও ব্যয়ের বিষয়ে মাঝে মধ্যে অভিযোগ আসে। তখন নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।’