শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

১০ দিনেও গ্রেপ্তার হননি নারী-পেটানো সেই আ.লীগ নেতা!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ২, ২০২১, ৭:২৬ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পদুয়ায় প্রকাশ্যে নারীদের পেটানোর ঘটনায় পলাতক সেই আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম বাদশা ১০ দিনেও গ্রেপ্তার হননি। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে আত্মগোপনে থাকা এ নেতা ভুক্তভোগীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখালেও প্রশাসন তার টিকিটিও ছুঁতে পারছে না। এ ঘটনায় প্রশাসনের নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়ে ওঠেছে সমালোচনার ঝড়।

ন্যায়বিচারের আশায় অভিযুক্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বাদশার বিরুদ্ধে রাঙ্গুনিয়া থানায় সবুরের দায়ের করা মামলার কোনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ ওঠেছে। উল্টো বাদশানিয়ন্ত্রিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যে সবুর ও তার পরিবারকে নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ।

এর আগে, গত ২৪ মার্চ জায়গা-জমি সংক্রান্ত এক বিরোধের জেরে নিরীহ দোকানদার আবদুস সবুর, তার স্ত্রী কুসুম আকতার, কন্যা ইসরাত রাফি ও মা রাফিয়া বেগমকে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন বাদশা এবং তার দুই কিশোরগ্যাং লিডার হৃদয় ও সোহেল। বাদশার তা-ব-বীভৎসতার ক্ষুদ্র এ অংশটি ধরা পড়ে ৫৮ সেকেন্ডের ছোট একটি ভিডিওতে।

একইদিন ভুক্তভোগীরা রাঙ্গুনিয়া থানার দ্বারস্থ হলে শুরুতে মামলা নিতে না চাইলেও অনেক কাকুতি-মিনতির পর ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষে মামলা গ্রহণ করে থানা পুলিশ। সেসময় মামলার দায়িত্ব নিয়ে নানা টালবাহানা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়সারা কর্মকাণ্ড  প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ঘটনার ৯ দিনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।

জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকলেও বাদশা গা ঢাকা দিয়েছে নিজ এলাকা উত্তর পদুয়াতেই। একই এলাকার বাসিন্দা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শওকত আলী নূরের বাড়িতে তার (বাদশা) রাত্রিযাপনের বিষয়টি এলাকাবাসীর কাছে অনেকটা ওপেন সিক্রেট।

বাদশাকে বাঁচাতে স্থানীয় ২নং ওয়ার্ডের মেম্বারের নেতৃত্বে একটি চক্র তৎপরতা চালাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্যে নারীকে পেটানোর ঘটনার ঠিক তিনদিন পর স্থানীয় পদুয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি বাদশা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের নেতৃত্বে একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। যেখানে ভুক্তভোগী সবুর ও তার পরিবারকে উদ্দেশ্য করে হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী আবদুস সবুর একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার এবং আমার পরিবারের উপর বাদশা ও তার কিশোর-গ্যাংয়ের অমানবিক অত্যাচারের পর গত ২৪ মার্চ মামলা করি। ১০ দিন হতে চললো, অভিযুক্তদের সবাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের কোনো তদারকি আমরা দেখলাম না। উল্টো বাদশা তার কিশোর-গ্যাং দিয়ে আমাকে নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছে। পরিবার নিয়ে আমি খুব শংকিত। পেশিশক্তির কাছে কী আইন এতো অসহায়? প্রশ্ন সবুরের।

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শিলক তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মুজিবুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গতকাল রাতে সবুরের সাথে আমার কথা হয়েছে। বাদী সবুরের কথায় মনে হলো তিনি কম্প্রোমাইজ করতে চান। এতটুকু আমি জানি। বাকিটা বাদীর সাথে কথা বলে জানতে পারবেন।’

পুলিশি-তদন্তের অগ্রগতি কী? এমন প্রশ্নে এসএই মুজিব বলেন, ‘বাদী-বিবাদী যদি কম্প্রোমাইজ করতে চায় তাহলে গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়ার কোনো সুযোগ তো থাকে না। আর অগ্রগতি বিষয়ে আমার সিনিয়র অফিসাররা যদি জানতে চায় আমি বলবো’-এ কথা বলে ফোন কেটে দেন তিনি।

রাঙ্গুনিয়া থানার ওসির অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুব মিল্কী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলা তদন্তের দায়িত্বে আছেন শিলক তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মুজিবুর রহমান। তার সাথে কথা বলে অগ্রগতির বিষয়ে জানানো যাবে।’

পরে বাদী সবুরের সাথে এসআই মুজিবের বক্তব্যের অমিলের বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, ‘তিনি (মুজিব) এমনটা বলতে পারেন না। এই বিষয়টি আমি নিজে দেখছি।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারি পুলিশ সুপার (রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেল) মো. আনোয়ার হোসেন শামীমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, এই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে আমি আপনাদের এতটুকু নিশ্চিত করছি যে খুব শিঘ্রই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমি নিজে বিষয়টি দেখছি।’

এদিকে যে জায়গাকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত, পরবর্তীতে স্থানীয় সাংসদ তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের ত্বরিৎ হস্তক্ষেপে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সেই জায়গাটি পরিমাপ করার উদ্যোগ নেন। গত ২৮ মার্চ সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু জাফর, নাছির উদ্দিন সেলিম ও প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানসহ নেতৃত্বস্থানীয়দের উপস্থিতিতে জমি পরিমাপ করে দেখা যায়, ৬ শতক (১৪ ফুট) জায়গা স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বাদশা অবৈধভাবে দখল করে মাছ চাষ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু জাফর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সবুর ও তার পরিবারের উপর হামলা করা বাদশার উচিত হয়নি। সে একজন লিডার। লিডার হয়ে সাধারণ মানুষের গায়ে হাত তোলা নিঃসন্দেহে অন্যায়। আর যে জায়গা নিয়ে বিরোধ হয়েছিল তার সমাধানের দায়িত্ব মন্ত্রী মহোদয় আমাকে দিয়েছিলেন। জায়গা পরিমাপ করে আমরা দেখতে পেয়েছি আইনত সবুরই এর আসল মালিক।’

জায়গাটি পরিমাপের ফলাফলের পর আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম বাদশার দীর্ঘদিনের অবৈধভাবে জায়গা ভোগের আসল গুমর ফাঁস হয়ে যায় এলাকাবাসীর কাছে। ভুক্তভোগী সবুরের জায়গা জোরপূর্বক দখল ও তার (সবুর) কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতসহ সবুরের পরিবারের উপর বাদশা ও তার বাহিনীর হামলায় ফুঁসে আছেন এলাকাবাসী।

এ ঘটনার পর এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, যে জায়গাকে ইস্যু করে অসহায় সবুর এবং তার নিরীহ মা ও স্ত্রীকে এতদিন হয়রানি করা হয়েছে, বেধড়ক পেটানো হয়েছে সেই জায়গার আসল মালিক সবুর। তাহলে সবুর ও তার পরিবারের প্রতি কেন এই অবিচার, এত হয়রানি? তার মানে কি দলীয় পদবিকে পুঁজি করে যে কেউ যা ইচ্ছা করতে পারবে?

পদুয়ার বাসিন্দা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. জাহেদ হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাদশা যে সবুরের পরিবারের উপর হামলা করেছেন এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ। এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও ক্লিপে হামলার বর্বরতা ফুটে ওঠেছে। এভাবে তো আর দেশ চলতে পারে না। এই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে আমি ঘটনাটির সুষ্ঠু বিচার চাই।’

পদুয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাদশার ক্ষমতা আছে, তাই বলে তো সে যা খুশি তাই করতে পারে না। একটি ক্ষমতাশীলচক্র বাদশাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। যার কারণে আমরা স্থানীয় শালিস বিচারের মাধ্যমে তেমন কিছু করতে পারছি না। আমরা যদি কিছু বলি হয়তো আমাদের উপর চাপও আসতে পারে। তাই প্রশাসনের মাধ্যমেই এই অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিচার হওয়া উচিত। কারণ অপরাধী যেই হোক না কেন তার শাস্তি পাওয়া দরকার।’