বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

স্পেক্ট্রার আগ্রাসন বায়েজিদ লিংক রোডে, পাহাড় কেটে গড়ছে রিসোর্ট

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ২৩, ২০২১, ৮:০৫ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়ক সংলগ্ন পাহাড় কেটে স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিসোর্ট গড়ে তুলছে। এই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দু’মাস আগে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিদর্শক নূর হাসান শরীফ। মামলাটি তদন্ত করছেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক আফজাল ইসলাম।

বিষয়টি নিশ্চিত করে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক জমির উদ্দিন শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) বিকালে একুশে পত্রিকাকে জানান, মামলা দায়েরের আগে বছরখানেক পূর্বে পাহাড় কেটে রিসোর্ট গড়ে তোলার কারণে স্পেক্ট্রাকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া এবং সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গায় স্থাপনা গড়ে তোলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স। এর আগে ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর ফয়’স লেকে পাহাড় কাটার অভিযোগে স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করছিল পরিবেশ অধিদপ্তর।

বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মামলা দায়েরের পরও রিসোর্ট-এর নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে স্পেক্ট্রা। রিসোর্ট-এর জন্য অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করছে ৫-৬জন শ্রমিক। এদের একজন শ্রমিকের নাম সাদি; তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা দু’দিন ধরে রাস্তায় ইট বিছানোর কাজ করছি। আরও অনেক কাজ বাকি আছে।’

দেখা গেছে, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়কের পাশে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে রিসোর্টটি। তবে সাইটে নেই কোনও সাইনবোর্ড। ফটক দিয়ে ঢুকে দেখা মিলল নিরাপত্তাকর্মী সাজ্জাদ হোসেনের। তিনি জানান, এটি একটি রিসোর্ট। কারা করছেন প্রশ্ন করলে সাজ্জাদ বলেন, ‘স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।’ জানা গেছে, পাহাড় কেটে স্পেক্ট্রা যে রিসোর্টটি গড়ে তুলছে সেটির অবস্থান বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়ক সংলগ্ন সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর মৌজায়। যার বিএস দাগ নং ৩৫৭।

স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড সিডিএ নির্মিত বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়কের ঠিকাদার। অভিযোগ আছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর মৌজার বিএস ৩৫৭, ৩৫৮ ও ৩৫৯ দাগের প্রায় ২০ দশমিক ৬ একর পাহাড় কেটে ওই সড়কটি করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, ২০-২৫টি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়ক। এক-একটি পাহাড় ২৫ ফুট থেকে ১৫০ ফুট উচ্চতার।

দেখা গেছে, রিসোর্টটির চার পাশে বড় বড় পাহাড়। পাহাড়ের মাঝখানে চলে গেছে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়ক। ইতিমধ্যে রিসোর্টটির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য অভ্যন্তরীণ রাস্তা, দোতলা ভবনসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। রিসোর্টটির চারপাশে সবুজ পাহাড়ের উঁচু-নিচু বিছানা। পাহাড়ের মাঝখানে আছে নীল জলরাশির একাধিক লেক। অনন্য সৌন্দর্য, যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ফ্রেমবন্দি ছবি। অথচ এমন মুগ্ধতায় ভরা পাহাড়গুলো কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে রিসোর্ট।

তবে রিসোর্ট গড়ে তোলার জন্য খাস জায়গাটি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড বন্দোবস্তি নিয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আব্দুল মালেক। তিনি জানান, গত বছর নভেম্বর থেকে রিসোর্ট-এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। শিগগির এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। এরপর সেটি বিক্রি করে দেওয়া হবে।

অভিযোগ আছে, চট্টগ্রামে পাহাড়নিধন করে স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড একের পর এক অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে। প্রতিষ্ঠানকে বার বার ছাড় দেওয়ার পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলে শীর্ষ পদে থাকা কোনও কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও গুঞ্জন আছে। তবে এ প্রতিষ্ঠানকে গোপনে সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জমির উদ্দিন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম স্পট ফয়’স লেকের শেষ সীমানায় সীতাকুণ্ড উপজেলা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ পর্যন্ত চউকের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিংক রোডটি নির্মাণ করে। এই সুযোগে স্পেক্ট্রা চউকের নক্সার বাইরেও পাহাড় কাটে। পাহাড়-কাটার অভিযোগে চউককে সাড়ে ১০ কোটি টাকা জরিমানাও গুনতে হয়েছে পরবর্তীতে।

চউকের রাস্তা নির্মাণের সুযোগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্রিকফিল্ড, ৩০টিরও বেশি আবাসিক এলাকার প্লট নির্মাণে পাহাড় কাটার মাটি দিয়ে সহায়তা করেছে স্পেক্ট্রা। পাহাড়কাটা মাটির বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, আছে এমন অভিযোগও।

এদিকে জঙ্গল সলিমপুর মৌজায় বিএস ৩৫৭ নং দাগের আন্দর সরকারি পাহাড় বা কোনও জমি স্পেক্ট্রা নামে কোনও প্রতিষ্ঠানকে রিসোর্ট গড়ে তোলার জন্য লিজ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদুল ইসলাম।

শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) বিকেলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমি সীতাকুণ্ডের এসি ল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি ৮ মাস আগে। আমার আগের কোনও কর্মকর্তা স্পেক্ট্রাকে ইজারা দিয়েছে কিনা আমার নেই। কোনও প্রতিষ্ঠান সরকারি খাসখতিয়ানভুক্ত পাহাড় কেটে স্থাপনা গড়ে তুললে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এসি ল্যান্ড রাশেদুল ইসলাম।