শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

শাহাদাতের বিরুদ্ধে লুসির অভিযোগ, জানতে চাওয়ায় একুশের বিরুদ্ধেও মামলার হুমকি

প্রকাশিতঃ বুধবার, মার্চ ৩১, ২০২১, ১:৫৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও অপহরণের মামলা করে আলোচনায় এসেছেন বিএনপি নেত্রী ডা. লুসি খান। তার দাবি, চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের সময় কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছেন শাহাদাত। পরে ৫ লাখ টাকা শাহাদাতের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণায় খরচ করেন তিনি।

যদিও লুসির ভাষ্যমতে, তার কাছে বিভিন্ন ব্যাংকসহ অনেকেই লাখ লাখ টাকা পাচ্ছেন। পাওনা আদায়ের জন্য লুসির বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। আর্থিকভাবে বেকায়দায় থাকা একজন নারীর কাছ থেকে শাহাদাতের কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগটি কতটুকু সত্যি-এই প্রশ্ন চলেই আসে।

জানতে চাইলে লুসি খান এলোমেলো কথা বলেন, নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। একবার বলেন, তার এনজিও’র সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীকে অপহরণ করেছেন শাহাদাত ও তার চাচা-চাচি। আবার বলেন, মহিউদ্দিনের অপহরণের ঘটনায় তার স্ত্রীর জিডি করতে চান না, এ ঘটনায় তারও হাত আছে। লুসি খানের দাবি, মহিউদ্দিনের স্ত্রী তাকে বলেছেন তিনি বিদেশ চলে গেলে তার স্বামী ফিরে আসবে।

এসব বিষয়ে নানা অসংলগ্ন তথ্য আসায় বিস্তারিত জানতে চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ মহিলা বিষয়ক সম্পাদক লুসি খান। একপর্যায়ে একুশে পত্রিকার বিরুদ্ধেও মামলা করার হুমকি দিয়ে বসেন তিনি।

এর আগে গত ২৪ মার্চ চকবাজার থানায় ডা. শাহাদাত হোসেনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন লুসি খান। বাকি দুই আসামি মোজাফফর ও ফাতেমা নামের দুই ব্যক্তি ডা. শাহাদাতের চাচা ও চাচি বলে দাবি করেন লুসি খান। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিরা কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছেন এবং মহিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করেছেন।

মহিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ‘জীবনচিত্র’ নামের একটি এনজিও’র সচিব। ওই এনজিও’র চেয়ারম্যান লুসি খান। মহিউদ্দিন নগরের কোতোয়ালী থানা বিএনপির কমিটিতে একটি সম্পাদকীয় পদে আছেন। নগরের ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় তাদের নিজস্ব বাড়ি আছে; মহিউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে।

এদিকে অপহরণ ও চাঁদাবাজির উক্ত মামলায় গত সোমবার সন্ধ্যায় ডা. শাহাদাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ মামলায় শাহাদাতকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। এ প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সকালে আলাপচারিতার শুরুতে লুসি খানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, মামলায় ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ করা হয়েছে?

লুসি খান বলেন, ‘ডা. শাহাদাত আমার এনজিও সেক্রেটারিকে শুধু আটকায় রাখে, টাকা চায়। ইলেকশনের সময় আমাকে বলেছে, টাকা দাও। তোমার এনজিও থেকে এক কোটি টাকা এনে দাও। এখন আমার এনজিও সেক্রেটারি মহিউদ্দিন গায়েব। এখনও নাই তিনি। মহিউদ্দিনকে প্রতিমাসে এক সপ্তাহের জন্য কিডন্যাপ করে আবার ছাড়ে। গত শনিবার (২০ মার্চ) আবার নিয়ে গেল।’

ডা. শাহাদাতের টাকা চাওয়ার কারণ কী? আর এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য আপনার আদৌ আছে কিনা জানতে চাইলে লুসি খান বলেন, ‘ইলেকশন করার জন্য ডা. শাহাদাত টাকা চেয়েছিলেন। যেহেতু আমিও দাঁড়াইছি (মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন) আমার কাছে টাকা না থাকলে কী আমি দাঁড়াইছি; বিষয়টা হচ্ছে এটা। মনোনয়ন আমি পেলে আমাকে পয়সা খরচ করে নির্বাচন করতে হতো না? তাই এক কোটি টাকা চেয়েছিল।’

চাঁদা দাবির ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ দপ্তর সম্পাদক ইদ্রিস আলীর সংশ্লিষ্টতা আছে দাবি করে লুসি খান বলেন, ইদ্রিস আলীও চাঁদা চেয়েছিল। আমি তার কথা ভুলে গিয়েছিলাম তাই মামলায় আনতে পারিনি। ইদ্রিস আলী বলে যে আমার এনজিওতে সচিব মহিউদ্দিনের কাজ কী, তাকে বিদায় করে দাও। সেই পদে আমাকে ঢুকাও। ইদ্রিস বলেছে, আমাকে আর শাহাদাত ভাইকে এককোটি টাকা দেন। মহিউদ্দিনকে বাদ দেন। আমরা চালাবো। আমরা এনজিওটা দেখবো, যাবতীয় কাজ যা মহিউদ্দিন করে তা আমি করবো। যখন মহিউদ্দীন গায়েব ছিল তখন এসব বলছে। চাঁদা চেয়েছে। আমি এসব ভুলে গেছি, এখন আপনার সাথে কথা বলে মনে পড়ছে। আমার সচিব যদি কোনোভাবে উদ্ধার হয় ওই মামলাতে তাকে (ইদ্রিস) কোনোভাবে ঢুকাবো।’

লুসি খান বলেন, ‘উনারা আসলে আমার এখন থেকে কিছু চেকও নিয়ে গিয়েছিলো। এগুলো অনেকদিন ধরে হচ্ছে, আজকে একদিন ধরে হচ্ছে তা নয়। গতবছর ইলেকশন হওয়ার কথা ছিল, তারপর থেকে এসব করতেছে। অগাস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর; তখনও মহিউদ্দিনকে নিয়ে গিয়েছিল। তখন আমার চেম্বারে মোজাফফর ও ফাতেমা নামে দুজন মানুষকে পাঠিয়েছিল শাহাদাত ভাই। এই দুইজনের মধ্যে ফাতেমাটা একটু বলিষ্ঠ মহিলা। আমি মনে করেছি, রোগী এসেছে। কিন্তু না। আমি কাগজ কলম বের করতে করতে আমাকে চেপে ধরে ঘুষি-টুসি মেরে দেয়। ওর জামাইটাও দেখতে ডাকাতের মতো, সন্ত্রাসী।

মোজাফফর-ফাতেমা এরা ডা. শাহাদাতের চাচা-চাচি। এবং একই বাড়িতে থাকে। ওদের তিনজনের আইডি কার্ডের স্থায়ী ঠিকানা একই- শাহাদাত, মোজাফফর, এবং ফাতেমা। তারা চারটি চেক নিয়ে গেছে। পরে এগুলো ক্যাশ করার জন্য আমার এনজিও সেক্রেটারিকে নিয়ে যায়, আমি মামলা করবো বললে আবার ছেড়ে দেয়। ওই চেকে সিগনিচার করে নিয়েছে আমার। অ্যামাউন্ট বসাইনি, তাই এক কোটি টাকা চাচ্ছে।’

লুসি খান বলেন, আমি গত শনিবার, রোববার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মহিউদ্দিনের ফিরিঙ্গিবাজারের বাসায় প্রতিদিন গেছি। উনি আছে কী নেই, জানার জন্য। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থাকতাম। আমি রাত দেড়টা বাজে আসছি এরকমও দিন আছে। উনাকে নিয়ে কোথায় রাখে এটা আমি বলতে পারি না। নিয়ে গিয়ে পায়ের নখ তুলে ফেলছে, কয়েল দিয়ে সেঁক দিছে, সিগারেট টেনে সেঁক দিছে মোজাফফর, মাথার দুই পাশে নাকি স্কেল দিয়ে মারছে। তখন পুরো শরীরে দাগ মোটামুটি। গতবার যখন ছাড়া পেয়েছিলো তখন আমি উনাকে মেডিকেল সার্টিফিকেট নিতে বলছিলাম।’

মহিউদ্দিনকে এ পর্যন্ত কতবার অপহরণ করে নিয়ে গেছে? জানতে চাইলে লুসি খান বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে নিয়ে যাচ্ছে এভাবে। ২০১৮ সাল থেকে মোজাফফর ও ফাতেমা নিয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কে নিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে ডা. শাহাদাত ভাইয়ের স্বীকারোক্তিতে বুঝলাম যে শাহাদাত ভাই নিয়ে যাচ্ছেন। কারণ শাহাদাত ভাইয়ের রেকর্ডিং আছে আমার কাছে। শাহাদাত ভাইকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছিলাম যে, মোজাফফর-ফাতেমা নামের কাউকে চিনেন কিনা, যারা আমার এনজিওর সেক্রেটারিকে বারবার কিডন্যাপ করতেছে। তখন শাহাদাত ভাই বলেছে, না, কোন মোজাফ্ফর? কোন ফাতেমা? আমি বলেছি আপনাদের বাড়িতেই থাকে, আপনাদের এড্রেসেই থাকে। আমার সেক্রেটারিকে একবার এনজিও অফিস থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো, আমি গিয়ে দিদার মার্কেটের ওদিকে একটা কেডিএস গলির আমেরিকান টাওয়ারের বাসা থেকে ছেলে-পেলে নিয়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। পরে এই ঠিকানার বাসাটা তারা ছেড়ে দিয়ে শাহাদাত ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে থাকে।’

‘শাহাদাত ভাই বলে যে, না না আমরা পলিটিশিয়ান মানুষ, আমাদের কতজনে চিনে, নাম বেচে। আমি শাহাদাতের মাকে ফোন দিছি। উনিও স্বীকার করেননি। বলেছে আমার ছেলে মন্ত্রী মানুষ, আমার ছেলেরে কতজনে চিনে। অনেকদিন পরে নভেম্বর, ডিসেম্বরের দিকে এসে আমাকে শাহাদাত বলতেছে, তোমার এনজিওর ওই সেক্রেটারি ছেলে এতবড় ফ্রড, সে আমার একটা আত্মীয়ের জায়গা খেয়ে ফেলছে। আত্মীয়ের নাম মোজাফফর, ফাতেমা। আমি বলছি, আমি এতদিন জিজ্ঞেস করছি, বলছেন চিনেন না। এখন আপনার বাপ হয়ে গেছে। আমার কাছে এগুলোর রেকর্ডিং আছে। আমি অনেক গালাগালি করছি উনারে (শাহাদাতকে)। এরপরে ওপেন হয়ে গেছে, আগে তো লুকায় লুকায় (অপহরণ) করতো।’

লুসি খান জানান, মোজাফ্ফর ও ফাতেমার গ্রামের বাড়ি চন্দনাইশে। তারা আগে দেওয়ান বাজারের দিদার মার্কেটের কেডিএস গলির আমেরিকান টাওয়ারের তিনতলায় থাকতেন। সেখান থেকে একবার মহিউদ্দিনকে উদ্ধার করেছেন তিনি। প্রথমদিকে মহিউদ্দিনকে কিডন্যাপ করে মোজাফফর-ফাতেমার বাসায় রাখা হতো।

লুসি খান বলেন, ‘দেওয়ান বাজারের ওই বাসা থেকে মহিউদ্দিনকে একবার উদ্ধারের পর তারা ওই বাসাটা ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকা শুরু করেছে। তখন আমি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে একটা চিঠি দিয়ে বলছিলাম যে, আমার মানুষটাকে একটু উদ্ধার করুন, এ ঘটনা, শাহাদাতের বাড়িতে থাকে। ১৭ জানুয়ারি এই আবেদনটি দিয়েছিলাম মহাসচিবকে।’

‘জীবনচিত্র’ নামের যে এনজিওটি লুসি খান পরিচালনা করেন, সেটির অফিস করা হয়েছে নগরের চকবাজার থানাধীন তেলিপট্টি মোড় এলাকায়। এনজিওটির ব্যানারে বিভিন্ন সময় ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। লুসি খানের দাবি, তার এনজিও’র লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে ১৯৯৬ সালে। তবে এনজিও ব্যুরোর লাইসেন্স নেই প্রতিষ্ঠানটির।

লুসি খান বলেন, ‘এটা (জীবনচিত্র) রেজিস্ট্রেশন করা আছে ১৯৯৬ সালের। আমি ব্যুরো লাইসেন্স নিইনি চাঁদাবাজির ভয়ে। নাহলে ব্যুরো লাইসেন্স নিলে লুসি খানও কোটিপতি হইতাম। মোরশেদ ভাই (সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান) আমার ফুফাতো ভাই, একে খান (একে খান এন্ড কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা) আমার জেঠা। এম. সাইফুর রহমান (সাবেক অর্থমন্ত্রী) আমার ফুফাতো বোনের জামাই। এভাবে না হলে ২০-২৫ জন আছে। শাহাদাত ভাই একজন যে, ওয়ানম্যান শো। আমি মেয়রের নমিনেশন চাওয়ার পর থেকে উনি আমাকে জ্বালাচ্ছে। শাহাদত সৎ মানুষ নয়, ওর বউ এমনে পালাইছে নাকি? অত্যাচারে পালাইছে। উনি মানুষজন, পোলাপাইন লাগাই দিছে আমার বিরুদ্ধে বলার জন্য, আমি জামাইয়ের সাথে থাকি না, জামাই আমার সাথে থাকে না। আমি এমন, আমার এই সমস্যা, ওই সমস্যা। পুলিশ প্রটেকশনের জন্য কিছু করতে পারতেছে না তো, তাই পোলাপাইন লাগাই দিছে।’ আপনার নিরাপত্তায় পুলিশ থাকে কিনা- এমন প্রশ্নে লুসি খান বলেন, ‘ওইভাবে প্রোটেকশন নেই, তারপরেও ওরা জানে যে আমার এখানে আসলে, আটক করে পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার মানুষটা উদ্ধার হোক, এটাই চাই। সচিব মহিউদ্দিনের বউয়ের বাসায় গেছিলাম, বউ বলতেছে যে আপনি বিদেশ চলে গেলে আমার স্বামী এমনে এমনে চলে আসবে। তখন আমার মনে হইছে সে এ ঘটনায় যুক্ত। তখন বলেছি, ঠিক আছে, আমার টাকাগুলো দিয়ে দিতে বলো। ওর কাছে তো আমার পাথরের টাকা আছে, বিভিন্নভাবে টাকা পাই আমি ওনার থেকে। এগুলো তো তুমি খাইছো, তুমি দিয়ে দিলে আমি চলে যাব। ওর বউয়ের হাত আছে। আমি সকাল দশটা এগারোটায় যেতাম আসতাম রাত দেড়টা একগ্লাস পানিও দেয়নি ওর বউ। বউ বলতেছে, আমার সাথে কোনও যোগাযোগ নেই তার। আমি ফোন দিলে ধরে না। তখন আমি বলেছি আপনি তাহলে জিডি করেন। ২৪ ঘণ্টার বেশি হলে তো জিডি করা উচিত একটা মানুষের। বললো যে, উনার নামে জিডি করে কোনো লাভ হবে না। উনি মাঝেমাঝে এরকম গায়েব হয়।’

মহিউদ্দিনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে লুসি খান বলেন, ‘মোজাফফর, ফাতেমা, শাহাদাত ও মহিউদ্দীনের বউয়ের একটা খেলা হতে পারে।’ মহিউদ্দিন নিজের ইচ্ছায় আত্মগোপনে আছে এমনও তো হতে পারে- প্রসঙ্গটি তুললে লুসি খান বলেন, ‘নিজের ইচ্ছায় মহিউদ্দিন আত্মগোপনে আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। কারণ পায়ের নখ, গালের মাংস তুলে ফেলছে মহিউদ্দিনের, শরীরে কয়েল দিয়ে জ্বালাই দিছে। একটা মানুষ নিজেরে নিজে এতো ক্ষতি করতে পারে না। উনাকে এমনি ছেড়ে দেয় না, উনাকে হুমকির মধ্যে রাখে।’

ডা. শাহাদাতকে কখনো টাকা দিয়েছিলেন কিনা- প্রশ্নে লুসি খান বলেন, ‘শাহাদাত আমাকে দিয়ে ডিজিটাল কর্ণারে পে করাইছে। আমাকে দিয়ে ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে পে করাইছে। পাঁচ লাখ টাকার উপরে পে করছি আমি তার নির্বাচনে। যখন বলছি আমি আর পারবো না তখন বলছে তোমার আত্মীয় মোরশেদ খান থেকে এনে দাও। তারপর বলে যে একে খানের ছেলে থেকে এনে দাও। আমি একটা অক্ষরও মিথ্যা বলি নাই। আমি উনারে (শাহাদাতকে) বাপ ডাকছি। বলছি বাপ, আমার মানুষটারে ছাড়ি দাও, আর আমার সাথে কোনো লেনদেন থাকলে এসে বসে সেটাপ করো।’

শাহাদাতের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন আছে কিনা প্রশ্নে লুসি খান বলেন, ‘কেন লেনদেন থাকবে না, শাহাদাতের বাড়ির পাশে আমার জায়গা আছে, ওই জায়গার দলিলপত্র সব উনার কাছে। আমি তো সব লিখি নাই মামলাতে। আমি জিডি করেছি ছোট্ট একটা ইস্যু নিয়ে, টাকা দিলে আমার মানুষটাকে ছেড়ে দিবে। এই দুইটা জিনিসের উপর করছি। বাকি আমার পাথর আটকায় রাখছে, চেক নিয়ে গেছে। উনি আমার পঁচাত্তর লাখ টাকা নিয়ে গেছে। আমি ইমপোর্ট করতে টাকা খরচ করছি। ইন্দোনেশিয়ান পাথর ইমপোর্টের জন্য। পঁচাত্তর লাখ ইনবেস্ট করে ইন্দোনেশিয়া থেকে যে পাথর ইমপোর্ট করছি ওইগুলা শাহাদাতের বাড়িতে। তার বাড়ির আশেপাশে কোথাও নিয়ে গেছে সে। শাহাদাত, মোজাফফর, ফাতেমা- এ তিনজন আছে আমি জানি। এগুলো আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরের দিকের ঘটনা। অক্টোবরে আমার ওয়ারেন্ট বের হয় যার কারণে তারা খুব সুবিধা পায় যে, আমি চট্টগ্রামে নেই, আমার সবকিছু ওরা হাতায় নিবে।’

কেন আপনার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হয়েছিল এমন প্রশ্নে লুসি খান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হওয়ার কারণ, এনজিও সেক্রেটারিকে ধরে রাখে মানুষে টাকা পায়, আমি টাকাগুলো দিতে পারি না। এগুলো তো লোন করে করে করছি, নিজের পকেট থেকে তো দিয়ে করি নাই। আমি যে পাথর আনাইছি, ব্যাংক একটা শেয়ার দিছে না, আমি লুসি খান থেকে ব্যাংকে টাকা পায়। ব্যাংক থেকে নিছি, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে নিছি। তারা টাকা পায়। আপনি এতো ডিটেইলস কেন চাচ্ছেন? আপনি এভাবে কথা বলতে পারেন না, এভাবে কথা বললে আপনার নামেও মামলা হবে।’ একপর্যায়ে এভাবেই উত্তেজিত হয়ে হুমকির সুরে একুশে পত্রিকা প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন লুসি খান।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক পদে থাকা ডা. শাহাদতের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অপহরণ মামলা হওয়ায়, এ বিষয়ে মানুষের জানার আগ্রহ আছে। এ প্রেক্ষিতে একজন পেশাদার সংবাদকর্মী হিসেবে ঘটনার বিষয়বস্তু বিস্তারিত আমরা জানতে চাইতেই পারি। বিস্তারিত জানাতে না চাইলে আপনি সেটা জানিয়ে বিরত থাকবেন। তাই বলে সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করবেন কেন? এসব বলার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন লুসি খান।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ দপ্তর সম্পাদক ইদ্রিস আলী পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনি যা বলছেন, এসব কথা কী লুসি খান আসলেই বলেছেন? হ্যাঁ- বলার পর ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ও মাই গড।’

ঘটনার বিষয়ে ইদ্রিস আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, সিটি নির্বাচনের আগে লুসি খান আমাকে ফোন করে বলেন, তার সচিব মহিউদ্দিন বিপদে পড়েছে, তাকে নাকি কারা অপহরণ করেছে। অপহরণকারীরা তার এনজিও’র টাকা খেয়ে ফেলতে চায়। এখন এ বিষয়ে শাহাদাত ভাইয়ের হেল্প চান তিনি। আমি যেন শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে একটু কথা বলিয়ে দিই। তখন আমি শাহাদাত ভাইয়ের বাসায় গিয়ে লুসি খানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিই।

তিনি বলেন, ‘এর আগে শাহাদাত ভাইকে বলেছি, লুসি খানের নাকি কী বিপদ। তার সচিব মহিউদ্দিনকে কারা যেন অপহরণ করেছে টাকার জন্য। মহিউদ্দিন আমাদের কোতোয়ালী থানা বিএনপির একটা পদে আছে, ভালো ছেলে। মহিউদ্দিনকে কারা অপহরণ করেছে সেটা বলে না। তখন আমার ফোন থেকে শাহাদাত ভাই লুসির সঙ্গে কথা বলেন। লুসি তোমার কী বিপদ হয়েছে, তোমার কী সমস্যা? পরে শাহাদাত ভাই দুষ্টুমি করে বলেন, তোমার এনজিওতে কত টাকা এসেছে, তখন লুসি খান বলেন, পাঁচ কোটি টাকা। তখন শাহাদাত ভাই বলেন, এই টাকাগুলো তুমি কী করবে, আমাকে জমা দিয়ে দাও। হাসাহাসি করে কথাগুলো বলেছিলেন শাহাদাত ভাই। তখন কয়েকজন সাংবাদিকও উপস্থিত ছিলেন।’

‘লুসি খানের কথাগুলো আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, অসংলগ্ন কথাবার্তা। তবুও শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছি। শাহাদাত ভাই ফোনে লুসিকে বলেন, তুমি এগুলো কী বলতেছ, কী হয়েছে। সেদিন শাহাদাত ভাই কিছু বুঝতে পারছিলেন না। তখন আমাকে বলেছেন, তুমি দেখো তো, কী সমস্যা। এরপর আমাকে লুসি খান ফোন করেন। এই উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করেন।’

‘আমি বলেছি, মহিউদ্দিনকে অপহরণ করা হলে তার পরিবার মামলা করবে, আপনি কেন মামলা করবেন। তিনি বুঝেন না, অসংলগ্ন কথা বলেন। আমার মাথা খেয়ে ফেলেছে, কিছু বুঝেন না। লুসি খানের কথাবার্তা, আচরণে মনে হয়, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি কী চান নিজেও জানেন না। তিনি হতাশায় ভুগছেন। কোন একটা সমস্যায় আছেন। পারিবারিকভাবে অশান্তিতে আছেন। কখনো বলেন, বিদেশ চলে যাবেন। তিনি যে মানসিকভাবে অসুস্থ সেটা আপনি অল্প কথা বললে বুঝতে পারবেন না। বেশি কথা বললে তখন বুঝতে পারবেন। তখন আপনাকে উল্টাপাল্টা কথা বলবে। আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলেছে। মহিউদ্দিন না থাকায়, তিনি আমাকে বলেছেন ওনার এনজিও’র নিউজগুলো পত্রিকায় প্রকাশের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে। ওনার জীবনচিত্রের নিউজ, মহিউদ্দিনের বাবা মারা গেছেন, সেই নিউজ আমাকে দিয়ে করান, সেভাবে পরিচয়। পরে ওনার আচরণে বিরক্ত হয়ে আমি না পারতে বলেছি, আমাকে বাদ দিন, আমি পারবো না। সেখান থেকে আমি ছুটে গিয়েছি, সেগুলো এখন না, নির্বাচনের আগে। শাহাদাত ভাইয়ের সাথে ওনার যোগাযোগও নেই। আমার ফোন থেকে একবার কথা বলেছে শুধু।’

চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে ইদ্রিস আলী বলেন, শাহাদাত ভাইয়ের কী টাকার অভাব, প্রতিদিন এক-দুই লাখ টাকা খরচ করেন শাহাদাত ভাই। মানুষের উপকার করেন। চিকিৎসা দিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেন না। চিকিৎসার জন্য টাকা দেন। তিনি লুসি খানের কাছ থেকে টাকা চাইবেন- এটা বিশ্বাসযোগ্য? তিনি তো লুসির উপকার করতে, সহযোগিতা করতে ঘটনায় যুক্ত হয়েছিলেন। শাহাদাত ভাইকে এ ঘটনায় যুক্ত করেছি আমি। শাহাদাত ভাই জেল খাটতেছে আমার কারণে। আমি ওনার বাসায় গিয়ে লুসির উপকার করতে গিয়ে আমার মোবাইল দিয়ে কথা বলিয়ে দিই, তাও একবার। আর লুসি শাহাদাত ভাইয়ের অনুসারী, তারা দুইজনই ডাক্তার। শাহাদাত ভাই ওনাকে নগরের সহ মহিলা বিষয়ক সম্পাদক বানিয়েছিলেন। মেয়র পদে মনোনয়নপত্র নেয়ার জন্য শাহাদাত ভাইও সহযোগিতা করেছেন। শাহাদাত ভাইও চেয়েছিলেন, একটা নারী নেত্রী আসুক, মেয়র পদে পাঁচজনের নাম দেয়া হয়েছিল।’

মোজাফফর ও ফাতেমা- নামে ডা. শাহাদাতের কোন আত্মীয় আছে কিনা জানতে চাইলে ইদ্রিস আলী বলেন, ‘তারা শাহাদাত ভাইয়ের আত্মীয় কিনা তা জানি না। তাদের মধ্যে কী ঘটেছে তা আমি জানি না। মহিউদ্দিন কে, কী করে সেটাও আমি ভালো করে জানি না। লুসি খান আমাকে ফোন করে সহযোগিতা চেয়েছে, আমি সহযোগিতা করতে গিয়েছি এতটুকু। তার সাথে আমার দেখা হয়েছে এক বছর হবে মনে হয়। স্ববিরোধী কথাবার্তা বলার কারণে আমি পরে যোগাযোগ রাখিনি। দলের কারও সাথে লুসি খানের যোগাযোগ নেই। মানসিক রোগীর সঙ্গে কে কথা বলবে?’