বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ৩০ বৈশাখ ১৪২৮

বায়েজিদ লিংক রোড ঘিরে ভূমিদস্যুদের ভয়ঙ্কর থাবা

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৭, ২০২১, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কে সরকারি জায়গা দখলের ভয়াবহ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। পর্যটন সম্ভাবনা ডানা মেলায় এই সড়কের দু’পাশের পাহাড় দখলে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি ভূমিদস্যুচক্র। রাতের আধারে তারা স্থাপনা নির্মাণ করলেও দিনের বেলায় তাদের তৎপরতা চোখে পড়ে না।

অভিযোগ আছে, পাহাড়, সড়ক ও পরিত্যক্ত সরকারি জমি দখল করে লুটেপুটে খাচ্ছে জালালাবাদ, উত্তর পাহাড়তলীর এক শ্রেণির ভূমিখেকো। অসহায়, নিরীহদের জমিও সন্ত্রাসী কায়দায় ভোগ-দখল করে দোর্দণ্ড প্রতাপে জমিদারি করছে তারা। যাদের বেশিরভাগই জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ।

বায়েজিদ লিংক রোড ঘিরে গড়ে উঠা ভূমিদস্যু চক্রগুলোর বিরুদ্ধে শিগগির অভিযান শুরু হবে বলে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ পরিচালক লুৎফুল কবীর চন্দন। তিনি জানান, বায়েজিদ লিংক রোড ঘিরে ভূমিদস্যুদের দুর্গ ভাঙতে মাঠে কাজ করছে দুদক।

দুদক সমন্বিত চট্টগ্রাম অঞ্চল-১ এর দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, ভূমিদস্যু চক্রে চসিকের কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছেন। তারা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যেতে চাইছেন। কয়েকজন কাউন্সিলর স্ত্রী-সন্তানের নামেও গড়েছেন অঢেল সম্পদ। তাদের সরকারি জায়গা দখল ও অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা তথ্যপ্রমাণ দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

দুদকের তথ্য মতে, বায়েজিদ লিংক রোডে পাহাড় দখল, পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং ব্রিকফিল্ড। দখলের তালিকায় আছেন সরকার দলের একাধিক জনপ্রতিনিধি ছাড়াও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক নেতা, আছেন ব্যবসায়ী।

বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়কটি সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর, নগরের জালালাবাদ ও উত্তর পাহাড়তলী মৌজায় অবস্থিত। সরেজমিনে দেখা যায়, আরেফিন নগর থেকে পশ্চিমে বেঙ্গল ব্রিকস পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সড়কের দুপাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ দোকান ও বস্তিঘর।

সীতাকুণ্ড মৌজায় স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের পাহাড় কেটে গড়া রিসোর্ট-এর অদূরে কালভার্ট ঘেঁষে পাহাড় কেটে টিন দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি দোকান ঘর। এ দোকানেরর ক্যাশে বসে আছেন এক নারী। জিজ্ঞেস করলে তার নাম রেণু বলে জানান। সরকারি জায়গায় দোকান কেন? প্রশ্ন করলে রেণু বলেন, ‘এ জায়গার মালিক সিরাজ সাহেব।’ তার মোবাইল নম্বর চাইলে দিতে পারেননি রেণু।

স্পেক্ট্রার রিসোর্ট থেকে পূর্ব দিকে আরেফিনগর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান পর্যন্ত দেখা গেছে, সড়কটির দুপাশে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য দোকানপাট। উত্তর পাহাড়তলী এবং জালালাবাদ মৌজার সীমান্তে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান-েএর জায়গায় পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ, ইট, কংকর, সিমেন্টের পিলার, কমোড তৈরির স্থাপনা।

জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির কেয়ারটেকার পরিচয় দেওয়া আলী আহমদ মিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ জায়গায় মালিক মনির হোসেন। আমি তার অধীনে চাকরি করি। বায়েজিদ লিংক রোডটি আরেফিন নগর থেকে সোজা পশ্চিম দিকে না গিয়ে আমার মালিকের জায়গার উপর গেছে।’ এর তার মালিক মনির হোসেনের মোবাইল নম্বরে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, সরকারি জায়গা দখলের পাশাপাশি ‘ভূমিদস্যু’ চক্র বিভিন্ন ব্যাক্তির কেনা জায়গাও ভুয়া দলিলে দখল করে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও ফল পাচ্ছেন না। অবৈধ দখলকারীরা ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে রাস্তার পাশে খালি পড়ে থাকা জায়গাগুলো নিজেদের দাবি করে দোকান ও ঘরবাড়ি গড়ে তুলছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কের দুপাশে টিন দিয়ে, কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে ভ্যানগাড়ি রেখে এর চারপাশে বাঁশ দিয়ে টং দোকান গড়ে তুলেছে। আবার অনেকে ইট, বালি, সিমেন্ট এনে দোকান নির্মাণ করছে। তাদের অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে রেহায় পাচ্ছে না জালালাবাদ এলাকায় নির্মাণাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জায়গা। ভূমিদস্যু চক্রের কাছে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রবাসীরা। কষ্টের আয় দিয়ে ওই সড়কের পাশে জমি কিনে তারা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। জীবিকার জন্য বিদেশে অবস্থান করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে চক্রটি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বায়েজিদ লিংক রোড ঘেঁষে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল লতীফপুর, জঙ্গল সলিমপুর মৌজার শত শত একর পাহাড়ি ভূমি গ্রাস করছে কয়েকটি চক্র। আরেফিন নগর থেকে পশ্চিমে বেঙ্গল ব্রিকস পর্যন্ত সড়কটির দুপাশে চোখে আটকে যায় সারি সারি সাইনবোর্ডে।

পাহাড়ের পাদদেশে  ‘এম এ সালাম বৃক্ষরোপণ প্রকল্প’, ‘ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেড’, ‘জিন্নুরাইন প্রপার্টিজ’, ‘মিছম্যাক ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি’, এস এম আল মামুনসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন অসংখ্য সাইনবোর্ড। শুধু আরেফিন নগর থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান ও বস্তি। আরেফিন নগরে বিএস ৮০৪ দাগে জায়গায় ঝুলছে সরকারি একটি সাইনবোর্ড। সেটিতেই লেখা আছে ‘এই জায়গার মালিক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’৷ অথচ জায়গাটি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ।

জানতে চাইলে শাহীন নামে এক  গাড়ি মেরামত-শ্রমিক বলেন, ‘এটি রাজু সাহেবের গ্যারেজ। উনি কীভাবে এ জায়গার মালিক হয়েছেন আমি জানি না। আমি তো ওনার প্রতিষ্ঠানে কাজ করি।’ জঙ্গল লতীফপুর মৌজার বিএস ৪৪ দাগের জায়গায় ঝুলছে এস এম আল মামুন নামের একাধিক সাইনবোর্ড । সাইনবোর্ডে লেখা মোবাইল নম্বর ধরে সোমবার সন্ধ্যায় ফোন করলে মোহাম্মদ মুছা নামের এক ব্যক্তি ফোন ধরেন।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সাইনবোর্ড ঝুলানো জায়গাগুলোর মালিক সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন৷ ওই দাগে জায়গার পরিমাণ চার একর। বায়েজিদ লিংক রোড হওয়ার আগেই তিনি জায়গাটি দোভাষ গং থেকে কিনেছেন। পাহাড়ি জায়গাগুলো আরএস রেকর্ডে খাস হিসেবে চিহ্নিত আছে। মামুন সাহেবের দখলে কোনও সরকারি খাস সম্পত্তি নেই।’

তবে বায়েজিদ লিংক রোড চালু হওয়ার পর থেকে একটা ভূমিদস্যুচক্র সরকারি খাস জায়গা নানা কায়দায় গ্রাস করে নিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মুছা। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, রোকন নামে কথিত এক বিএনপি নেতা (পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী) বায়েজিদ লিংক রোডের দুপাশে বিপুল পরিমাণ সরকারি খাস জমি দখলে নিয়েছেন। তার শক্তিশালী একটি চক্র আছে। তিনি ছিন্নমূল বস্তি এলাকায় থাকেন।

জিন্নুরাইন প্রপাটিজও বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি খাস জায়গা দখল করে সাইনবোর্ড গেড়ে দিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও চলছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক এক মেয়েরের ছেলের সাথে এ প্রতিষ্ঠানের মালিক জমির উদ্দিনের মামলা চলছে বলে জানা গেছে।

আমান আলী নামে এক ভুক্তভোগী জানান, জোরপূর্বক ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মালিকরা দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করলে ওই চক্রের হাতে প্রতিদিন কেউ না কেউ লাঞ্ঝিত হচ্ছেন। এ নিয়ে ঝগড়া ও হাতাহাতি পর্যন্ত হচ্ছে।

আরেক ভুক্তভোগী দস্তগীর রাসেল তার প্রবাসী ভাইয়ের জায়গার উপর দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার ভাই বিদেশে থাকেন। তার অনুরোধে আমরা জায়গাটি দেখাশোনা করি। কিন্তু আমরা থাকি আগ্রাবাদ এলাকায়। এত দূর থেকে প্রতিদিন এখানে আসা-যাওয়া কষ্টসাধ্য । এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে কতিপয় ভূমিদস্যু। তারা অবৈধভাবে আমার ভাইয়ের কেনা জমির সামনে ইট দিয়ে স্থাপনা ও দোকান নির্মাণ করছে।

আরেক ভুক্তভোগী আহমদ হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ক্রয় করা জায়গার নামজারি করা আছে। নিয়মিত সরকারি খাজনাও পরিশোধ করছি। চসিকের ২ নং জালালাবাদ ওয়ার্ড এলাকায় ৪১ সদস্যের একটি গ্রুপ আছে। তারা প্রবাসীদের জমি অবৈধ দখলে লিপ্ত। ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে একজনের জায়গা আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনও প্রতিকার পাইনি।’

প্রবাসী ভুক্তভোগী রফিক আমান বলেন, ‘ছয়বছর আগে ৪০ লাখ টাকায় সীতাকুণ্ড জঙ্গল সলিমপুর মৌজার বিএস ৩৫৭ দাগে ২০ শতক জায়গা কিনেছি। আমার জমির পাশ দিয়ে চলে গেছে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়ক। এখন জালালাবাদের গজে উঠা ‘ভূমিদস্যু’ চক্র আমার জায়গার সামনের অংশ সরকারি খাস জায়গা দখলে করে নিয়েছে। প্রতিবাদ করায় তারা প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বর্তমান সরকার প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করছেন। আশা করি, প্রবাসীদের পরিবার-পরিজন যেন যথাযথ নিরাপত্তা পায়, তাদের ক্রয় করা জায়গা জমি যেন নিরাপদ থাকে সে উদ্যোগ নেবে।’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ কিছু ভুক্তভোগীর অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি।’

বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়কের পাশে (সীতাকুণ্ড অংশে) অবৈধ দখলদার, পাহাড়খেকোদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সীতাকুণ্ডের এসি ল্যান্ড রাশেদুল ইসলাম।