শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

করোনার ধাক্কা : মেধাবী শিক্ষার্থী ইমন এখন ফেরিওয়ালা

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৮, ২০২১, ১:০০ পূর্বাহ্ণ

আবু মুসা চৌধুরী : আগ্রাবাদ চেম্বার ভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে চলছি। দ্রুতচিত্তে বেশ সুশ্রী-সুবেশি-স্মার্ট এক তরুণ- যার বয়স ২০-২২ বছরের বেশি নয়, আহ্বান জানালো- আঙ্কেল, খুব ভালো শার্ট আছে। মাত্র ২০০ টাকা। গার্মেন্টেসের প্রোডাক্ট। এক্সপোর্ট কোয়ালিটি। থমকে দাঁড়ালাম। দেখলাম বেশ আকর্ষণীয় সম্ভার ভ্যানগাড়িতে সাজিয়ে- মার্জিত রঙের শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট পরিহিত নিষ্পাপ চেহারার তরণটি বেশ সপ্রতিভ। কথাবার্তায়ও আঞ্চলিকতামুক্ত। মেরুন রঙের একটি শার্ট পছন্দ হলো। বললাম, কম কতো হবে? আমাদের চিরাচরিত দস্তুরমাফিক দরাদরি করতে চাইলাম। ইমন নামের তরুণটি জানায়, মাত্র ২০ টাকা প্রফিটে বিক্রি করছে। তাই ১ টাকাও কম হবে না।

ছেলেটিকে মোটেও পেশাদার ফেরিওয়ালা মনে হলো না। বললাম, আচ্ছা দাও। গায়ে থাকা পুরোনো শার্টটি খুলে নতুনটি পরি। তরুণ বলে, বাহ! বেশ মানিয়েছে। টাকা দেওয়ার পর বললাম, তোমার নাম কী? বাসা কোথায়? কী করো?

জানতে পারলাম- ওর নাম ইমন। বাসা মোগলটুলি। সিটি কলেজে ২য় বর্ষের শিক্ষর্থী। করোনাকালীন সংকট ও বাস্তবতায় ফেরিওয়ালার পেশা বেছে নিয়েছে।

শুনে বেশ ভালো লাগলো। ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতে আসতে ভাবলাম- যাক, আমাদের সময় ঝেঁকে বসা বদ্ধমূল ফলস প্রেস্টিস বা ‘বায়বীয় সম্মানবোধ’; যাকে বলা যায় যে কোনো পেশাকে হেয় না করার প্রবণতা দূরীভূত হয়েছে। তাই আমাদের আগামী প্রজন্ম নিয়ে আর শঙ্কার কোনো কারণ নেই। যুগের মুক্ত হাওয়ায়, খোলা বাতায়নে, বিশ্বায়ন বা বিশ্বগ্রামের কনসেপ্টের নিরিখে আগামী প্রজন্ম যে কোনো পেশাকেই হেয় ভাবতে নারাজ। ওদের মনে মনে টুপিখোলা স্যালুট জানাই।

গাণিতিক হিসেবে ১ মিলিয়ন মানে ১০ লক্ষ, আর ১ বিলিয়ন মানে হলো ১০০ মিলিয়ন- যার অংক দাঁড়ায়, ১০০ কোটি। আর এক ট্রিলিয়ন মানে হলো ১০০০ বিলিয়ন। তাতে কতো কোটি টাকা হয়, তা বের করার জন্য খাতা-কলম বা ক্যালকুলেটর নিয়ে বসতে হয়।

সংখ্যাতত্ত্বের এসব কচকচি বাদ দিয়ে আসল প্রসঙ্গে আসা যাক। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্টে এসেছে- কোভিড-১৯ এর কারণে, দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল শিক্ষখাতে ক্ষতির পরিমাণ হলো ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের দেশীয় টাকায় কতো টাকা হয় একবার ভাবুন।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দীর্ঘকালীন স্কুল বন্ধের কারণে, যে শিক্ষাসংকট হয়েছে; এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলো ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

গত বুধবার প্রকাশিত এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের পুরো ১টি বছর নষ্ট হয়েছে এই মহামারীর কারণে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা দপ্তরের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ জানিয়েছেন, স্কুল বন্ধ থাকায় প্রতিজন বাংলাদেশি ছাত্রের পুরো বছরে ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার টাকারও বেশি। যা তাদের এবং সামগ্রিক দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেবে আরো। শহর ও গ্রামের প্রত্যেকের অনলাইন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে, ডিজিটাল ডিভাইসের চাহিদা মেটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে এই আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিশ্বব্যাংকের এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বাজেটের অংক বেড়ে গেছে। এই বেড়ে যাওয়া খাতের মধ্যে রয়েছে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। কেবল শিক্ষখাতেই বাজেট বাড়াতে হবে।

কোভিড-১৯ এর জন্য আয় হারিয়ে ৫৫ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। যা সারা বিশ্বের মোট ড্রপ-আউটের অর্ধাংশ। এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে সাউথ এশিয়া ইকোনোমিক ফোকাস, বসন্ত-২০২১-এ। দীর্ঘমিয়াদি লকডাউন দক্ষিণ এশিয়ায় পারিবারিক সন্ত্রাস বেড়ে গেছে এবং মেয়েদের শিক্ষার হার কমিয়ে দিয়েছে।

এই উদ্ভূত সঙ্কট যথাবিহিত ও দক্ষতার মাথে মোকাবিলার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষা বাজেট তেমন প্রস্তুত নেই। এতদ অঞ্চলের সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট কর্তৃক বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ২০১৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রকৃত অংক ২-৪ শতাংশ কমানো হয়েছে।

ওই প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে, ভারতীয় কেন্দ্রীয় বাজেট শিক্ষাখাতে ১১ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের বাজেট শিক্ষাখাতে বেড়েছে ১২ শতাংশ।
দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান ওঠে এসেছে। প্রচ- আশংকার বিষয় হলো এই- রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯-এর কারণে স্কুল শিক্ষার্থীদের পুরো শিক্ষাবর্ষই বরবাদ হয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় কোভিডের কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে মোট ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার মোদ্দা হিসেব হলো ৮০ লক্ষ কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো ওঠে এসেছে- দক্ষিণ এশিয়ায় ৩৯১ মিলিয়ন শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। তাদের অধিকাংশই পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় নিজেরাই আয় করার জন্য নেমে পড়েছে। অনেক পরিবারের আয় তো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বয়সের কারণে করোনা সংক্রমণের হার যৎকিঞ্চিৎ। তাই তারাই পারিবারির ভরণপোষনের কঠিন দায় মাথায় নিয়ে যথাতথা যে কোনো উপায়ে যে কোনো কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ সংগ্রহের জন্য কর্মবাজারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। উৎসর্গ করেছে তাদের মহামূল্যবান শিক্ষাজীবন তথা আলোকোজ্জ্বল আগামী বা ভবিষৎ। যা আমরা আগ্রাবাদের চেম্বার অব কমার্সের রাস্তায় ভ্যানগাড়িতে শার্ট বিক্রয়ে প্রবৃত্ত ইমনের মাঝে প্রত্যক্ষ করেছি। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের বেশির ভাগ স্কুল খোলা। পাকিস্তানের প্রত্যন্ত প্রদেশগুলোর স্কুলগুলোও খুলে দেওয়ার প্রস্তাব আনা হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২০ সালের ১১মার্চ থেকে ২০২১ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ১ বছরের অধিক সময়কাল স্কুল-কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

ডিরেক্টরিট অব সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার এডুকেশন সংস্থার প্রফেসর সৈয়দ মোহাম্মদ গোলাম ফারুক একটি দৈনিককে জানিয়েছেন- টিভি, অনলাইন এবং অ্যাসাইনমেন্ট বেসড্ শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে-যা ক্ষতি হয়েছে শিক্ষাবর্ষের, তা কাটিয়ে উঠতে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে।

এখন কিছু মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা ও শিখন প্রক্রিয়া পরিপূরক। আর এটি ‘ওয়ান ওয়ে জার্নি’। এখানে শিক্ষাপদ্ধতির দক্ষতায় শিক্ষাথীরা যেমন এগিয়ে আসবে এবং সুফল পাবে তেমনি শিখন ব্যবস্থায় শিক্ষকরা যথাযথ শিক্ষাপদ্ধতির (যেমন : অ্যানালাইসিস সিস্টেম, রোল প্লে সিস্টেম, ডিসকাশন সিস্টেমসহ শিক্ষাবিজ্ঞানের মৌলিক ধাপসমূহ) মাধ্যমে এর কার্যকারিতায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

আমাদের দেশের পিটিআই, বিএডএমএড ডিগ্রি দেওয়া হয় আলাদা কনস্টিটিউশন থেকে। শিক্ষাপদ্ধতির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিষয়সমূহ ও কারিকুলাম সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এতেই শিক্ষকরা অভ্যাসবদ্ধ এবং যতো সুদক্ষ কিন্তু নতুন উড়ে এসে জুড়ে বসা ডিজিটাল পদ্ধতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সকলকেই কানাগলিতে ঘুরপাক খাওয়ানোর চমৎকার ব্যবস্থা করেছে। আর এর পরিণতিতে আমরা একটি শিক্ষাহীন, দক্ষতাবর্জিত, অনালোকিত, কর্মবাজারে সম্পূর্ণ অযোগ্য- বলা যায় প্রতিবন্ধী বিকলাঙ্গ একটি প্রজন্ম পাবো আগামীতে। যাদের পেশাগত জীবন অতল অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তাহলে এই জাতির ভবিষৎ কী?

আগ্রবাদের ইমন এবং আরো এমন লক্ষ ইমন একদিন হয়তো উন্নতির ক্রমবিকাশ ফেরিওয়ালা থেকে দোকানদার হবে। দোকানদার থেকে ব্যবসাওয়ালা । কিন্তু শিক্ষার আলো বঞ্চিত হয়ে রুপান্তরির হবে ‘চোখ থাকিতে অন্ধ’ একটি প্রজন্মের প্রতিভূ। যারা আধুনিক যুগের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্পূর্ণভাবে অক্ষম।