শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

সাজ্জাদের ডেরায় জিম্মি দুই ডজন তরুণী, বাধ্য হচ্ছেন পতিতাবৃত্তিতে!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ২, ২০২১, ৮:৩০ অপরাহ্ণ


জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার  : ‘আমি একুশে পত্রিকার একজন পাঠক, আপনাদের সংবাদে অনেকের উপকার হয়। প্লিজ আমাদের উপকার করেন। আমি একজন মেয়ে। কক্সবাজারের ডলফিনের মোড়ে ডায়নামিক এসএইচ রিসোর্ট-এর ২য় তলায় এরোমা থাই স্পা সেন্টারে কাজ করি। পেটের তাগিদে এখানে কাজ করতে আসি। পার্লারের কাজ করার কথা বলে আমাদের চাকরি দেয়।

কিন্তু রাত হলে মালিকের সাথে থাকতে বাধ্য করে। পরে ভিডিও করে রাখে। ভিডিও মানুষকে দেখাবে বলে বিভিন্ন ছেলে কাস্টমারদের স্পা করতে বাধ্য করে এবং বিভিন্ন কাস্টমারদের সাথে সেক্স করতে বাধ্য করে। এভাবে এখানে অনেক মেয়েকে দিয়ে স্পা সেন্টারের নামে দেহ ব্যবসা করছে।’

একুশে পত্রিকার কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে উক্ত কথাগুলো লিখেছেন একজন ভুক্তভোগী তরুণী। কক্সবাজারের ওই স্পা সেন্টারে ডজনখানেক তরুণীকে জিম্মি করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও একুশে পত্রিকার কাছে লেখা চিঠিতে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী তরুণী।

তরুণী আরও লিখেছেন, ‘রাতে স্পা সেন্টার বন্ধ থাকার কথা থাকলেও এটা রাত ১০টার পরও খোলা থাকে। চলে মাদক ব্যবসা। মেয়েদেরকে দিয়ে মাদক পরিবেশন করায়। এগুলো করতে না চাইলে মারধর করে, ভিডিও ফাঁস করে দিবে বলে ভয় দেখায়। বেতন আটকিয়ে রাখে।

বৃহস্পতিবার, শুক্রবার, শনিবার রাত তিনটা পর্যন্ত জলসা চলে। ডায়নামিক রিসোর্টের ম্যানেজারও এসবের সাথে জড়িত। এখানে অনেক পুলিশ আসে তাই পুলিশকে বলতে পারছি না। এক ভাইয়ের মাধ্যমে আপনাদের কাছে চিঠিটি পাঠালাম, যদি আপনাদের কাছে পৌঁছায় তাহলে আমাদের উপকার করেন। ওরা অনেক ভয়ংকর তাই আমাদের নাম বলতে পারছি না। আপনারা খোঁজ নিলে সব সত্যতা জানতে পারবেন।’

চিঠিতে এরোমা স্পা সেন্টারের মালিক হিসেবে চট্টগ্রামের চন্দনাইশের সাজ্জাদ হোসেন ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে কক্সবাজারের সাজ্জাদ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া রাশেদ প্রকাশ মামা নামের এক ব্যক্তিকে মেয়ে সাপ্লাইয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

একুশে পত্রিকার কাছে আসা চিঠির সূত্র ধরে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, সাজ্জাদ হোসেন চক্রের একটি নয়, দুটি স্পা সেন্টার রয়েছে। একটি কক্সবাজারের ডলফিনের মোড়ে ডায়নামিক এস এইচ রিসোর্ট-এর ২য় তলায় ‘এরোমা থাই স্পা’ সেন্টার। অপরটি তারকা মানের হোটেল ওয়ার্ল্ড বিচে ‘সুইডিশ থাই স্পা’ সেন্টার। অনুমোদনহীন অবৈধ স্পা সেন্টার দুটিতে অন্তত ২৫ জন তরুণী কাজ করেন। ওই তরুণীদের দিয়ে স্পার নাম করে মূলত অনৈতিক ও অসামাজিক কর্মকা-ে বাধ্য করা হয়।

একুশে পত্রিকার কাছে চিঠি প্রেরণকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তরুণীর সব অভিযোগই সত্য বলে সংশ্লিষ্টরা একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন। কক্সবাজারে অনেকের কাছে এরোমা থাই স্পা সেন্টারটি ‘সেক্স সেন্টার’ নামে পরিচিত।

এরোমা থাই স্পা সেন্টারে যাওয়া এক ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মালিক সাজ্জাদ হোসেনের পরিচিত আমার এক বন্ধু চট্টগ্রাম থেকে নিয়মিত তার স্পা সেন্টারে আসেন। তাকে সঙ্গ দিতে গিয়ে গত বছর প্রথমবারের মত আমিও এরোমা থাই স্পা সেন্টারে যাই। ওই থেকে একজন তরুণীর টানে আমি ওখানকার নিয়মিত কাস্টমারদের একজন। এ কারণে ভিতরের অনেক কিছুই আমার জানা আছে।’

তিনি বলেন, ‘এরোমা থাই স্পা সেন্টারে সবসময় ৮ থেকে ১০ জন তরুণী থাকেন। প্রায় সব তরুণীই শিক্ষিত। টাকার বিনিময়ে তারা সবই করে। তবে কয়েকজন তরুণীর কাছে আমি শুনেছি, তারা মালিক সাজ্জাদের কাছে জিম্মি। তাই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে অনেকের সাথে একান্ত সময় কাটাতে হয়।’

‘কয়েকজন তরুণী আমাকে বলেছেন, পার্লার বা স্পা সেন্টারের চাকরি দেওয়ার নাম করে তাদেরকে আনা হয়েছে। তখন বলা হয়েছিল স্পা সেন্টারটি শুধু মেয়েদের। প্রথমদিকে মালিক সাজ্জাদ কয়েকদিন ভালো ব্যবহার, ভালো খাওয়া-দাওয়া ও কক্সবাজারে ঘোরাঘুরি করার সুযোগ দেন। পরে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সাজ্জাদের সাথে সময় কাটাতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু গোপনে তা ভিডিও ধারণ করা হয়।’

পরে ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ওই তরুণীদের জিম্মি রেখে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ বাড়িতে ছুটি কাটাতে গিয়ে আসতে না চাইলে ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে আবার ফিরে আসতে বাধ্য করা হয়। আবার কেউ টাকার জন্য নিজের ইচ্ছায় এসব করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বলেও জেনেছেন স্পা সেন্টারের এ গ্রাহক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাজ্জাদ একা নয়, তার সাথে কয়েকজন প্রভাবশালী জড়িত। স্পা সেন্টারে নিয়মিত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাকে দেখা যায়। এমনকি সাজ্জাদের স্পা সেন্টার থেকে কয়েকজন তরুণীকে প্রায় সময় কয়েকটি তারকা মানের হোটেলে নেওয়া হয়। এ ছাড়াও ছুটিরদিন শুক্রবার-শনিবারে সাজ্জাদের স্পা সেন্টারে গভীর রাত পর্যন্ত মাদকের উৎসব চলে বলে জানিয়েছে স্থানীয় একাধিক পর্যটন ব্যবসায়ী।

এরোমা স্পা সেন্টারে কর্মরত একজন তরুণী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘টাকার বিনিময় স্পা সেন্টারে সবই হয়। অন্য কারো কথা বলতে পারবো না, আমাকে কেউ জোর করেনি। আমি নিজের ইচ্ছায় এখানে আছি। আমি চলে যেতে চাইলে মালিক আমাকে বাধা দেবে না। এরোমা থাই স্পা সেন্টারে সর্বনিম্ন প্রতি ঘণ্টায় দুই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে হোটেল ওয়ার্ল্ড বিচের একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, সাজ্জাদের দুটি স্পা সেন্টারই অঘোষিত পতিতালয়। স্পা সেন্টারের মেয়েদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানো হয়। হোটেলের উপরে স্পা সেন্টার হওয়াতে হোটেলের রুমে অবস্থানরত পর্যটকরাও স্পা থেকে মেয়ে নিয়ে এসে সময় কাটান। অনেক মেয়েকে জোরপূর্বক এসব অপকর্ম করানো হচ্ছে। বিনিময়ে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।

তিনি বলেন, গত বছর একজন পরিচিত পর্যটক একান্ত সময় কাটানোর জন্য মোটা অংকের টাকার মাধ্যমে সাজ্জাদের স্পা সেন্টার থেকে একজন তরুণীকে রাতে রুমে নিয়ে আসেন। কিন্তু পরের দিন সকালে ওই পর্যটক আইনশৃংঙ্খলাবাহিনীকে ফোন করে ডেকে আনেন।

আইনশৃংঙ্খলাবাহিনী ওই সময় অভিযান চালিয়ে হোটেল ওয়ার্ল্ড বিচে সাজ্জাদের মালিকানাধীন ‘সুইডিশ থাই স্পা’ ও ‘ডিলাক্স থাই স্পা এন্ড বিউটি কেয়ার স্পা’ দুটি সিলগালা করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, পরে ওই পর্যটত দাবি করেন স্পা সেন্টারে অনেক উঠতি বয়সী তরুণীদের জিম্মি করে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। যে মেয়েটিকে তার সাথে সময় কাটানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল তাকেও হুমকি দিয়ে জোর করে পাঠানো হয়েছিল। তরুণীটি কাঁদতে কাঁদতে ওই পর্যটকের কাছে এ তথ্য দিয়েছিলেন। তবে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর স্পা দুটি আবার চালু করা হয় বলে জানান হোটেলের এ কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে তারকা মানের হোটেল ওয়ার্ল্ড বিচের সুইডিশ থাই স্পা সেন্টারের ও ডিলাক্স থাই স্পা এন্ড বিউটি কেয়ারের পরিচালক শাহিনুল ইসলাম শাহীন একুশে পত্রিকা বলেন, ‘চন্দনাইশের সাজ্জাদ হোসেন ও অপর একটি মেয়েকে পৃথকভাবে মাসিক ৪০ হাজার করে ভাড়ায় স্পা দুটি দেওয়া হয়েছে। সেখানে জোর করে কোনও তরুণীকে দিয়ে অপকর্ম করা হয় কিনা আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেলে ওই দুটি স্পা সেন্টারের সাথে করা চুক্তি বিনা নোটিশে বাতিল করা হবে।’

গত বছর আইনশৃংঙ্খলাবাহিনী স্পা সেন্টার দুটি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘বলা হয়েছিল স্পা সেন্টার দুটিতে রোহিঙ্গা তরুণীদের দিয়ে অপকর্ম করা হচ্ছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান হয়েছিল। পরে হয়তো তথ্যের সত্যতা মিলেনি। তাই তারা আবার স্পা সেন্টার দুটি খুলে দিয়েছিল হয়তো।’

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তৎকালীন একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার তৎপরতায় সেদিন স্পা সেন্টারের মালিক সাজ্জাদ হোসেন দায়মুক্তি পান এবং পুনরায় স্পা সেন্টার দুটি চালু করতে সক্ষম হন। হোটেল ওয়ার্ল্ড বিচে ‘ডিলাক্স থাই স্পা এন্ড বিউটি কেয়ার’-এর মালিক কাসপিয়া তামান্না হলেন প্রভাবশালী ওই আমলার আত্মীয়। তার কারণে সেদিন রক্ষা পান সাজ্জাদ হোসেন।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত সাজ্জাদ হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমার এরোমা থাই স্পা সেন্টারে মাত্র চারজন মেয়ে রয়েছে, সেটা মেয়েরা চালায়। আমি বেশিরভাগ সময় চট্টগ্রামে থাকি। এছাড়া ওয়ার্ল্ড বিচে সুইডিশ থাই স্পা সেন্টারটি আমার নয়। চন্দনাইশের অন্য কোনও সাজ্জাদের হতে পারে।’

এদিকে ডায়নামিক রিসোর্টের ম্যানেজার সনজিৎ স্পা সেন্টারের অপকর্মের সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্পা সেন্টারটির ম্যানেজমেন্ট সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের অনেকগুলো লোক আছে। সেখানে কী হয় আমাদের জানা নাই।’

অভিযোগের বিষয়ে অবহিত করা হলে কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের এসপি জিল্লুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘটনা সঠিক হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এছাড়া বিষয়টি র‌্যাব-১৫ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হলে তারা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।