শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

অবৈধ অস্ত্র ভাণ্ডারে হাত পড়ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর!

| প্রকাশিতঃ ২৫ এপ্রিল ২০২১ | ৩:০২ অপরাহ্ন


শরীফুল রুকন : চট্টগ্রামে শক্তি প্রদর্শনে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের দিন শক্তি প্রদর্শনের জন্য প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি দেখা গেছে। এসব ঘটনায় অস্ত্রধারীদের অনেকেই গ্রেপ্তার হননি। আবার গ্রেপ্তার হলেও পুলিশ কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। মাঝে মাঝে একটি-দুটি অস্ত্র উদ্ধারের খবর শোনা গেলেও অবৈধ অস্ত্র ভাণ্ডারে হাত পড়ছে না র‌্যাব-পুলিশের। অভিযোগ আছে, যে পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশী পরিমাণ অস্ত্র মজুদ আছে সন্ত্রাসীদের কাছে। এসব অস্ত্র সন্ত্রাস সৃষ্টি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে প্রতিনিয়ত ব্যবহার হচ্ছে।

এর আগে চট্টগ্রাম সিটির ভোটের দিন দুপুরের দিকে পাথরঘাটা ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় একটি গলিতে কালো প্যান্ট ও জ্যাকেট পরা এক যুবক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ জানতে পারে, ওই যুবক হলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি আ ফ ম সাইফুদ্দিন। তিনি এখনো গ্রেপ্তার হননি। উদ্ধার হয়নি তার সেই পিস্তলও। কোতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, সাইফুদ্দিন সেদিন হাতে পিস্তল নিলেও গুলি চালায়নি। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে আমি জানতে পেরেছি, সে এখন দেশে নেই।’

এদিকে ভোটের দিন সকালে পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমবাগান ইউসেফ টেকনিক্যাল স্কুলের সামনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিতে মারা যান দিনমজুর আলাউদ্দিন। ওই সংঘর্ষেও দেখা যায় কালো কোট পরা এক যুবক অস্ত্র তাক করেছেন প্রতিপক্ষের দিকে। তিনি কোন পক্ষের, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমবাগানের সংঘর্ষ রেললাইন এলাকায় হওয়ায় মামলা হয়েছে রেলওয়ে থানায়। চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসি সোহরাব হোসেন বলেন, ‘ওই ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। অস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।’

সিটি ভোটের আগে গত ১২ জানুয়ারি নগরের পাঠানটুলী ওয়ার্ডের মগপুকুর পাড় এলাকায় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিতে আজগর আলী ওরফে বাবুল নামের এক মহল্লা সরদার নিহত হন। এ ঘটনার পরপর বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদেরসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দুই দফায় কাদেরকে রিমান্ডে আনা হলেও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধার হয়নি। কার গুলিতে মারা গেলেন বাবুল, তাও বের করতে পারেনি পুলিশ। অস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (পশ্চিম) শাহাদাত হোসেন খান।

সর্বশেষ গত ১৪ এপ্রিল মসজিদে খাটিয়া দেয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে চট্টগ্রামের রাউজানে পশ্চিম গহিরা আবুদ্দার বাড়ির শেখ ইব্রাহিম জামে মসজিদে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ঘটনায় স্থানীয় কাউন্সিলর আলমগীরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার হয়নি। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের ধরতে আমরা তৎপর আছি। এজন্য বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে।’

বাসা-বাড়িতেও তৈরি হচ্ছে অস্ত্র :

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের পরদিন রাতে নগরীর পাঠানটুলি এলাকায় গুলি ছোড়ার শব্দ শুনতে পায় এলাকাবাসী। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে গুলির উৎস খুঁজতে গিয়ে একটি বাড়িতে অস্ত্রের কারখানার সন্ধান পায় পুলিশ। নিজাম খান নামের এক ব্যক্তির ওই বাড়ির কবুতরের বাসায় কয়েকটি অস্ত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তার স্ত্রী মেহেরুন্নেছা মুক্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডবলমুরিং থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘৯৯৯ নম্বর থেকে খবর পেয়ে পুলিশ সেই গুলির শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে এই কারখানার সন্ধান পায়। বাসাটিতে মূলত পাইপগান তৈরি করা হতো। ভোট নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে নিজাম খান তাঁর প্রতিবেশী শাহ আলমকে গুলি করেন। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে শাহ আলম বেঁচে যান। গুলির শব্দে চারদিক থেকে মানুষজন বের হলে নিজাম পালিয়ে যান।’

তিনি বলেন, ‘নিজামের বাড়ি থেকে দুটি দেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও একটি এয়ারগান, অস্ত্র তৈরির ডায়াগ্রামসহ বিভিন্ন ধরনের লোহা কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এসব দিয়ে ঘরে বসেই নিজাম অস্ত্র তৈরি করতেন। সেখানে ছোট অস্ত্র তৈরির কাগজের কিছু নকশা পাওয়া গেছে। এগুলো মিলিয়ে তিনি অস্ত্র তৈরি করেন। পাশাপাশি লেদ মেশিনসহ লোহা কাটার বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র এবং ছোট আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির পাইপ উদ্ধার করা হয়।’

অস্ত্রের কাঁচামালের উৎস পরিত্যক্ত জাহাজ!

বঙ্গোপসাগর তীরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে গড়ে উঠেছে জাহাজভাঙা শিল্প। সেখানকার পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয় চাহিদামতো প্রয়োজনীয় লোহা। এসব লোহা থেকে তৈরী হয় হাতল ও ট্রিগার। সাগরপাড়ে সহজেই মিলছে পাইপ, স্ক্রু, স্প্রিং ও ড্রিল মেশিন। আরো পাওয়া যায় লোহা কাটার ব্লেড, তার কাটার যন্ত্র (প্লায়ার্স) ও স্ক্রু ড্রাইভার। অস্ত্র তৈরীর এসব সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে স্বল্পমূল্যে। এসব কাঁচামাল দিয়েই বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র।

বর্তমানে এপিবিএনে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক রাজু আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা কাঁচামালগুলো সীতাকুন্ডের পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়। দাম কম হওয়ার কারণে সেখান থেকে অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয় সবচেয়ে বেশী। যার কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হওয়া অস্ত্রের উৎপাদন খরচও অনেক কম হয়।’

সূত্র জানায়, ভৌগোলিক কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ও কক্সবাজারের মহেশখালীতে এখনো সচল রয়েছে বেশ কিছু অস্ত্র কারখানা। এই এলাকায় রয়েছে অর্ধশতাধিক অস্ত্র কারিগর। অস্ত্রের অর্ডার পেলেই নিজস্ব কারখানায় অস্ত্র তৈরি করেন তারা। এছাড়া অর্ডার দিলে নির্দিষ্টস্থানে অস্ত্র পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছেন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অস্ত্র পরবর্তীতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এ প্রসঙ্গে সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন বণিক বলেন, ‘জাহাজভাঙা শিল্পের বিষয়গুলো তদারকি করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এরপরও অপরাধ সংক্রান্ত হওয়ায় এ বিষয়ে খোঁজখবর নেব।’

এদিকে বিদেশী অস্ত্রগুলোর কিছু অংশ ফেনী ও খাগড়াছড়ির সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে চট্টগ্রামে আসছে। এর বাইরে তিন পার্বত্য জেলার সন্ত্রাসী সংগঠন ও মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকেও অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করে আসছে চট্টগ্রামের অবৈধ অস্ত্রধারীরা।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী, বহনকারী এবং ব্যবহারকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।’

রাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল বলেন, ‘র‌্যাব প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সমাজের বিভিন্ন অপরাধের উৎস উদ্ঘাটন করে আসছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারসহ আইনশৃঙ্খলার সামগ্রিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে র‌্যাব। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছি আমরা। অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে র‌্যাব।’

তদন্তে উঠে আসে না অস্ত্র-গুলির উৎস :

চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে যেসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয় উৎস বা গন্তব্য খুঁজে বের করার কোনো তৎপরতা দেখা যায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাসকে পিটিয়ে হত্যার আগে নগরের নালাপাড়া এলাকায় গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়ায় সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসে আসামি জাহিদুর রহমানই সেই দিন পিস্তল উঁচিয়ে চার রাউন্ড গুলি করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পিস্তলের হদিস পায়নি পুলিশ।

২০১৫ সালে চট্টগ্রামে অস্ত্র, গুলিসহ নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় পৃথক দুটি অস্ত্র মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তবে দুটি অভিযোগপত্রের কোনোটিতেই উদ্ধার করা অস্ত্রের উৎস বা এর জোগানদাতাকে শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ বলছে, কীভাবে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছে, সে বিষয়ে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো তথ্য মেলেনি। এ কারণে অস্ত্রের উৎস শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালে যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসী নুর মোস্তফা ওরফে টিনুসহ তার সহযোগীকে আসামি করে অস্ত্র মামলায় অভিযোগপত্র দেয় র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার ১টি পিস্তল ও শটগান এবং ৭২টি গুলির উৎস তদন্তে বেরিয়ে আসেনি। র‌্যাবের দেওয়া তিন পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে মোস্তফা অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্রগুলো কোথা থেকে পেয়েছেন। তার কোনো তথ্য নেই। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান বলেন, বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

অবৈধ পিস্তল আসছে ভারত থেকে :

বাংলাদেশে অবৈধ পিস্তলের প্রায় সবই ভারত থেকে আসছে। তবে এসব পিস্তলের গায়ে কোনোসময় ভারত লেখা থাকছে না। পিস্তলগুলোর গায়ে লেখা থাকে; মেইড ইন ইউএসএ, জার্মানি ও অনলি আর্মি সাপ্লাই ইত্যাদি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশে বিদেশি পিস্তল উদ্ধার মানেই পুলিশ কর্মকর্তারা ধরে নেন সেটি ভারত থেকেই এসেছে। অবৈধ পিস্তল উদ্ধারের পর তদন্তে নেমে উৎসের এমন তথ্য পেলেও কখনো তা চার্জশিটে উল্লেখ করা হচ্ছে না।

২০১৮ সালে নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন দুই নাম্বার গেট এলাকায় পুলিশের এএসআই আব্দুল মালেকের ওপর গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া খোকনকে রিমান্ডে এনে চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সের পাশের মাঠে পত্রিকায় মোড়ানো অবস্থায় পলিথিনের ভেতর থেকে পুলিশ একটি পিস্তল উদ্ধার করে। আট ইঞ্চি লম্বা পিস্তলটির বাম পাশে ইংরেজিতে ‘মেইড ইন ইউএসএ’ ডান পাশে ইংরেজিতে ‘৭ পয়েন্ট ৬৫ আরএনডি’ লেখা আছে। ব্যারেলের ওপর উল্লেখ ছিল, ‘অনলি আর্মি সাপ্লাই’।

ওই পিস্তলটি পুলিশকে গুলি করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা তা জানতে সেটি এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া গুলির খোসা সিআইডির কাছে পাঠায় পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। এরপর পরীক্ষা শেষে সিআইডির ব্যালাস্টিক বিশেষজ্ঞ আবদুর রহিম প্রতিবেদন দিয়ে জানান, উদ্ধার হওয়া পিস্তলটি দিয়েই পুলিশকে গুলি করা হয়েছিল। একই সাথে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘মেইড ইন ইউএসএ’ ও ‘অনলি আর্মি সাপ্লাই’ লেখা থাকা ওই পিস্তলটি ‘লোকাল মেইড’।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে অবৈধভাবে পিস্তল তৈরি হয় না। এই দক্ষতা এখনো দেশের অস্ত্র কারিগররা রপ্ত করতে পারেনি। এখন যে সব পিস্তল পাওয়া যাচ্ছে সেখানে যা-ই লেখা থাকুক, সিআইডি যতই বলুক ‘লোকাল মেইড’ অর্থ্যাৎ বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরী; অলিখিত কথা হচ্ছে, সবগুলো পিস্তলই ভারত থেকে আসছে। কারণ আসামিদের তো আমরাই ধরি, তারা তো জানায় অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকাদের কাছে এখন পিস্তলের মজুদ এতটাই বেড়েছে যে, কার কাছে পিস্তল আছে সেই তালিকা না করে কার কাছে নেই সেটা করতে হবে!’

কক্সবাজারের মহেশখালীর দুর্গম পাহাড়ে এক নলা বন্দুক, এলজিসহ নানা অস্ত্র বানানো হয় অনেকটা ঘোষণা দিয়ে। তবে সেখানে অত্যাধুনিক পিস্তল তৈরির কথা শোনা যায় না। এমনকি মহেশখালীর পাহাড়সহ দেশে বসে পিস্তলের গায়ে খোদাই করে কিছু লেখাও কল্পনাতীত বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

ভারতীয় পিস্তলগুলোর গায়ে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের নাম উল্লেখ করার কয়েকটি কারণের একটি হতে পারে, প্রস্তুতকারী হিসেবে শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র রফতানিকারক দেশগুলোর নাম দেখলে বিক্রির সময় ভালো দাম পাওয়া যায়। ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যেই ওঠানামা করে ভারতীয় পিস্তলগুলোর দাম। চোরাইপথে আনা এসব ছোট অস্ত্রের লেনদেনে বেশিরভাগ সময় ব্যবহার হচ্ছে স্বর্ণ।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওঠে আসে, পাঁচলাইশে পুলিশকে গুলির ঘটনায় ব্যবহার করা পিস্তলটি এসেছে ভারতের ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে। এরপর কয়েক হাত বদলের পর পিস্তলটি চট্টগ্রামে আসে। ভারতীয় পিস্তলের তথ্য চার্জশিটে না দেওয়া প্রসঙ্গে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যালাস্টিক বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে যদি বলেন, পিস্তলটি লোকাল মেইড বা স্থানীয়ভাবে তৈরি। তখন আমি চার্জশিটে কীভাবে লিখবো, পিস্তলটি ভারতীয়। তাহলে তো সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে।’

ভারতীয় পিস্তলকে ‘লোকাল মেইড’ উল্লেখ করা বিষয়ে ব্যালাস্টিক বিশেষজ্ঞ ও সিআইডির পরিদর্শক আবদুর রহিম বলেন, ‘পিস্তল দুইভাবে তৈরি হতে পারে। প্রথমত ফ্যাক্টরি মেইড, দ্বিতীয়ত লোকাল মেইড। ফ্যাক্টরি মেইড বলতে বুঝানো হয়, ফ্যাক্টরিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়েছে। লোকাল মেইড বলতে বুঝানো হয়, হাতে তৈরি করা হয়েছে। এখন পাঁচলাইশের যে পিস্তলটি লোকাল মেইড বলেছি, সেটা যে কোনো জায়গায় হাতে তৈরি করা হয়েছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোয় গড়ে উঠেছে কিছু ছোট কারখানা। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি পিস্তল তৈরি হচ্ছে ভারতের বিহারের মুঙ্গের শহরে। সেখানে বেশকিছু অস্ত্র কারখানা আছে। যে কোনো দেশের পিস্তল দেখে তারা নকল বানাতে পারেন। এবং পিস্তলগুলো খুব ভালোমানের।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, ৯০ ভাগ বিদেশি অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে। বাকি বিদেশি অস্ত্রগুলো অসাধু ব্যবসায়ীরা বৈধপথে দেশে এনে অবৈধভাবে বিক্রি করে দিচ্ছে। কেউ অপরাধ করার জন্য এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে, আর কেউ অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে শক্তি দেখাতে কিনছে। ম্যাসেঞ্জারসহ নানা অ্যাপস ব্যবহার করে অস্ত্র বিষয়ক কথাবার্তা চালায় অবৈধ অস্ত্রধারীরা। এতে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ঝামেলা এড়াতে রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ কর্মকর্তাদের আগ্রহ থাকে না।

একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকা এক তরুণ প্রায় সময় সাথে রাখেন নাইন এমএম পিস্তল। তবে এখনো অপরাধকে পেশা হিসেবে নেননি তিনি। অস্ত্র ব্যবহারের বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা তা এ প্রতিবেদক তার কাছে জানতে চান; তিনি বলেন, ‘পিস্তলটা থাকলে নিজের মধ্যে সাহস আসে। চলতে-ফিরতে ভয় লাগে না। রাতে বালিশের পাশে পিস্তলটি না রাখলে ঘুমাতেই পারিনা।’

এদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বিভিন্ন সময়ে গরু ব্যবসায়ী ও নিরীহ বাংলাদেশি নিহত হলেও অস্ত্রপাচারকালে সীমান্তে এ পর্যন্ত কেউ নিহত হয়েছেন বলে শোনা যায়নি। তবে গুগলে সার্চ দিয়ে বিবিসি বাংলায় ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত একটি সংবাদ পড়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে পাচারের পথে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনায় বনগাঁ শহর থেকে ১০টি পিস্তলসহ এক ভারতীয় দম্পতিকে আটক করেছিল ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।

আব্দুল রউফ মন্ডল ও রহিমা মন্ডল নামের এই দম্পতি বিহারের জামালপুর থেকে এসব পিস্তল আনার পর তা বাংলাদেশ সীমান্তে একজনের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল বলেও জানিয়েছিলেন বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চলের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এস পি তিওয়ারি। বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভারতের গোয়েন্দারা জেনেছেন, এই চালানটি ধরা পড়ার এক সপ্তাহ আগে আরও দুটি অস্ত্রের চালান সীমান্ত পার করে বাংলাদেশের দিকে চলে গেছে।

এ ছাড়া ইউটিউবে সার্চ দিয়ে ভারতের বিহারসহ বিভিন্নস্থানে পিস্তল বানানোর বেশকিছু ভিডিও দেখা যায়। এ সব ভিডিওতে কাপড় দিয়ে মুখ আড়াল করতে দেখা গেছে কারিগরকে। ভিডিওগুলোর কিছু কিছু অবৈধ অস্ত্রের কারিগররাই ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছেন, আর কিছু ভারতীয় সাংবাদিকদের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে অনলাইনে এসেছে।

ভারত থেকে পিস্তল আসার বিষয়টির নানা প্রমাণ মিললেও উৎসের তথ্য কেন চার্জশিটে উল্লেখ করা হয় না? জানতে চাওয়া হয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে কর্মরত একজন উপ-পরিদর্শকের (এসআই) কাছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে আলোচিত এ পুলিশ কর্মকর্তা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, অনেক আগে একবার তিনি অস্ত্রের উৎসের কিছু তথ্য লিখে খসড়া চার্জশিটটি তার থানার ওসিকে দেখান। তখন ওসি জানান, চার্জশিটে এসব লিখলে উপকমিশনার (ডিসি) তা অনুমোদন দেবেন না। এরপর থেকেই অস্ত্রের উৎসের তথ্যগুলো উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকার কথা জানান পুলিশের মাঠপর্যায়ের এ কর্মকর্তা।

বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের ঘটনায় আদালতে জমা হওয়া তিনটি চার্জশিট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাতে চোরাচালানে জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রগুলোর কার্যক্রম ও উদ্ধারকৃত পিস্তল ও গুলির উৎস উঠে আসেনি। ২০১৭ সালের ৭ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার দাইয়াপাড়া এলাকা থেকে ‘মেইড ইন পাকিস্তান’ লেখা অস্ত্র ও পাঁচ রাউন্ড কার্তুজসহ গ্রেফতার হন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গোলজার আলম। তাকে গ্রেফতারের পর ১৩ মার্চ পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডবলমুরিং থানার এসআই আল-আমীন। সে সময় রিমান্ডের আবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা যুক্তি দেন, উদ্ধারকৃত অস্ত্রের উৎস সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, আসামির অপরাধপ্রক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র সরবরাহ ও ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের জন্য রিমান্ডের প্রয়োজন। এরপর একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে গোলজারকে আদালতে হাজির করে ১৯ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেন এসআই আল-আমীন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, আসামি একজন পেশাদার অপরাধী। তার সাথে থাকা অন্য আসামিদের নাম-ঠিকানা ও তাদের অস্ত্র-কার্তুজ সম্পর্কে সে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। গোলজার তার হেফাজত থেকে উদ্ধার অস্ত্র-কার্তুজের উৎস সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন রিমান্ডে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এরপর একই বছরের ২৮ মার্চ এই মামলায় আদালতে চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। সেখান অস্ত্রসহ আটক গোলজারকে একমাত্র আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে ঘটনার সময় গোলজারের সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা আসামি ছাড়াও অস্ত্র পাচারচক্রের অন্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। অথচ গোলজারকে রিমান্ডে এনে সন্দেহভাজনদের নাম ও তথ্য পাওয়া গেছে বলে আদালতকে জানিয়েছিল পুলিশ।

এদিকে ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার জিয়া বাজার এলাকায় ‘মেইড ইন স্পেন’ লেখা একটি অত্যাধুনিক পিস্তলসহ আবু নাছের নামের একজন গ্রেপ্তার হন। এর আগে ২০১৬ সালের ২২ মে নগরের চান্দগাঁওয়ের এক কিলোমিটার এলাকায় সৌদিয়া বাস থেকে ছয়টি ম্যাগজিনসহ ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোরের তিনটি পিস্তল উদ্ধার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় বাসের হেলপারসহ দুইজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। এসব পিস্তল চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকেই আসে বলে তদন্তে পুলিশ জানতে পারলেও চার্জশিটে উৎসের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

এভাবে অস্ত্রধারী পর্যন্ত তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকাকে পুলিশের অদক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার অভাব হিসেবে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি রতন কুমার রায়। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একটি বিদেশি অস্ত্র তো উড়ে বাংলাদেশে আসে না। অস্ত্র ও গুলি পাচারের সঙ্গে সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। এখন পুলিশ অস্ত্রসহ ধরে উৎসের কাছে যাচ্ছে না কেন সেটা রহস্যজনক। দেশের স্বার্থে পুলিশের উচিত হবে প্রতিটি অস্ত্র ও গুলির উৎস খুঁজে বের করা।’