শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

ডেটলাইন নাসিরাবাদ : দিনে নেমে আসে রাতের অন্ধকার!

প্রকাশিতঃ সোমবার, এপ্রিল ৫, ২০২১, ১০:৫২ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে আকাশ। চৈত্রের ফকফকা রোদের দিনে নেমেছে যেন রাতের অন্ধকার। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসের বস্তুকণায় মিশে ঢুকে যাচ্ছে মানুষ আর প্রাণীদেহে। পরিবেশবিধ্বংসী এই চিত্র চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার।

এখানকার ৪-৫টি রড উৎপাদনকারী কারখানার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কারণে ভুগছে পুরো বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার লাখ লাখ মানুষকে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জনজীবন।

পরিবেশ-বিধ্বংসী কারখানাগুলো হলো- সালেহ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রতনপুর স্টিল মিলস (আরএসআরএম) লিমিটেড, বায়েজিদ স্টিল মিলস লিমিটেড (বিএস এল), বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (বিএস আরএম) ও বেঞ্জ স্টিল লিমিটেড।

অভিযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনকে তোয়াক্কা না করে এসব কারখানা ‘বায়ু শোধনযন্ত্র” অকার্যকর রেখে রড উৎপাদন করছে। অথচ কারখানা ঘিরে ঘনবসতিপূর্ণ শেরশাহ, বাংলাবাজার, চন্দ্রনগরের লাখ লাখ মানুষের বসবাসের পাশাপাশি আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা। দীর্ঘদিন থেকে কারখানাগুলো পরিবেশের ক্ষতি করে আসলেও মাঝেমধ্যে জরিমানা করে দায় সারছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মেট্রো) মো. নুরুল্লাহ নূরী একুশে পত্রিকাকে জানান, মানমাত্রাবহির্ভূত অপরিশোধিত বায়ুনির্গমনেের মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতিসাধন করার দায়ে বিলেট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সালেহ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে ৩১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে সালেহ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজকে ১০ লাখ টাকা, বায়েজিদ স্টিলকে ৯ লাখ, আরএস আরএমকে ৯ লাখ এবং বেঞ্জ স্টিলকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

জানা গেছে, গতবছর ২০ ডিসেম্বর সালেহ স্টিল মিলস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক দেশার আলী’র উপস্থিতিতে শুনানি করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর আগে ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর একই কারণে এ প্রতিষ্ঠানটিকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগ।

সূত্রটি জানায়, বায়ুমান বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পায়, সালেহ স্টিল মিলস লিমিটেডের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে সাসপেনডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার (এসপিএম) ৪৬৮ পিজিএম ও ৩০৮ পিজিএম। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ (সংশোধিত ২০০৫) অনুযায়ী এটির গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা সর্বোচ্চ ২০০ পিজিএম। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, সালেহ স্টিলে স্থাপিত এয়ার পলিউশান কন্ট্রোল প্ল্যান্ট (এপিসিপি) ত্রুটিপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটিকে এপিসিপি আধুনিকায়নের জন্য বার বার নির্দেশনা দেওয়া হলেও আমলে নিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, দূষণরোধে বায়েজিদ স্টিল, সালেহ স্টিল, আরএস আরএম ও বেঞ্জ স্টিল কারখানায় এয়ার পলিউশান কন্ট্রোল সিস্টেম বা এপিসিএস স্থাপন করলেও তা কার্যকর নয়। জরিমানা করেই পরিবেশ অধিদপ্তর দায় সারছে, ভুক্তভোগীদের এ অভিযোগ প্রসঙ্গে মো. নুরুল্লাহ নূরী বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। তাই চাইলেও অনেককিছু করতে পারি না।

এদিকে, বিএসআরএম কারখানায় “বায়ু শোধনযন্ত্র” থাকলেও তাদের চুল্লী থেকে প্রতিদিন কালো ধোয়া ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযোগ আছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশ-বিধ্বংসী কার্যক্রম চালাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মেট্রো) মো. নুরুল্লাহ নূরী বলেন, ‘গত ৫ বছরের মধ্যে বিএসআরএম’র বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের কোনও অভিযোগ পাইনি। তাদের কারখানায় এপিসিএস শতভাগ কার্যকর।’

জানা গেছে, সম্প্রতি নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার উক্ত স্টিল মিলগুলোর চারপাশ থেকে বায়ুর নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর। বিশ্লেষণে বায়ুতে ক্ষতিকর পদার্থ এসপিএম (সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। সাধারণত এসপিএম প্রতি ঘনফুট মিটার ২০০ মাইক্রোগ্রাম। উক্ত কারখানাগুলোর নমুনা বিশ্লেষণে সেটি পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৭৬২ মাইক্রোগ্রাম থেকে সর্বনিম্ন ৩৪১ মাইক্রোগ্রাম।

জানা গেছে, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায় যে ৫টি শিল্প কারখানা সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণ করছে এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশ ঘিরে আছে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি’র স্থায়ী ক্যাম্পাস, সাইডার ইন্টান্যাশনাল স্কুল, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ভুক্তভোগী সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আরমান আলী বলেন, সালেহ স্টিল মিলের চুল্লী একেবারে স্কুল গেটের বিপরীতে৷ দিনরাত সমানতালে কারখানার চুল্লী থেকে বের হয় বিষাক্ত কালো ধোঁয়া। গাছপালা, আশপাশের এলাকার বাড়িঘর ঢেকে যায় ধোঁয়ায়। মনে হয় যেন কুয়াশা পড়েছে। দিনে নেমে আসে রাতের অন্ধকার।’

পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের পরিচালক (মেট্রো) মো. নুরুল্লাহ নূরী জানান, নাসিরাবাদে গড়ে তোলা সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি’ স্থায়ী ক্যাম্পাস কোনওটিই আমাদের অনুমতি নেয়নি। এটি তো শিল্প এলাকা। তারা কেন সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন।’-বলেন তিনি।

জানা গেছে, রড উৎপাদনকারী মূলধারার প্রতিষ্ঠানের বাইরে নাসিরাবাদে আছে কিছু ‘অবৈধ কারখানা।’ কারখানাগুলো থেকেও দিনরাত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বের হয়। পরিবেশ দূষণরোধ করার কোনো ব্যবস্থা তারা রাখেনি। কারখানায় নেই কোনো বর্জ্য শোধনাগার বা এপিসিএস। এসব কারখানার কালো ধোঁয়ায় পুরো বায়েজিদ এলাকা ছেয়ে যায়।

অভিযোগ আছে, কারখানার মালিকরা ইটিপি ও এপিসিএস খরচ বাঁচাতে, ভোর রাতের দিকে কারখানা পরিশোধন করতে কালো ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ পরিস্থিতিও চলছে দীর্ঘদিন ধরেই।

বায়ূ দুষণের দায়ে ৯ লাখ টাকা জরিমানা পরিশোধ প্রসঙ্গে সোমবার রাতে ফোন করে জানতে চাইলে বায়েজিদ স্টিল মিলস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু বক্কর চৌধুরী কিছুটা বিরক্তবোধ করেন। পরে এ প্রতিবেদকের কাছে কী বিষয়ে বক্তব্য তা জানতে চান আবু বক্কর চৌধুরী। বায়ূ দুষণের দায়ে জরিমানা গোণা প্রসঙ্গে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব বিষয় আমার জানা নেই। আমার কারখানার স্টাফরা বলতে পারবেন।’

বিএসআরএম এর উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া বের হয় না। যে বা যারা অভিযোগ করেছেন সেটি মিথ্যা৷ আমাদের কারখানায় স্থাপিত এপিসি শতভাগ কার্যকর। তবে আমাদের আশপাশে থাকা বেশ কিছু কারখানার চুল্লী থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া আমাদের ফ্যাক্টরির চারপাশ আচ্ছন্ন করে ফেলে। এ কারণে অনেকেই মনে করে থাকতে পারে আমাদের কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। অবশ্য এ ব্যাপারে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে জানিয়েছি।’