শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

ইচ্ছেমত ঘুষ নেন তিনি!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৮, ২০২১, ১০:২৭ অপরাহ্ণ


এম কে মনির সীতাকুণ্ড  : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। সেখানে সেবা নিতে গিয়ে সীমাহীন হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। এমন অভিযোগ একুশে পত্রিকার কাছে তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা।

তবে বিপদের আশংকায় এসব ভুক্তভোগীরা নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজী হননি। তাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহ আলম ইচ্ছেমতো ঘুষ আদায় করছেন। চাহিদা অনুযায়ী তাকে ঘুষ দিতে না পারলে কাজ হচ্ছে না। শাহ আলমের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন মানুষ।

এ প্রেক্ষিতে সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে দেখা যায়, কোন সেবার জন্য কত টাকা ফি দিতে হবে- তার কোনও তালিকা নেই। ফলে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে আসা গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমত কর আদায় করছেন শাহ আলম।

নিয়ম অনুযায়ী, ভূমি অফিসগুলোতে ভূমি উন্নয়নকরের হার লেখা তালিকা দৃশ্যমান স্থানে থাকার কথা। কিন্তু সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তালিকা না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহ আলম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এমন কথা জীবনে প্রথম শুনলাম।’ করের হার লেখা কিছু দৃশ্যমান স্থানে না থাকলে গ্রাহক কীভাবে জানবে তার ভূমির কর কত? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যা বলবো তাই জানবে।’
অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছেন সীতাকু- উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ভূমি উন্নয়নকরের তালিকা দৃশ্যমান থাকা দরকার। সীতাকু-ের সবকয়টি ভূমি অফিসে তালিকা দৃশ্যমান আছে কিনা এ মুহূর্তে আমার জানা নেই। তবে আমি তালিকা টাঙানোর কথা বলে দিব।’ এ সময় তিনি অতিরিক্ত অর্থআদায়ের অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান।

এদিকে, সরেজমিনে সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, ভূমি উন্নয়নকর দিতে আসা গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমত কর আদায় করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বকেয়া কর দিতে আসা নিম্নআয়ের ভূমি মালিকেরা।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘বকেয়া কর আদায়ে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ প্রদান করতে হয় জানিয়ে আমাদেরকে শুভঙ্করের ফাঁকিতে ফেলেন শাহ আলম। এছাড়া দফায় দফায় ভূমি উন্নয়নকর বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমত কর আদায়ের সুযোগ লুফে নেন তিনি। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভূমি উন্নয়নকর আদায়ের রশিদে লেখা অর্থের চেয়ে বহুগুণ বেশি কর আদায় করা হয়। আর এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। যার নাম ওই অফিসে টাঙানো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকায় নেই।’

অভিযোগ আছে, উপজেলা ভূমি অফিস থেকে প্রতিনিয়ত আসা ভূমির নামজারি (মিউটেশন) ফাইলের প্রস্তাব পাঠাতেও শাহ আলম হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা। এক্ষেত্রে নামজারি থেকে নামজারি ফাইলে ন্যূনতম ৩ হাজার এবং বিএস খতিয়ান থেকে নামজারি ফাইল হলে সেক্ষেত্রে আরো অধিক পরিমাণ টাকা আদায় করেন তিনি। এভাবে প্রতিদিন গড়ে ২০টি নামজারির প্রস্তাব পাঠাতে পারলে তার পকেটে কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকা জমা পড়ে। যা তিনি অফিস খরচের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করে নেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নামজারির প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকৃত ভূমি সরেজমিনে সার্ভে (পরিমাপ) করার কথা থাকলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে সার্ভে ছাড়াই ফাইল ছেড়ে দেন শাহ আলম। এর ফলে অনেক সময় বেদখলকৃত জায়গাও নামজারি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক ভূমি মালিককে মামলার আশ্রয় নিতে হয়।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, ইতিমধ্যে সরকারিভাবে থানাসহ বিভিন্ন জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। কিন্তু গ্রাহক সেবার অন্যতম স্থান সীতাকু- উপজেলার ভূমি অফিসগুলোতে এখনো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। জরুরি ভিত্তিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপিত হলে ঘুষবাণিজ্য অনেকাংশে কমে আসবে।

অন্যদিকে, বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে পোড়া সনের (১৯৬২-১৯৮২) দলিল দিয়ে আবেদনকৃত নামজারি ফাইলও তদন্ত ছাড়া আবেদনকারীর পক্ষে প্রস্তাব পাঠিয়ে দেয়ার অভিযোগ আছে শাহ আলমের বিরুদ্ধে। তার এসব অবৈধ কর্মকা- এখন সীতাকু-ে ওপেন সিক্রেট। কিন্তু আরও অধিক হয়রানির ভয়ে মুখ খুলছেন না সেবা নিতে আসা কেউই।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার মৌরশী নাল জমির দীর্ঘদিনের বকেয়া কর দিতে গেলে চক্রবৃদ্ধি হারে গুণে প্রায় ৮৫ হাজার টাকার হিসাব ধরিয়ে দেন শাহ আলম। দু’দিন পর নির্ধারিত টাকার চেয়ে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে পেরেছি আমি। ঘটনাটি আমাকে বিস্মিত করেছে।’

প্রবাসী মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সীতাকু- পৌরসভায় গত কয়েক বছর আগে আমি ৩ শতক জমি ক্রয় করি। কিছুদিন আগে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করতে গেলে আমার কাছে ৮ হাজার টাকা দাবি করেন তহশিলদার শাহ আলমের সহযোগী জসিম উদ্দিন। বিষয়টি আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হলে আমি খাজনা না দিয়ে চলে আসি। পরে স্থানীয় এক লোকের মাধ্যমে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকায় খাজনা পরিশোধ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভূমি উন্নয়নকরের একটি দৃশ্যমান তালিকা টাঙানো থাকলে আমাদেরকে এমন হয়রানির শিকার হতে হতো না।’

এদিকে টাকার বিনিময়ে নামজারি ফাইলের প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ভূমি কর্মকর্তা শাহ আলম পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘টাকা ছাড়াও তো প্রস্তাব পাঠাই, সেসব তো বলেন না।’

পোড়া সনের নামজারি ও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টাঙানো তালিকার বাইরে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্পর্কে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি এক মিনিট পরে কল করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কিছুক্ষণ পর ফোন করে শাহ আলম বলেন, ‘এইমাত্র এসিল্যান্ড রাশেদুল ইসলাম স্যারের সাথে আমার কথা হয়েছে। স্যার বলেছেন এর আগে স্যারের সাথে আপনার কথা হয়েছে। তিনি করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠলে আমাকে নিয়ে এসব বিষয়ে আপনার সাথে বসবেন।’ এ বলে তিনি সকল অভিযোগ এড়িয়ে যান।

এরপর শাহ আলম এই প্রতিবেদককে প্রতিবেদন তৈরি থেকে বিরত রাখতে অন্যান্য লোকের দ্বারস্থ হন. যারা প্রতিবেদককে ফোন করে শাহ আলমের ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে কিছু না লিখতে নিরুৎসাহিত করেন।