শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

গার্মেন্টসকর্মী যখন রেলের কর্মকর্তা!

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ২৯, ২০২১, ৮:২১ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : রেলওয়ে স্টাফদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসাগুলো ভাড়া দিয়ে বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্টাফসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। নিয়ম-বহির্ভূত এসব কর্মকাণ্ড জেনেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন দেখা যায়, রেল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে অনেকেই আবার এসব বাসা ভাড়া দিচ্ছেন তৃতীয় একটি পক্ষকে। এছাড়া কলোনীর বিভিন্ন খালি জায়গাতে অবৈধভাবে বসতি ও দোকানপাট নির্মাণ করে সেগুলো ভাড়া দেয়া হচ্ছে।

তথ্যমতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন চট্টগ্রামে ৩০টি কলোনীতে রয়েছে চার ক্যাটাগরিতে মোট ৫ হাজার ৩২৯টি বাসা। যার মধ্যে ১৫৩টি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের, ২৩৭টি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের, দুই হাজার ২৫৫টি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের এবং দুই হাজার ৬৮৪টি বাসা রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য।

পূর্ব টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনীর ২৩টি কোয়ার্টারের প্রায় ৭৩৬টি ঘর রয়েছে। এসব ঘরগুলো রেলওয়ে কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর প্রত্যেকটিতে বসবাস করছেন বহিরাগত ভাড়াটিয়ারা।

ছদ্মবেশে এই কলোনির ১৭/৩ নম্বর ভবনের চার তলার একটি বাসায় গিয়ে ঘর ভাড়া দেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে বাসায় অবস্থানরত এক ব্যক্তি জানান, তিনি বাসাটি গত ২ বছর আগে ভাড়া নিয়েছেন। রেলওয়ের কর্মকর্তা না হয়ে তিনি যে শুধু বসবাস করছেন তা নয়, নিজে ভাড়া নিয়ে তিন রুমের দুই রুম আবার অন্যদের ভাড়ায় দিয়েছেন। এই মুহূর্তে রুম খালি নেই। তবে এই কলোনির ১৮/৩, ২০/১, ২৩/৪ সহ বেশ কয়েকটি ভবনের বাসা ভাড়া দেওয়া হবে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮/৩ নম্বর বাসার নিচতলায় গিয়ে বাসা ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সালেহা আকতার নামে এক মহিলা বলেন, বাসা ভাড়া দেওয়া হবে। তবে এক সিট (এক খাট পরিমাণ জায়গায়) হলে দেড় হাজার টাকা আর সম্পূর্ণ রুম নিলে ৫ হাজার ভাড়া দিতে হবে।

এসময় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ যাবতীয় সকল বিষয় তিনি নিজে দেখবেন বলেও অভয় দেন। ঘরের আসল মালিকের সাথে দেখা করতে চাইলে তিনি হাস্যরস করে বলেন, ঘরের মালিক তো রেলওয়ে! এই ঘরের মালিক বলেন আর কেয়ারটেকার বলেন সবই আমি। এই কলোনির একটা ঘরেও আসল মালিক নেই। সব ঘরই ভাড়া দেওয়া।

অন্যদিকে, আমবাগান কলোনীর ঞ/৫৮ বাসাটি চট্টগ্রাম রেলওয়ের বিভাগীয় প্রধান সহকারী ফয়েজ মাস্টারের জন্য বরাদ্দ হলেও তিনি নিজের বাসার সামনের জায়গায় তৈরি করেছেন বেশকিছু সেমিপাকা ঘর। ১ রুমের ৫ বাসার প্রতিটি মাস প্রতি সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে ভাড়া দিয়েছেন।

ফয়েজ মাস্টারের সেই সেমিপাকা ঘরে বিগত ৫ মাস ধরে ভাড়া থাকেন শাকি আকতার। একুশে পত্রিকাকে তিনি জানান, প্রতিমাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকেন। পানি আর বিদ্যুৎ-এর জন্যও চিন্তা করতে হয় না। সব কিছু ফয়েজ মাস্টারই ব্যবস্থা করে দেন।

মোকলেসুর রহমান নামে একজন ব্যবসায়ী বলেন, গত ৭-৮ মাস ধরে এই বাসা ভাড়া নিয়েছি। শহরে একা থাকি আর ব্যবসার কাজও এই এলাকার আশেপাশে তাই। ভাড়া প্রতি মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

এসময় ফয়েজ মাস্টারের সবচেয়ে পুরোনো ভাড়াটিয়া আয়েশা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, তার বাসাটি দুই রুমের হওয়ায় ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয় তাকে। গত দেড় বছর ধরে তিনি এখানে থাকেন।

এসময় রেল-কর্মকর্তা ফয়েজ মাস্টারের বাসায় খোঁজ করলে তাকে বাসায় পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা জানিয়ে মুঠোফোনে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এখন আমি অফিসের কাজে ব্যস্ত আছি। সন্ধ্যার পর কল করেন। তখন এই বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলবো।

পরবর্তীতে এই কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাসা নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি একুশে পত্রিকার কাছে স্বীকার করেন।

তিনি জানান, আড়াই বছর আগে এই বাসাগুলো নির্মাণ করেছেন। সেখান থেকে ১৫-২০ হাজার টাকা ভাড়া পান। তবে শুধু তিনি নন, ওই কলোনির আরো অনেকেই রেলওয়ের জায়গায় অবৈধভাবে বাসা নির্মাণ করে সেগুলো ভাড়া দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকটা বাধ্য হয়ে আমাকে এই বাসাগুলো নির্মাণ করতে হয়েছে। বিগত সময়ে বেশ কিছু ছেলে-লিমনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভয় দেখিয়ে আমার বাসার সামনের জায়গাগুলো দখল করতে চেয়েছিল। তারা যাতে দখল নিতে না পারে আমি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে সেগুলো দখল করেছি।’

কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রতিবেদককে প্রতিবেদনটি না করার অনুরোধও করেন ফয়েজ মাস্টার।

এদিকে, একই কলোনির অন্য একটি কোয়াটারে ‘ঘর ভাড়া দেওয়া হবে’ এমন একটি হাতে লেখা নোটিশ চোখে পড়ে প্রতিবেদকের। ভেতরে ঢুকে ঘর ভাড়া দেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে এক মহিলা প্রশ্ন করেন, কী ধরনের ঘর লাগবে। এসময় ঘরগুলো দেখতে চাইলে সেই মহিলা ভেতরের কিছু ঘর দেখাতে নিয়ে যান। ঘরগুলো সেমিপাকা। একই সারিতে ১৩টি ঘর ভাড়া দেওয়া হবে জানিয়ে প্রত্যেকটি ঘর প্রতিবেদককে ঘুরিয়ে দেখানো হয়।

একপর্যায়ে ঘর ভাড়া নেওয়ার জন্য ঘরের আসল মালিকের সাথে কথা বলতে চাইলে সেই মহিলা উত্তেজিত হয়ে বলেন, বাসা ভাড়া নিতে আসছেন বাসা দেখেন। মালিক দিয়ে লউ করবেন? এরইমধ্যে এক ব্যক্তি এসে বলেন, আমি এই ঘরের মালিক। লউ জানতে চান বলেন? ‘বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে আসল মালিককে তার পরিচয় জেনে তবেই কথা ফাইনাল করবো’- প্রতিবেদকের এমন কথায় চটে গিয়ে সেই ব্যক্তি বলেন, আমি রেলওয়ের লোক, আর এই বাসা আমি ভাড়া দিচ্ছি। এর বেশি কিছু আপনার জানার দরকার নেই।’

এধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কিছু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে যারা সাবলেট ভাড়া দেয়। কিন্তু সাবলেট দেওয়ার জন্য তো তার নামে বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, নিজে থাকার জন্য দেওয়া হয়েছে। এখন কেউ যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকে তাহলে অবশ্যই তা অবৈধ।’

তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী যাদের জন্য বাসাগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদেরই থাকতে হবে। তবে যে কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনটা করছেন তাদের তালিকা তৈরি করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিগত জিএম ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেসময় অনেক অবৈধ স্থাপনাও রেলওয়ে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে গেলে উল্টো আমাদের উপর প্রেশার আসে। বিভিন্ন প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা এসব কাজে আমাদের বাধা দেন।’