বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারখানায় নরক-যন্ত্রণা!

প্রকাশিতঃ সোমবার, এপ্রিল ১৯, ২০২১, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক, বাঁশখালী থেকে ফিরে : বাঁশখালীর গণ্ডামারায় নির্মাণাধীন এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা আহমেদ চৌধুরীর প্রশ্ন- এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কেন বার বার সংঘর্ষ এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে? পুলিশ কেন নিরস্ত্র শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত করবে এলাকার পবিত্র মাটি? মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষায় পুলিশ কেন পাখির মতো গুলি করে নিরীহ শ্রমিক মারবে?

শুধু আহমেদ চৌধুরী নন, রোববার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে একুশে পত্রিকা প্রতিবেদককে কাছে পেয়ে এমন অনেক প্রশ্ন নিয়ে হাজির হন স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও শ্রমিকরা।  একাধিক শ্রমিকের ক্ষোভ, কারখানায় চীনা নাগরিকদের নির্যাতন নিয়ে।

শ্রমিক আব্দুল কাদের বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক দুই ধরনের শ্রমিক আছে। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরা এখনো মার্চের বেতন পাননি। ১০ এপ্রিল মার্চ মাসের বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ চলছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দাবি নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলব। এজন্য প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক শনিবার সকালে কারখানায় হাজির হন। আমরা কর্মবিরতি শুরু করি। দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার দাবিতে গেল শুক্রবার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। রাতে কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। অবশেষে আমাদের ভাইদের শরীর গুলি দিয়ে ঝাঁঝড়া করে দিল পুলিশ।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিকরা একুশে পত্রিকা প্রতিবেদকের কাছে কারখানায় কীভাবে নরক-যন্ত্রণায় বসবাস করছেন তার  চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, ৬-৭ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মসজিদ আছে একটি। সেটির আয়তন প্রায় ৪৫০ বর্গফুট। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। নালা-নর্দমায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মলমূত্র। দুর্গন্ধে টেকা দায় । ৬-৭ হাজার শ্রমিকদের জন্য ক্যান্টিন আছে তিনটি। ক্যান্টিন ব্যবস্থাপনায় যারা আছে তারা পণ্যের দাম নেয় দিগুণ বা তিনগুণ। মূলত এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে।

চীনা শ্রমিক-কর্মকর্তার দ্বারা বাংলাদেশি শ্রমিক নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছেন বাঁশখালী থানার ওসি (তদন্ত) আজিজুল ইসলামসহ পুলিশ সদস্যরা। জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এস আলমের কারখানায় প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক কাজ করে। শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ থাকবে, ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকবে এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু মালিকপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতো না।

বড়ঘোণা এলাকার বাসিন্দা রহমান আলী প্রশ্ন রেখে বলেন, ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ক্ষোভ থামাতে এস আলম কর্তৃপক্ষ কী উদ্যোগ নিয়েছে? পাচটি তরতাজা প্রাণের দায় কারখানা কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। তারা টাকার জোরে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে।’

শ্রমিক সংগঠনের এক নেতার অভিযোগ, কারখানার শ্রমিকরা বকেয়া বেতন-বোনাস প্রদানের দাবি জানিয়ে আসলেও মালিকপক্ষ তা এতদিন আমলেও নেয়নি। ন্যায্য বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলনের এক পর্যায়ে মালিকপক্ষ তাদের উপর চড়াও হয়। পরে মালিকের নির্দেশে পুলিশ শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের এমন আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়ে। পুলিশ কেন এমন মারমুখী ভূমিকা পালন করল? এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের প্রথমে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করার কথা। তাতে কাজ না হলে রাবার বুলেট ছোঁড়ার কথা। সব ব্যর্থ হলে, নিজেদের প্রাণ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে তাহলেই কেবল গুলি চালানোর কথা।

রোববার (১৮ এপ্রিল) ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের এসব প্রশ্নের উত্তর দেননি অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেন খান।

শ্রমিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে এলাকার জনমত শুরু থেকেই বিভক্ত ছিল৷ এর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এস আলম গ্রুপ বিষয়টিকে পাত্তাই দেয়নি।